শুক্রবার | ২৯ মে ২০২৬

“ভাঙছে শিক্ষার মেরুদণ্ড”

 “ভাঙছে শিক্ষার মেরুদণ্ড”


স্বাধীনতার অমৃতকাল পার হয়ে এসেও ভারতবর্ষের স্কুলশিক্ষা যে ‘এক তিমিরবিনাশী ‘নেই-রাজ্য’-এর অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে, নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্টটি আসলে তারই এক অমোঘ ও সরকারি সিলমোহরযুক্ত দলিল। ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এই খতিয়ানে শিক্ষার যে কঙ্কালসার রূপটি প্রকট হয়েছে, তা কোনও বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক চাতুরি নয়, বরং খোদ শাসনযন্ত্রের নিজের ঘরের আয়নায় ভেসে ওঠা এক লজ্জাজনক প্রতিবিম্ব। সংস্কারের পর সংস্কার এবং ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র তারস্বরে প্রচারের সমান্তরালে দেশের সিংহভাগ প্রান্তিক শিক্ষার্থীর একমাত্র ভরসা সরকারি বিদ্যালয়গুলির এই দেউলিয়া দশা কেবল উদ্বেগের নয়, গভীর বেদনারও।

রিপোর্টের পরিসংখ্যানগুলি যেন এক একটি চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় গরিমার পিঠে। প্রাথমিক স্তরে সাত লক্ষাধিক স্কুলের সমারোহ থাকলেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র পৌনে এক লক্ষে। অর্থাৎ, বিদ্যার অলিন্দে প্রবেশের দ্বার যতটা উন্মুক্ত, উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পথ ততটাই কণ্টকাকীর্ণ ও সংকুচিত। ফলস্বরূপ, প্রতি দশ জনের মধ্যে চার জনই উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি ছোঁয়ার আগে স্কুলছুট হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ, অরুণাচল বা আসামের মতো রাজ্যে এই ‘ড্রপ-আউট’-এর ব্যাধি আজ মহামারির আকার ধারণ করেছে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘অবৈতনিক’ শিক্ষার মরীচিকা যেই শেষ হয়, অমনি চরম আর্থিক অনটন আর দূরবর্তী স্কুলের অভাব কিশোর-কিশোরীদের ছুড়ে ফেলে দেয় অন্ধকারের খাদে।

ততোধিক বিচিত্র ও করুণ দেশের শিক্ষক-সংকটের চালচিত্র। গ্রামীণ ভারতের এক লক্ষেরও বেশি বিদ্যালয় আজ ‘এক-শিক্ষক’ চালিত

যেখানে শিক্ষকের প্রধান যোগ্যতা সম্ভবত একই সঙ্গে সর্ববিদ্যাবিশারদ এবং সুনিপুণ জাদুকর হওয়া! বিহারে যেখানে দুই লক্ষাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে ধুলো জমছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ বা তেলেঙ্গানায় দেখা মিলছে ‘ভূতুড়ে স্কুল’-এর – যেখানে অট্টালিকা আছে, শিক্ষক আছেন, কেবল শিক্ষার্থীর আসনটি খাঁ খাঁ করছে। অধিকন্তু মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রয়েছে অ-শৈক্ষিক কাজের বোঝা। সমীক্ষা, নির্বাচন আর নানাবিধ প্রশাসনিক কেরানির কাজে যদি শিক্ষাবর্ষের চৌদ্দ শতাংশ দিন নষ্ট হয়, তবে শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠন যে এক প্রহসনে পরিণত হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

কিন্তু এর চেয়েও বড় লজ্জা বোধহয় পরিকাঠামো ও মৌলিক চাহিদার চরম দৈন্য। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও দেশের প্রায় এক লক্ষ স্কুলে ছাত্রীদের জন্য পৃথক শৌচালয় নেই, সোয়া লক্ষের কাছাকাছি বিদ্যালয়ে পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো, আর পনেরো হাজার স্কুলে শিশুরা এক গ্লাস পরিশ্রুত পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। রাজস্থানের ঝালওয়ারে স্কুলের ছাদ ভেঙে শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই দেশের সরকারি স্কুলগুলি আজ কতটা বিপজ্জনক মরণফাঁদ। বিজ্ঞান গবেষণাগারহীন ৫১.৭ শতাংশ স্কুল এবং কোনওরকম বৃত্তিমূলক দক্ষতা ছাড়াই স্কুলছুট হওয়া কোটি কোটি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ যে কেবল সম্ভা শ্রমের বাজারে ব্রাত্য হয়ে থাকা, তা বুঝতে কোনও অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

সবচেয়ে বড় আঘাতটি অবশ্য এসেছে শিক্ষার গুণগত মানের মূল্যায়নে। যে দেশের অষ্টম শ্রেণির ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক পড়তে পারে না, কিংবা অর্ধেকেরও বেশি পড়ুয়া একটি সাধারণ ভাগ অঙ্ক করতে অক্ষম, সে দেশের বুনিয়াদি শিক্ষার ভিতটি যে কতটা বালির উপর দাঁড়িয়ে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ, এই সামগ্রিক ধ্বংসস্তুপের সমান্তরালেই গত পাঁচ বছরে দেশে প্রায় উনিশ হাজার সরকারি স্কুল নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেছে, আর ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে সাড়ে আট হাজার নতুন বেসরকারি স্কুল। সরকারি শিক্ষা যখন ডুবন্ত, বেসরকারি পুঁজি তখন তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে মহানন্দে।
শিক্ষা যদি সত্যিই কোনও সভ্য রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হয়, তবে ভারতের সেই মেরুদণ্ডটি আজ ক্ষয়ে ক্ষয়ে খসে পড়ছে। এই চরম অধোগতির দায় কি কোনও শাসক এড়াতে পারেন? প্রশ্ন এখানেই, যে দেশে কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের জীবনধারণ সরকারি দাক্ষিণ্য ও ভরতুকির উপর নির্ভরশীল, সেখানে বুনিয়াদি শিক্ষাকে এমন সুপরিকল্পিতভাবে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া কি এক ঐতিহাসিক অপরাধ নয়? আত্মনির্ভরতার গালভরা স্লোগান আর বিশ্বগুরুর আসন অলঙ্কৃত করার উদগ্র বাসনা কি তবে কেবলই এক নির্বাচনি চটক? শাসনযন্ত্রকে আজ এই নৈতিক কাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে জবাব দিতেই হবে- সরকারি স্কুলগুলির এই পরিকল্পিত অপমৃত্যু কি তবে গরিবের সন্তানকে চিরতরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রাখার এক অলিখিত চক্রান্ত? বিবেক জাগ্রত হোক, কারণ যে দেশের শৈশব বর্ণপরিচয় ভুলতে বসেছে, তার ভবিষ্যৎ কোনও দিন উজ্জ্বল হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *