মঙ্গলবার | ২৮ এপ্রিল ২০২৬

বিপন্ন সংলাপ

 বিপন্ন সংলাপ

সংবিধান ও গণতন্ত্র- আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের এই দুই স্তম্ভ একে অপরের পরিপূরক বলেই বিদ্বজ্জনেদের বিশ্বাস। শাসনতন্ত্র নাগরিককে অধিকারের সুরক্ষা দেয়, আর গণতান্ত্রিক চর্চা সেই সংবিধানকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখে। পাঠ্যবই থেকে সংসদীয় ভাষণ, আদালত থেকে রাজনীতির প্রাঙ্গণ- সর্বত্র এই আন্তঃসম্পর্কিত সমীকরণের মাহাত্ম্য ঘোষিত। কিন্তু গোলযোগ বাধে যখন দেখা যায়, সংবিধানের রক্ষাকবচগুলিই ক্রমে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। আইনের অনুশাসন যখন সামাজিক সংলাপকে স্তব্ধ করে দেওয়ার যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়, তখন ‘বিড়ালের রুমাল’ হয়ে যাওয়ার অলৌকিকতা আর বিস্ময় জাগায় না। ভারতীয় গণতন্ত্রের বর্তমান প্রহরে সেই বিবর্তনেরই এক অদ্ভুত ও আশঙ্কাজনক রূপরেখা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, সংবিধান রচনার মাহেন্দ্রক্ষণেই দূরদর্শী নেতৃবৃন্দের একাংশ রাষ্ট্রকে অতি-শক্তিশালী করার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সেই সাবধানবাণী অরণ্যে রোদন হয়েই থেকেছে। আমলাতন্ত্রের হাতে অসীম ক্ষমতা অর্পণ এবং মৌলিক অধিকারের পরিসরকে সঙ্কুচিত করার আইনি ছিদ্রপথ রেখে দেওয়ার খেসারত আজ দিতে হচ্ছে। একদা ভাবা হয়েছিল, বিচারবিভাগ হবে নাগরিক অধিকারের শেষ দুর্গ। কিন আজকের বাস্তব চিত্রটি কিঞ্চিৎ ভিন্ন। একাধিক বিচারবিভাগীয় রায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বন্দিদের বিনাবিচারে কারারুদ্ধ রাখা-এই সকল ক্ষেত্রেই আইনের ‘বৈধতা’র ছাপ স্পষ্ট। প্রশ্ন জান সংবিধানের বর্ণিত অক্ষর রক্ষা করতে গিয়ে আমরা কি তার আত্মাকেই বিসর্জন দিচ্ছি না? সত্য এই যে, বিচারবিভাগ ও শাসনবিভাগের সমান্তরাল চলন শেষ পর্যন্ত নাগরিকের গণতান্ত্রিক পরিসরকেই সঙ্কুচিত করে ফেলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমান রাজনীতির আঙিনা থেকে শুধু আলাপচারিতা ও সংলাপের নির্বাসন। আইন যখন শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে সমাজের কথোপকথন বন্ধ করে দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভিতর থেকেই এক প্রকার কর্তৃত্ববাদের জন্ম হয়। গণতন্ত্রের ভিতর থেকেই আবির্ভাব হয় কর্তৃত্ববাদের। সংবিধানকে খর্ব বা ধ্বংস করে স্বেচ্ছাতন্ত্র আসে না। সংবিধানের রাস্তা ধরেই প্রতাপশালী কর্তৃত্বের উদয় হয়। ‘কড়া শাসন না থাকলে গণতন্ত্র অচল’- এই যুক্তির আড়ালে আসলে সংলাপহীন এক মরুভূমি তৈরি করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, সর্বত্রই আজ এক জবরদস্ত শাসনের মহড়া। পশ্চিমবঙ্গে ভোটাধিকার হারানো অগণিত মানুষের আর্তনাদের হাহারব শুনে মনে হচ্ছে, মানুষ মরে পড়ে থাকুক কিংবা পরিযায়ী শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভাসুক- ভোটার তালিকার ‘শুদ্ধিকরণ’ ও সামরিক কায়দায় নির্বাচন পরিচালনা করাই যেন রাষ্ট্রের পরম লক্ষ্য। অধিকারবোধ যখন ন্যায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল আইনি লড়াইয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক যত্ন লোপ পায়। অতিমারির সেই দুঃসহ দিনগুলির কথা স্মরণ করা যেতেই পারে; যখন পুলিশ, আদালত বা আইনের নিগড় নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক সংলাপ ও সহমর্মিতাই জীবনদায়ী হয়ে উঠেছিল। অথচ আজ রাষ্ট্র সেই নাগরিক সমাজকেই পুলিশি প্রহরায় রাখতে সমধিক আগ্রহী। আইনি স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই জুটছে ‘সংবিধান-বিরোধী’ তকমা।
প্রশ্ন জাগে, সংবিধান কি তবে কেবল এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের দণ্ডবিধি হয়েই থাকবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের কণ্ঠস্বর ও সংলাপ যদি কেবল আইনের দোহাই দিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, বে সেই শাসনতন্ত্রের সার্থকতা কোথায়? পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রদান আজ দুই বিপরীতমুখী বোধের সংগ্রামক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে জবরদস্ত শাসনের আইনি দাপট, অন্যদিকে নাগরিকের প্রায় সংলাপী অধিকার। শাসকের অসি অপেক্ষা নাগরিকের – ও কণ্ঠ যদি আজ অধিকতর দুর্বল প্রতিপন্ন হয়, তবে তা কেবল সংবিধানের পরাজয় নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতার অন্ধকারেরই ইঙ্গিতবাহী। শিরোনামহীন এই সঙ্কটের উত্তর মহাকালের গর্ভে নিহিত লও, বর্তমানের প্রশ্নগুলি কিন্তু অত্যন্ত কর্কশ ও অনিবার্য।
শাসনযন্ত্র ও বিচারমঞ্চের কাছে আজ বিনম্র জিজ্ঞাস্য- আইনের ব্রক্ষা করতে গিয়ে তার আত্মাকে বলিপ্রদান করা কি আধুনিক সভ্যতার অভিপ্রায়? ক্ষমতার দাপট যদি সহমর্মিতা ও নাগরিক কে গ্রাস করে নেয়, তবে সেই জবরদস্ত শাসনের সার্থকত ? উত্তরটি হয়তো মহাকালের গর্ভে নিহিত, কিন্তু বর্তমানে দশ্বাস নীরবতা যে এক গভীরতর সঙ্কটের ইঙ্গিতবাহী, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ক্ষমতার অলিন্দে বসে যারা দেশ না করেন, তারা কি এই ‘বিবেকের দংশন’ অনুভব করবেন,নাকি কেবল আইনি নিগড়েই গনতন্ত্রকে বন্দি রাখতে সচেষ্ট থাকবেন- সময় আজ সেই কঠোর উত্তরেরই প্রতীক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *