কু-সন্তান হলেও কু-মাতা কি সত্যিই কখনো হয় না?
সন্তান কি সবসময় ‘কু-সন্তান’
সমাজ-মনস্তত্ত্ব, আদালতের তথ্য আর বাস্তবের গল্প কিন্তু অন্য কথা বলছে
ঈশানী মল্লিক
“কু সন্তান হলে চলবে, কিন্তু কু মাতা কখনো হয় না”— বাংলা সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রবাদটি দীর্ঘদিন ধরে মাতৃত্বকে দেবীসুলভ এক নির্মল সত্তা বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু বাস্তব সমাজ, গবেষণা, মনোবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্ব— সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, সত্যিই কি ‘কুমাতা’ বলে কিছু নেই?
মাতৃত্ব কি জন্মগতভাবে নিখুঁত? বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে— ‘না’।
২০১৮ সালে American Psychological Association (APA)-র একটি রিপোর্টে বলা হয়, “Maternal instinct is not universal or automatic; it is shaped by biology, mental health, environment and experience.”
(মাতৃত্বের প্রবৃত্তি সর্বজনীন নয় বা জন্মগতভাবে সক্রিয় হয় না; এটি গড়ে ওঠে পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য ও অভিজ্ঞতার উপর।)
ভারতের National Crime Records Bureau (NCRB)-এর ২০২৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়— প্রতি বছর ১,২০০-১,৪০০ শিশুহত্যার মামলায় মা সরাসরি অভিযুক্ত হন। এই সংখ্যা সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
কেন কিছু মা ‘নির্যাতনকারী’ হয়ে ওঠেন?
মনোবিজ্ঞান-এর ব্যাখ্যা দেয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজমনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. অরিত্র মুখোপাধ্যায় বলেন—
“মাতৃত্বের অনুভূতি সামাজিকভাবে আদর্শায়িত। কিন্তু ট্রমা, দারিদ্র্য, বিষণ্ণতা, প্রসব-উত্তর ডিপ্রেশন— সবই একজন মাকে সীমাহীন অসহায় করে দিতে পারে। তখন কিছু ক্ষেত্রে হিংসা, অবহেলা বা নির্যাতন দেখা যায়।”
গবেষণা অনুসারে (WHO, ২০২২):
জন্ম দেওয়া মায়েদের ২০-২৫% প্রসব-উত্তর ডিপ্রেশনে ভোগেন।
এর মধ্যে ৮% মায়ের মধ্যে ‘harmful tendencies’ দেখা যায়— যা শিশু অবহেলা, মারধর বা মানসিক অত্যাচারে পরিণত হতে পারে।
বাংলার মাঠে-ময়দানের বাস্তব: কোর্টরুমের নথি বলছে ভিন্ন গল্প—
কলকাতা হাই কোর্টে গত ১০ বছরে শিশু নির্যাতনের প্রায় ৩২৭টি মামলায় জন্মদাত্রী মা অভিযুক্ত হয়েছেন।
কারণগুলির মধ্যে রয়েছে—
মানসিক অসুস্থতা
মদ্যপান বা নেশা
সঙ্গীর নির্যাতন থেকে সৃষ্ট চাপ
অতি দারিদ্র্য
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ
পারিবারিক সহিংসতা
মনিবের কাজ করতে যাওয়া এক দিনমজুর মায়ের ঘটনা এই শহর ভুলবে না সহজে— দু’বছরের মেয়েকে প্রতিদিন ঘরে আটকে রেখে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত শিশুটি জল শূন্যতায় মারা যায়। আদালতের রায়ে— এটি “স্পষ্ট অবহেলা ও নিষ্ঠুরতা”।
এমন আরও উদাহরণ রয়েছে যেখানে শিশু পাচারচক্রে নিজের সন্তানকে দিয়ে দেওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে— এর অধিকাংশই চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক চাপের ফল।
তাহলে কি ‘কু-মাতা’ আছে? নাকি সমাজের নির্মিত ধারণা?
বিশেষজ্ঞদের মতে—
“কু-মাতা”— শব্দটি আবেগ দিয়ে চালিত এক সামাজিক বিচার। কিন্তু নির্যাতনকারী মা— বাস্তব, আইনসিদ্ধ ও গবেষণায় প্রমাণিত একটি টার্ম।
যারা সন্তানকে আঘাত করেন, তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই রয়েছে—
ট্রমা
গৃহ-সহিংসতা
মানসিক রোগ
অর্থনৈতিক হতাশা
সামাজিক একাকিত্ব
অতএব, ‘খারাপ’ মা বলে নয়—
বরং সমস্যাগ্রস্ত, সাহায্য-প্রার্থী, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মা হিসেবেই তাদের দেখা প্রয়োজন।
এদিকে সন্তানও কি সবসময় ‘কু-সন্তান’ হয়ে ওঠে?
সমাজে ‘কুসন্তান’ বলে চিহ্নিত শিশুরা অধিকাংশই—
অপমান
অবহেলা
সহিংস পরিবেশ
অতি নিয়ন্ত্রণ
এইসব কারণে বড় হয়ে ওঠে।
শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. শুভশ্রী ঘোষ বলেন—
“কুসন্তান জন্মগত নয়, তৈরি হয়। যে ঘরে সহানুভূতি নেই, ভালোবাসা নেই— সেই পরিবেশ শিশুকে ঠান্ডা, আক্রমণাত্মক বা বিদ্রোহী করে তোলে।”
সমাজ কী শিখবে?
প্রবাদটি সুন্দর, আবেগপ্রবণ— কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
l সব সন্তান ভালো হয় না
l সব মা-ও নিখুঁত নন
l তবে অধিকাংশ ‘খারাপ’ মা আসলে সমস্যায় জর্জরিত মা, যারা সাহায্য পেলে বদলে যেতে পারেন
l আর কুসন্তানের উৎসও প্রায়শই পরিবারেই
উপসংহার—
“কু-সন্তান হলেও কু-মাতা কখনো হয় না”— এই প্রবাদ আমাদের সমাজে মায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা তৈরি করেছে ঠিকই,
কিন্তু এই ভাবনা যতটা আবেগের, ততটা বাস্তবের নয়।
মাতৃত্ব এক মানবিক অনুভূতি— অসম্পূর্ণ, কখনো দুর্বল, কখনো সংগ্রামী।
তাই প্রবাদ দিয়ে নয়, বাস্তব দিয়ে বিচার করাই শ্রেয়।