নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের জন্য দায়ী সেই ঘাতক ‘এল নিনো’

কাঠমান্ডু, ২৬ আগস্ট- তিব্বত সীমান্ত থেকে হঠাৎ নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে ভয়াবহ হড়পা বানের কবলে নেপালের রাসুয়া জেলা। বুধবার সকালে ভোটে কোশি নদীতে আচমকা জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় টিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাজার, বাড়িঘর, রাস্তা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হওয়ায় ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর নীচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
এই ধরণের পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট আবহবিদ সুজীব কর। তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গোপসাগর থেকে এই মুহূর্তে একটি শক্তিশালী সাইক্লোন ঢুকেছে। ফলে একটি নিম্নচাপ বিহার হয়ে উত্তরপ্রদেশ এবং নেপালের ওপর রয়েছে। পাশাপাশি মৌসুমি অক্ষরেখা অনেকটা সক্রিয়। এই সময় যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প প্রবেশ করার কথা তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণে জলীয় বাষ্প রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম ভারতে কোনও নিম্নচাপ তৈরি হয়নি। ফলে মৌসুমি বায়ু সেদিকে যেতে পারছে না। যার জন্য নেপালের ওপরেই এই মৌসুমি বায়ু ঘনীভূত হয়ে যাচ্ছে।’ গোটা দেশে যেখানে ‘এল নিনো’-র প্রভাব চলছে সেখানে আবহবিদদের মতে, ‘যেহেতু উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিম্নচাপ নেই সেজন্য মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হতে পারেনি। এটি বেশিরভাগ থাকছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। ফলে বঙ্গোপসাগর যখন অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে বেশি জলীয় বাষ্পের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে তখন এটি স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে সিকিম এবং নেপালের ওপর। ফলে শুধু নেপাল নয়, সিকিমেও বারে বারে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এই ধরণের ঘটনা আগামী দিনে আরও হবে। এর ফলে উত্তরপ্রদেশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিহারেও এর প্রভাব পড়বে। সিকিম হিমালয়েও বড় প্রভাব পড়বে। এখান থেকে এখনই মুক্তি নেই।’
স্যাটেলাইট ইমেজিং সিস্টেমেও ধরা পড়েছে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে যে পরিমাণ বায়ু থাকার কথা সেটি এখনও এসে পৌঁছায়নি। ফলে হিমালয়ে যেখানে বরফ জমে থাকার কথা সেখানে বরফ নেই। এই ভারী বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি ভূমির ওপর জলের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। উপত্যকা দিয়ে এই জল নেমে আসছে নিচের দিকে। ফলে নেপালবাসীকে বারে বারে এই কঠিন পরিস্থির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিনে তেমন বৃষ্টি হয়নি উত্তর নেপালে। এমনকী, রাসুয়ায় বুধবার সকালেও ছিল রোদ ঝলমলে আবহাওয়া। তার মধ্যেই কোনও আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই তিব্বত থেকে নেমে আসা বিপুল জল ও কাদার স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় রাসুয়া-সহ উত্তর নেপালের একাধিক জেলা। প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে রাসুয়া জেলার প্রায় এক ডজন গ্রাম। প্রাথমিক ভাবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, রাসুয়ায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাতের কারণে এই বন্যা হয়নি। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে তিব্বতের দিকে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তার জেরে বাঁধ ভেঙে যায়। সেই বাঁধ ভাঙা বিপুল পরিমাণ জল ও কাদামাটির স্রোত হঠাৎ কোশি নদীতে ঢুকে পড়ে এবং ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। তবে এ ছাড়া কোনও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে জল নেমে এসেছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
আবহবিদদ সুজীবের মতে, ‘বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরেও যখন নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে তখন সেটিও নেপালের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। ফলে নেপালেই নিম্নচাপের মূল ভরকেন্দ্র হয়েছে। বিগত ২৪ ঘন্টায় নেপালে বৃষ্টি হয়েছে ৬০০ মিলিমিটারের বেশি। এই পরিমাণ জলকে ধরে রাখার ক্ষমতা এই উপত্যকা ভূমির নেই। এখানকার শিলা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গিয়েছে। ফলে যখন জল প্রবাহিত হচ্ছে তখন প্রচুর পরিমাণে মাটি এবং শিলা জলের সঙ্গে ধুয়ে চলে আসছে।’

Sumit Chakraborty: