শনিবার | ১১ এপ্রিল ২০২৬

গল্প : অসহায় নারী

 গল্প : অসহায় নারী

নির্মল অধিকারী

স্বপন বিয়ে করেছে মিথ্যে বলে, নমিতা এটা ভাবতেই পারেনি। অসংখ্য নমিতারা এই জায়গায় ভুল করেন। এটাকে ‘বাইকের প্রেম’ বলা যায়। বয়সের দোষ বা জৈবিক চাহিদা বা ফলস্ অর্থনৈতিক আনন্দের ফাঁদে পা দিয়ে নমিতারা আজ দিশেহারা, জীবনহারা। সর্বস্ব খুইয়ে, এখন নমিতা সন্ধ্যারাতের ছোট্ট একটা দোকানের মালিক। প্রথম প্রথম লজ্জায় স্বামী স্বপন আসতে চাইত না, কিন্তু যখন দেখল সংসারের মূল উপার্জন এর উপরেই নির্ভর করছে, ধীরে ধীরে দোকানটায় সামিল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে নমিতাকে একটু আদরের সুরে বলে, ‘তুমি আমাকে বাঁচালে।’ নমিতার কিছুই বলার থাকে না। রাত্রিতে নীরবে নিজেকে স্বপনের দেহটায় সমর্পণ করে দেয়। নমিতার আর নমিতাদের অনেকের জীবন এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বা চলতেও থাকবে। জীবনটা শেষ হওয়ার নয়, তাই চলছে, চলবে।
লাল বাহাদুর ক্লাব পেরিয়ে ব্রিজের ঠিক গোড়াটায় নমিতার দোকান। একটা টেবিলে সাজানো দোকান। পুলিশ প্রায় প্রত্যেকদিন দোকান ভেঙে নিয়ে চলে যায়। বৃষ্টি নামলে মহা সর্বনাশ! অবশ্য আজকাল স্বপন এ কাজে খুব সাহায্য করছে। আর যে উপায়ও নেই। প্রথম প্রথম নমিতা বলত, ‘চলো একপাট্টি হয়ে যাক।’ হরমোন্যাল সহবাস খুব বেশিদিন ভালো লাগেনি। আজকাল এই কথাগুলি, সে সব ভুলে গেছে। গভীর সংসার তাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে। পাশের ঘরের মিতু দিদি, সম্পর্কে নমিতার বড় জা, তার বাবা ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘কীরকম আছিস?’ নমিতারও মাঝে মাঝে মনে হয় বাবা ফোন করুক। ভেগে আসার পর তার বাবার সঙ্গে এখনো কথা হয়নি। যোগাযোগ বন্ধ আছে। বাবা-মার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে হয়। কিন্তু নিজের কপাল নিজেই খুঁড়ায়—লজ্জায়, ঘৃণায় কাউকে কিছু বলার নেই। কিছু ছাড়তে চাইলেও, এটা তার কাছে জীবনে হেরে যাওয়ার সামিল হবে। নমিতা ইউটিউবে একটা মেসেজ দেখেছিল, ‘পরিস্থিতি যেখানেই যাক, স্বামী-স্ত্রীর না খেয়ে হলেও ডিভোর্স নেওয়া উচিত নয়। সংসার করা উচিত, কারণ ডিভোর্সি নারীদের প্রতি সমাজ একটু অন্যরকমভাবে তাকায়। দেহটার বিশ মিনিটের দায়িত্ব সবাই নিতে চায়, কিন্তু পুরো জীবনের দায়িত্ব একমাত্র স্বামীই বহন করেন।’ তাই সবার মতো স্বামীকে দেবতা ভেবে নমিতা সংসার শুরু করেছে। এ সংসারটা বহন করা কঠিন, তার আশা খুব সহসাই সহজতর একটা পথ বের হবে। নমিতা আপাতত এটুকু নিয়েই বেঁচে আছে।
প্রতিদিনকার মতো, একটা ছোট স্কুটি করে দু’টি মেয়ে নমিতার দোকানে চা খেতে এসেছে। কোনো পুরুষ তাদের সঙ্গে দেখা যায় না। টাইট পোশাক পরা থাকে। শরীরের ভাঁজগুলি দু’জনকেই অফুরন্ত সেক্স দিয়েছে। ওটা বাইরে থেকে দেখেও নমিতা বুঝতে পারে। সে মনে মনে আরও ভাবে, দু’জন দু’জনের খুব নিকট বান্ধবী হতে পারে। বা, যুগের পরিবর্তনে আজকাল সমকামী ধারণাও এসেছে। ওদের হাবভাবে মনে হয়, ওটাও হতে পারে। নমিতা চা-বিস্কুট দেওয়ার বাইরে কখনো তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথা বলেনি। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে তাদেরকে দেখেছে। তাদের স্বাধীন জীবন, ওটা দেখে তার হিংসেও হয়। আবার ভবিষ্যৎ জীবনে তাদের সমস্যাগুলি কী হতে পারে, ভেবে কোনো সমাধানেও পৌঁছতে পারে না। নমিতা একটা ইনফিরিয়র চিন্তা-ভাবনা নিজের মধ্যে আটকে রাখে। মনে মনে ভাবে, তার সম্পর্কে বা স্বপনের সম্পর্কে হয়তো বা ওরাও অনেক কিছু ভাবছে! একটু দয়াশীল হয়ে দু’কাপ চা, দু’টো বিস্কুট, মোট ত্রিশ টাকার একটা খাওয়ার চাহিদা নমিতার দোকান থেকে ওরা মিটিয়ে নেয়। হয়তো বা নমিতার কষ্টের জীবনটা ওদের কাছে মনে মনে ধরা পড়েছে। তাই হয়তো ওরা প্রতিদিন আসে। এরকম আগডুম বাগডুম অনেক চিন্তা করতে করতে নমিতার সন্ধ্যাবেলাকার চায়ের ব্যবসাটা শেষ হয়। বহু লোক আসেন। নমিতার আদা চায়ের ডিমান্ড আছে। শুধু ডিমান্ড নেই নমিতার। এক অসহায় নারী সমাজকে কিছু একটা বলতেও চাইছে। কে শুনবে? শোনার কেউ নেই। তাই মনের কথা মনে রেখে আজ নমিতা ছোট সফল ব্যবসায়ী। বাইকের প্রেমিকা নয়, বাস্তবের এক লড়াকু সাহসী নারী। নমিতা আরও ভাবে, তার অসহায়ত্বকে কেউ কেউ হয়তো বা সালামও জানায়। এরকম ভালো লোকও পৃথিবীতে আছেন। পৃথিবীর ‘ফুয়েল ট্যাঙ্ক’ ওই ভালো লোকেরা। তাদের জন্যই নমিতারা আজও বেঁচে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *