শনিবার | ০৪ এপ্রিল ২০২৬

শিকড়ের কাছে, শিকড় থেকে দূরে…

 শিকড়ের কাছে, শিকড় থেকে দূরে…

গল্প যদি ধারাভাষ্য হয়, ক্ষতি নেই। তাতে কল্পনা থাকুক।

গল্পকার ময়ূরী মিত্র-র গল্পে রয়েছে দৈনন্দিতার আলো-অন্ধকার, নারী-পুরুষের ভিন্নধর্মী সহাবস্থানের এক জটিল চিত্র। লিখছেন বাসব মৈত্র।

আধুনিক গল্পকারের মূল কাজ কী! সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কথিত, উপন্যাসের মূল কাজকে ধরেই বলি, ক্ষত স্থানটিকে পাঠককে দেখানো।
ময়ূরী মিত্রের সাম্প্রতিক গল্পগুলো পড়লে আমরা বুঝতে পারি, গল্পকার বিক্ষত মুদ্রাটির দুটো দিকই দেখিয়েছেন। পুরুষ মনের ক্ষত আর নারী মনের ক্ষত দুটো ভিন্ন জিনিস। তার উৎস বৈজ্ঞানিক ভাবেই আলাদা। নারীর দুঃখ যন্ত্রণা আর পুরুষ দুঃখ যন্ত্রণা, কিংবা আনন্দ, অধিকার, স্বাধীনতা, উদাসীনতা, স্বেচ্ছাচার— সবেরই আলাদা রং, আলাদা অভিঘাত। পারস্পরিক বোঝাপড়ার গল্পে অনীহা হয়তো পুরুষের থেকে নারী অবচেতনের বেশি। নারীর মেধাকে এখানে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হয়। নারী শুধু আঁকড়ে ধরে না। সমাজ স্বীকৃত ভাবনার রোদ-জল-ঝড় গায়ে মেখে সে পুরুষকে রহস্যের অন্ধকারে ডুবিয়ে মারে।
ধরা যাক, ময়ূরী মিত্রের জনপ্রিয় গল্প ‘লাচ্ছা পরোটা’-র কথা। নয়ন এই গল্পের নারী চরিত্র। বিপরীতে অন্ধবাবু। নয়নের বর রঘুলাল। একসময় রঘুলালের ছিল নৌকার পালের মতো কাঁধ। সুঠাম চেহারা। মেয়েলোককে ওই সুঠাম শরীর, ঊরু, পুরুষালি পা— পুকুর পাড়ে চান করার সময় দেখাত রঘুলাল। পুকুর পাড়ে চান করতে নেমে, তলপেটের অনেক তলায় গামছা নামিয়ে তেল ঘষত রঘুলাল। পর-নারীকে এই শরীর প্রদর্শন ছিল রঘুলালের নেশা। নেশায় সে চোখ বুজে ফেলত। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পুরুষ শুধু কল্পনায়, নিজের কাল্পনিক যৌনআত্মতুষ্টিতে— যেভাবে স্থান কালের জ্ঞান হারায়, বা অভিভূত হয় তা বহু পুরুষ চরিত্রের একটি বহুগামী প্রবণতাকেই শনাক্ত করে। ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পুরুষের নারীকে প্রলোভিত করার মূল অস্ত্র সুঠাম যৌবন। রঘুলালের এই হাতিয়ারকে প্রকাশ্যেই উপেক্ষা করত নয়ন। হাসি দিয়ে। পুরুষ প্রত্যাশা করত, স্ত্রীর দুঃখ, হিংসা। কান্না। কিন্তু নয়নের সেসবে কোনো হুঁশ ছিল না। এই যদি নারী মনের, বহু সত্তার একটা দিক হয়, উল্টোদিকে রয়েছে কর্মক্ষেত্রে অন্ধবাবুর প্রতি নয়নের আগ্রহ। নয়নের সন্দেহ হতো, অন্ধবাবু কি দেখতে পায়? অন্ধবাবু জানিয়েছিল, সে ঝাপসা দেখতে পায়। তারপর থেকে অফিস ঘরের পিছনের খোলা কলতলায় স্নান বন্ধ করেছে নয়ন। কিন্তু কোথাও সেই ঔৎসুক্যের শিকড়? রঘুলালের হদ্দ রোগা হয়ে শুয়ে থাকা! রঘুলালের অসুস্থতা? এককালে যার যৌবন অন্য বউদের টানত, রঘুলালের স্ত্রী নয়নকে টানেনি।
“ঠান্ডা মেঝেতে আজ সব আবরণ সরিয়ে শুয়ে আছে নয়ন। … ঠিক যেমনটা অন্ধবাবু চেয়েছিল।” এই অনুরাগের কারণ কি শুধুই কর্মক্ষেত্রে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পাওয়ার এক প্রয়াস? ভালো লাগা জড়িয়ে নেই এর সঙ্গে? “প্রতি অঙ্গে নির্ভুল হাত ছোঁয়ালেও, অন্ধবাবু ছোঁয়াতেই শেষ করছেন তাঁর আদর। কতবার যে এমন মায়ামাখা স্পর্শ দিলেন।”
নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষার কোন তত্ত্বে একে বিশ্লেষণ করা যায়? পৌরুষ উপেক্ষিত, কিন্তু অন্ধত্ব— নারীকে যে আবছা বোঝে, যে নারী শরীরকে, বিভিন্ন প্রত্যঙ্গকে আলাদা নামে চিনেছে, বকলমে নারীর বহুমুখী সত্তার, ভিন্ন প্রত্যঙ্গের এ যেন উষ্ণ উদযাপন— নারী যে লালায়িত নয় পুরুষের উগ্র যৌবনের জন্য, এই সামগ্রিক বার্তাই যেন ময়ূরী মিত্র নয়ন চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে বুঝিয়েছেন।
এর উল্টোদিকে ‘মিলবে তারা’-র হেমাঙ্গিনী চরিত্র। “প্রথম যেদিন হারাধনের পাশে রানি বেনারসী পরা প্রতিমাকে দেখেছিলেন, বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে ইচ্ছে হয়েছিল। হারাধন।! অমন বাসনাময় পুরুষটাকে তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেবে বউটা! ততদিনে যতবার পেরেছেন, হারাধনকে ভোগ করে নিয়েছেন। প্রতিমাকে মাছভাত খাওয়াতে খাওয়াতে, হারাধন আর নিজের মিলনভঙ্গি ভাবলেন হেমাঙ্গিনী। মিলনের সময় কী মজাই না করতেন! হেমাঙ্গিনী নিজেকে পুরুষ ভাবতেন। সেই মতো অসভ্যতা বাড়াতেন” (এখানে অসভ্যতা শব্দের ব্যবহার লক্ষ করার মতো। তথাকথিত বাঙালি সংস্কার লেখককে এই শব্দ ব্যবহার করতে যেন বাধ্য করেছে)। এই যৌন তৃপ্তি হেমাঙ্গিনীকে প্রতিস্পর্ধি, নিষ্ঠুর, কৌশলী করে তুলেছিল। নিজের পুরুষকে বশে রাখতে হেমাঙ্গিনীর হিংস্রতা কখন যেন পুরুষতান্ত্রিকতার সমকক্ষ হয়ে ওঠে, সাহসে, সক্ষমতায়। হারাধনের বউভাতের আগের রাতে হারাধন যখন পাশের বাড়িতে বউকে (প্রতিমা) পাঠিয়ে শুতে গেল হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে, তখন একইভাবে সামাজিক শৃঙ্খলাকে ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দেয় নারী-পুরুষের আত্মিক আদিমতা। কিন্তু সে রাতে কী ঘটেছিল? “বিছানার ওপর ফেলে লাথির পর লাথি চালিয়েছিলেন হেমাঙ্গিনী।” যে কোনও বর্বর পুরুষের চাইতে, কোন অংশে কম হেমাঙ্গিনী! প্রবৃত্তি, সুখ, নিজের মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয়, বাস্তবতা হেমাঙ্গিনীকে এই পর্যায়ে নিয়ে ফেলেছে। এখানে হেমাঙ্গিনী রিপুর দাস। মন রক্তাক্ত হওয়া এক জিনিস আর প্রতিশোধস্পৃহা আরেক জিনিস। এই বর্ণনায় লেখক সাহসী, অকপট শুধু নন আরেক ভিন্ন জগতের, সাম্প্রতিক প্রবণতা বলে দেগে দেওয়া লেসবিয়ানিজমকেও ওই হেমাঙ্গিনীর চরিত্রেই স্পষ্ট করেছেন যা মনস্তাত্ত্বিক ভাবে ভিন্ন অবস্থানের।
হেমঙ্গি কৌশল পাল্টালেন। প্রিয় পুরুষের নারীর সঙ্গে এখন তার সখ্য।
“খা প্রতিমে! জিভ দিয়ে আমার হাতের মাছ টেনে নে। আমার আঙুল শুঁকে মাছের গন্ধ নে! আশটে গন্ধ পেয়ে, তোর পেটের বাচ্চাটা কেমন নড়ছে দ্যাখ! মনে কর, তোর আর আমার সংসারে বাচ্চা এল। প্রতিমে— এই প্রতিমে— এটা আমাদের বাচ্চা। বল না প্রতিমে! তাই তো?”
হেমাঙ্গিনী সন্তান সুখ যদি হারাধনের কাছে চাইত, সেটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হারাধনের সঙ্গে সেই বউভাতের পর আর বিছানায় যাননি হেমাঙ্গিনী। “সে রাতে কত বিচিত্র কায়দায় যে হারাধনের ওপর অত্যাচার করেছিলেন! জন্তুর মতো চিৎকার করেছিল হারাধন।”—এই কি যৌন প্রহার? নারীর পুরুষকে? সমাজ তো এতদিন উল্টোটাই জানত। পুরুষ হিংস্র। অবদমিত কাম পুরুষকে নৃশংস করে তোলে। নারীর ক্ষেত্রেও তাহলে ঘটনা একই হয়? শুধু গায়ের আর মনের জোর— নারী পুরুষকে, পুরুষের আকাঙ্ক্ষা, যৌন সৌজন্যতাকে তছনছ করে দিতে পারে। পুরুষের পরাক্রম নারীর কাছে পরাজিত। সামাজিক ভাবে জেতা বিবাহিত পুরুষকে (বিবাহ যদি প্রতিষ্ঠান হয়) রাতে বিছানায় শুধু মাত্র বিবাহের দোষে চরম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। অর্থাৎ নারী তার নিজের স্বার্থে প্রেমিকের অন্য নারীতে বিবাহ ইচ্ছাকে মূলত পিষে দেয়। পরোক্ষে পুরুষের চারিত্রিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে— এখানেই শেষ নয়। পরাজিত না হওয়ার লক্ষ্যে সে প্রেমিকের স্ত্রীকে নিয়ে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। হারাধনের বাগানে দাঁড়িয়ে হাক মারে, “প্রতিমে! ওগো প্রতিমেমণি। আমার কান্তমণি! বর ছেড়ে বেরিয়ে এসো দিকিনি!”
এই নতুন অধ্যায়ের সূচনায় প্রতিমা আরও শান্ত হয়ে যায়। হেমাঙ্গিনী যখন সন্তান চায় প্রতিমার কাছে, একজন নারী যখন আরেক নারীর কাছে সন্তান চায় তখন একপক্ষের আন্তরিকতায় মেশে পূর্ব-প্রেম ভাঙনের যৌন ছটা। এখানে হেমাঙ্গিনী বিরক্তির উদ্রেক করে? না পাঠক অন্তর থেকে সহানুভূতি জানাতে চায়? সামাজিক আলোয় আমরা মেনে নিতে পারি না হেমাঙ্গিনীর এই বিষ চেতনাকে। কিন্তু সাহিত্য শুধু বাইরের সংঘর্ষের সঙ্গে চরিত্রের মিল মিশ দেখে না, অবচেতনের অন্ধকারটাকেও সমান আলো বলে মনে করে।
পড়তে পড়তে মনে হয় হেমঙ্গিনীর কী আশ্চর্য সম্মোহন করার ক্ষমতা। গল্পের পরিণতি থেকে এক্ষেত্রে ঘটনার পরত, তাৎক্ষণিকতা, চরিত্রের উদ্দেশ্য, সময়ের স্নায়ুকে অনেকটাই এগিয়ে পিছিয়ে এমন এক নির্লজ্জ সত্যের কাছে পৌঁছে দিলেন যা মূলস্রোতের পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলবে। এমনিতেই যৌনতা নিয়ে কথা বলতে বাঙালি লেখক, পাঠকের কুণ্ঠা। আর এখানে তো যৌনতার একটা বর্ণনা আছে। সমরেশ বসু বা অন্য কোনো পুরুষ লেখক এই লেখা লিখলে অসুবিধা থাকত না? বিতর্ক তৈরি হতোই। দিন পাল্টেছে। একজন মহিলা লেখক লিখলে দীক্ষিত পাঠকের অসুবিধার হওয়ার কথা নয়। যদি হয়!
কোনো গল্প কতটা অভিজ্ঞতা সঞ্জাত হবে বা কল্পনা কতটা গল্পকে নির্মাণ করবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে এই ভাবনা গল্পকার ময়ূরী মিত্রকে ভাবিয়েছিল। গল্পকারের দ্বিধা থাকেই। সাধারণ পাঠকের গল্প বিচার করার ধরন এক, আর সমসাময়িক লেখক, সমালোচকের গল্পকারের কাছে প্রত্যাশা আর এক। কল্পনা আর অভিজ্ঞতার কথা, সংমিশ্রণের অনুপাতের কথা ময়ূরী বলেছেন ‘চাকবাদাম’ গ্রন্থের ভূমিকায়।
গল্প যদি ধারাভাষ্য হয়, ক্ষতি নেই। তাতে কল্পনা থাকুক। কিন্তু যেন মেকি বা বানানো মনে না হয়। চরিত্রগুলো যেন তাদের নির্দিষ্ট অবস্থান মেনে আলো আঁধারির নির্মাণ কৌশলে স্নাত হয়। কিন্তু নির্মাণের স্থূল দাগ যেন গল্পের গায়ে না পড়ে। এই দিক দিয়ে বলতে গেলে ময়ূরী মিত্র একজন সার্থক গল্পকার। গল্পের ভরকেন্দ্রে অনেকটাই নারী মন। নারী মনের বহু আলো, ধূসর, অন্ধকার সবের মধ্যে পুরুষ চরিত্র উপেক্ষা, মমতা, সহযোদ্ধার মর্যাদা, প্রেম, সবই পেয়েছে। দুঃসাহসিক বেশ কিছু গল্প আটপৌরে চালচিত্র যেমন ভেঙেছে, তেমন আগলেছেও।
এই নারী চরিত্রের আরেকটা রূপ আমরা দেখতে পাই, ‘এ বসন্তে পানুকুমার’ গল্পেও। পানু তার বউ সারদাকে ভালোবাসলেও সারদা পানুর সঙ্গে ঘর করে না। সারদার মুখ পুড়ে গেছে। দগ্ধ মুখে সে তার পোড়া বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না পানুর সন্তানকে। তাই তার দ্বিতীয় বিবাহ ঘরদোরহীন সুব্রতকে। ঘরদোরহীন সুব্রতকে বিয়ে করল সারদা। অর্থাৎ সে বিবাহে বিশ্বাস করে। সুব্রতর হাতে মায়ের বালা তুলে দিয়ে সারদা যেন তার দগ্ধ মুখের, কুরুপের জন্য, অন্তত সুব্রতর কাছে কিছুটা স্ত্রী-দায়, ক্ষতিপূরণ মেটাতে চেয়েছিল। এই দেওয়া কোথাও যেন নারী-পুরুষের সামাজিক সহবস্থানের নির্লজ্জ শর্ত, যা মর্মে অনুভব করে নারী। পুরুষ কিন্তু এটাকে পুরুষতান্ত্রিকতার দৌলতে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই মেনে নেয়।
উল্টোদিকে পানু কিন্তু উদার। সে সারদার দগ্ধ মুখের জন্য সারদাকে ছাড়েনি। অর্থাৎ রূপ ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওদিকে, পাড়ার লোক জানে, আলি আর পানু পরস্পরকে নিয়ে সুখে থাকে। সারদার দ্বিতীয় বর মরে গেলে পানু, যে গায়ে রোজ সাবান দিতে চায় না, সেই পানুই বডিওয়েল মেখে সারদার কাছে যায়। এই যে বডিওয়েল প্রতীকি অর্থে সুগন্ধি মেখে যাওয়া প্রাক্তন সদ্য বিধবা স্ত্রীর কাছে— এর মধ্যে দিয়েই লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন পানুর সূক্ষ্ম পুরুষ প্রতিশোধ। পানু যে তাকে ঘরে নিতে চায়না, সেকথাও কি পানু বুঝিয়ে দেয়নি সারদাকে? পানু শুধু সারদাকে বলেছিল, সারদার বাবাকে জানাতে যে, সারদা যে পানুর ঘর করেনি এই সিদ্ধান্ত সারদারই ছিল। অর্থাৎ পুরুষ তার কর্তব্যহীনতার যে অভিযোগ তাকে নস্যাৎ করে সেই কলঙ্ক মোচনে প্রয়াসী। এখানে আলি যেন পানুর সাগরেদ। যে অবলীলায় বাল্যবন্ধু সারদাকে বলে, তাকে বিধবা দেখতে তার খুব আনন্দ হচ্ছে। আলি আর পানু কি বিবাহিত? নয়তো? তবু আলি যেন প্রেমিক পানুর দুঃখের শরিক, একই সঙ্গে প্রতিস্পর্ধি সারদার মানসিক ক্ষততে দু’ছিটে নুন ছেটাতে।

প্রথম পর্বের আলোচনা শেষ করব, ‘ঘন্টুরা মিনিরা’ গল্প দিয়ে। মিনি স্পেশাল চাইল্ড। মিনির বাবা ভারতীয় চিকিৎসক, ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকে। মিনির দায়িত্ব শীলা-নেলী পিসির। মিনির প্রায় সমবয়সি বন্ধু, আশ্রয়স্থল ঘন্টু। এই গল্পে শিক্ষা ব্যবস্থার একটা অন্ধকার দিক উঠে এসেছে। স্পেশাল চাইল্ড-এর ক্ষেত্রে শিক্ষকের যে সহানুভূতি, স্নেহ থাকার কথা তাই এই গল্পের শিক্ষকের চরিত্রে দেখতে পাওয়া যায় না। ‘অডিটারি ফিডব্যাক’ পায় না মিনি। শিক্ষক অভিযোগ করেন, ‘টুকলি করেও আপনার মেয়ে পাশ করতে পারেনি।’ এই কথা শিলাপিসিকে মানসিক আঘাত করে। শিলাপিসির মনে হয়, ওই শিক্ষক মিনিকে ‘চোর’ বলেছেন। এই রাগে, শিলাপিসি মিনিকে বকেন, ‘সব বুঝিস, ইচ্ছে করে শয়তানি করিস।’ এর কিছু পরে ঘন্টু শিলাপিসাকে আক্ষরিক অর্থেই ধমক দেয়, ‘এত তাড়াতাড়ি কথা বলছ কেন তুমি! ঠোঁট এত নড়লে, ও ঠোঁট পড়বে কী করে।’ ঘন্টুর এই সংবেদনশীলতা কিন্তু আমরা শিক্ষকের কাছে পাইনা। এমনকি ড্রয়িং পরীক্ষায়, সমুদ্রে সূর্য ওঠা আঁকতে দেওয়া হলে, মিনি সমুদ্রের পাশে একটা পাহাড় একে দেয়। শিক্ষক কটাক্ষ করেন মিনির কল্পনাকে। আসলে মিনি বেড়াতে গিয়ে প্রায় এরকম দৃশ্যের সম্মুখীন হয়। ঘন্টু কিন্তু বুঝতে পারে, মিনির সার্বিক অসুবিধার কথা। উল্লেখ্য, টুকলি প্রসঙ্গে ঘন্টু বলে, ‘মিনি জানে ওটা টুকলি?’ কানে শুনতে না পাওয়া মিনি টুকলি, চুরি এসব কিছুই বোঝে না— শিক্ষকের অভিযোগকে নস্যাৎ করতে পারেননি শিলাপিসি। বরং গুমরে মরেছেন। তৃতীয়পক্ষ হিসেবে যদি ঘন্টুকে ধরি, বয়স অনুপাতে কত ছোট একটা ছেলে কিন্তু সমস্ত অভিযোগকে নস্যাৎ করার সাহস রাখে। মিনির মতো একটি ছোট মেয়ের অসহায় চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্পের বিভিন্ন চরিত্র, তাদের সংলাপ, এমনকি অভিভাবক শিলাপিসির যে ঘটনার অভিঘাতে মুহূর্তের নুয়ে পড়া— লেখক কী অত্যাশ্চর্য মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’ যদি স্পেশাল চাইল্ড নিয়ে দর্শককে, সমাজকে এক গভীর বার্তা দেয়, তাহলে ময়ূরী মিত্রের ‘ঘন্টুরা মিনিরা’ গল্প পাঠককে এই স্পেশাল চাইল্ড-এর প্রাত্যহিকতা, দৈনন্দিন যাপনের করুণ চিত্র উপহার দিয়ে সমাজকে সচেতন ও একই সঙ্গে সমাজের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করে। গল্পের পরিসর ছোট হলেও এর ক্যানভাস অনেক বড়। বার্তার থেকে নিদারুণ হাহাকার ছড়িয়ে দেওয়া, সহমর্মিতার উদ্রেক ঘটানো এবং শিশু-কিশোরের মনস্তত্ত্ব বুঝে ওঠার মধ্যে যে ধৈর্য, লক্ষ, শিক্ষা সবেরই এক সুষম বিন্যাস রয়েছে গল্পকার সেই সম্পর্কে বারবার সচেতন করেন।
( চলবে)

অলঙ্করণ : অপরেশ পাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *