বিপন্ন নাগরিকতা
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি রণাঙ্গন আজ এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতার সাক্ষী।সে প্রতিযোগিতা শিল্পায়নের নয়, কর্মসংস্থানের নয়, বরং কে কত অধিক মূল্যে নাগরিকের ‘আনুগত্য’ ক্রয় করতে পারে তারই এক নির্লজ্জ মহড়া। শাসকদলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর পাল্টা প্রধান বিরোধী শিবির ভারতীয় জনতা পার্টির মাসিক তিন হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি কার্যত এ কথাই প্রমাণ করে যে, রাজনীতির কারবারিরা আজ জনকল্যাণকে ‘অধিকার’ থেকে বিচ্যুত করে ‘খয়রাতি’র পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। এই যে নগদ হস্তান্তরের অন্তহীন প্রতিশ্রুতি, এরই নামান্তর হলো ‘আশ্রয় রাজনীতি’ বা শেল্টার পলিটিক্স। যেখানে রাষ্ট্র ক্রমে অভিভাবকের পরিবর্তে ‘অন্নদাতা’-র ভূমিকায় প্রকট হয়, আর নাগরিক রূপান্তরিত হন কেবল এক অনুগৃহীত প্রজায়।
তাত্ত্বিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রকে পুষ্ট করার কথা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিকল্পসমূহ বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় বা অন্তর্দ্বন্দ্বে জীর্ণ হয়, তখন নাগরিক সমাজ আদর্শের মায়া ত্যাগ করে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার আশ্রয়ে শাসককুলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি কোনো রাজনৈতিক জোটবদ্ধতা নয়, বরং অনিশ্চিত ভবিষ্যতে আত্মরক্ষার এক প্রকার ‘বিমা’। দুর্নীতির পাহাড় কিংবা অপশাসনের অভিযোগ সত্ত্বেও শাসক যখন তার নির্বাচনি ভিত্তি অটুট রাখতে পারেন, তখন বুঝতে হবে, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি এখানে কেবল অনুদান নয়, বরং রাজনীতির ‘ডেলিভারি মেকানিজম’, অধিকন্তু আনুগত্যের এক শৃঙ্খল। মমতা সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা যুবসাথীর মতো প্রকল্পসমূহ কর্মহীনতার এই দুঃসময়ে পরিবারগুলিকে সাময়িক স্থিতিশীলতা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বা পরিকাঠামো উন্নয়নের পথকেই রুদ্ধ করছে।
বিপত্তি বাধে তখনই, যখন এই প্রকল্পগুলি সর্বজনীন আইনি অধিকারের পরিবর্তে স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার শিকারে পরিণত হয়। নথিপত্র তৈরি থেকে শুরু করে অভিযোগ নিষ্পত্তি সর্বত্রই যখন শাসকদলের ছায়া বর্তমান থাকে, তখন সাধারণ মানুষ অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞানে উপলব্ধি করতে পারে যে, ভিন্নমত পোষণ করা মানেই আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি গ্রহণ করা। ফলে অ্যালবার্ট হার্শম্যান কথিত সেই ‘কণ্ঠস্বর’ (ভয়েস) ক্রমে ক্ষীণ হতে থাকে এবং নাগরিক বাধ্য হয়ে ‘আনুগত্য’ (লয়্যালটি) প্রদর্শন করেন। এই ব্যবস্থায় গণতন্ত্র তার রূপ বজায় রাখলেও সারবস্তু হারিয়ে ফেলে। তথাকথিত এই ভোগকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা নাগরিককে ক্ষণিকের স্বস্তি দিলেও তাকে একপ্রকার নিম্নমানের স্থিতাবস্থার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে মগজ অপেক্ষা জঠরের দাবিই বড় হয়ে ওঠে।
সেই সঙ্গে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হয়ে দেখা দেয় যে, এই ব্যবস্থার দায়ভার শেষপর্যন্ত কার? রাষ্ট্র যখন উপভোক্তা তৈরির নেশায় মত্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলি যখন কেবল নগদ মূল্যে ভোট কিনতে তৎপর, তখন নাগরিক সমাজ কি তার নিজস্ব সত্তা বিসর্জন দিয়ে কেবল ‘প্রজা’ সেজে থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে? প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের কাছে আজ বিনম্র জিজ্ঞাস্য- জনকল্যাণকে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা থেকে মুক্ত করে প্রকৃত অধিকারের মর্যাদা দেওয়া কি আজ নিতান্তই অসম্ভব? প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে আমরা কি আসলে এক মধ্যযুগীয় পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতিকেই ফিরিয়ে আনছি না? নাগরিক যদি অজানতেই নিজের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে কেবল অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে পড়েন, তবে সেই গণতন্ত্রের কঙ্কালসার চেহারাই কি আগামীর ভবিতব্য? উত্তরটি হয়তো আমাদের প্রত্যেকের অন্তর্নিহিত আত্মসম্মানবোধের মধ্যেই নিহিত আছে। ক্ষমতার দাপট ও প্রতিশ্রুতির বন্যায় যদি নাগরিকতা ভেসে যায়,তবে
জয়ী পক্ষ যে-ই হোক না কেন, পরাজিত হবে স্বয়ং গণতন্ত্রই।
পরিশেষে এই প্রশ্নটিই অধিকতর প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যে, খয়রাতির এই মোহিনী মায়া কি তবে শেষ পর্যন্ত নাগরিকের সার্বভৌম সত্তাকেই গ্রাস করে নেবে? রাষ্ট্র যখন অধিকারের পরিবর্তে অনুদান দিয়ে জনমানসের আনুগত্য কিনতে সচেষ্ট হয়, তখন সেই ব্যবস্থার নাম আর যাই হোক, অন্তত ‘গণতন্ত্র’ হতে পারে না। নীতিনির্ধারকদের কাছে আজ সনির্বন্ধ জিজ্ঞাস্য – কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের পথ রুদ্ধ করে কেবল নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে কতকাল এই ‘আশ্রয় রাজনীতি’র তরণী বাওয়া সম্ভব? যে নাগরিক সমাজ একদা স্বাবলম্বনের স্বপ্ন দেখত, তাদের চিরস্থায়ী ‘প্রজা’ বা অনুগ্রহপ্রার্থী করে তোলার এই সুকৌশলী প্রচেষ্টা কি আখেরে সভ্যতার পশ্চাদপসরণ নয়? উত্তরটি হয়তো মহাকালের গর্ভে নিহিত, কিন্তু বর্তমানের এই ‘খয়রাতি’র উল্লাস যে এক গভীরতর নৈতিক দেউলিয়াশৈলীরই ইঙ্গিতবাহী, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ক্ষমতা যেন বিস্মৃত না হয় যে, জঠরের ক্ষুধা নিবারণের নামে মগজের স্বাধীনতা হরণ করা প্রকারান্তরে এক ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী চাতুরী মাত্র।