পুস্তক সমালোচনা : সাগর শর্মা
পর্ণমোচী জীবন শেষেও জেগে থাকে কবির কবিত্ব
অনেকে বলেন, জীবন হল প্রবাহী। তার প্রবাহ নদীর মতো। প্রবাহিত হতে হতে একদিন মিশে যায় তার লক্ষ্য তথা সমুদ্রে। এই মিশে যাওয়া কি তার নিজস্বতাহীন হয়ে পড়া নাকি সমুদ্রে মিশে যাওয়াই তার চরম পরিণতি সে নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। কিন্তু অনন্ত প্রবাহকে বোঝাতেই কবি সুমন্ত ঘোষ “স্রোতস্বিনী এই জীবন” কবিতায় লিখলেন, “বয়ে যায়,বয়ে যায়,বয়ে যেতে হয়।”, এখানে বয়ে যাওয়ার কথা দু’বার উল্লেখ করাতে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। এই বয়ে যাওয়াই নিরন্তরতা যা থামে না লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত। বয়ে যাওয়া প্রকৃতি কর্তৃক নির্ধারিত তাই মানুষের মতো কবিও তার বাধ্য। তবে এই বহমানতা কেবল নদীর নয়, হয়তো জীবনেরও। কেননা সময়রূপী যে নদী সেই নদী পাড়ি দেবার জন্যই বয়ে যেতে হয় আমাদের। এই বহমানতাই জীবন, তার পরেই মৃত্যু।
স্পষ্টতই এখানে মৃত্যুর কথা এনে ফেলেন কবি। গোটা কাব্যগ্রন্থেই মৃত্যুচেতনা ঘুরে ফিরে আসে। তবে তাতে আশার প্রদীপ নির্বাপিত হয় না। বাস্তবকে স্বীকার করেই কবি বলেন, “বিষাদ না জাগলে/বাষ্প থেকে অশ্রুকণার জন্ম হয় না,/চোখের কোনে শিশির না জন্মালে/বিষণ্ণ বিকেলে আর/গোধূলি দেখা হয়ে উঠে না।” অর্থাৎ যা সত্য তাকে মেনে নিয়েও কবি আলোর পথ অবরুদ্ধ করেননি। চাইলে অবশ্যই করতে পারতেন কিন্তু ভাষা ও বিষয়ের নান্দনিকতা তাকে তা করতে দেয় না। মৃত্যুকে নিয়ে তিনি বারবার ভাবেন তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই ঘুরপথে আলোর প্রয়োজনীয়তায় অন্ধকারের অনুভব স্বীকার করে ফেলেন। তাঁর কাছে মৃত্যু তাই কোনো যন্ত্রণা নয়, নতুন দ্বার উন্মোচিত হবার সন্ধিক্ষণ। তারপর যখন বলেন কবিপক্ষ পার হয়ে গেলে সব আলো নিভে যাওয়ার কথা সেই আলো অবশ্যই জীবনের তবে আশার আলোয় মুগ্ধ হয়ে কবি দোর খুলে চলে যান অপর পক্ষে যে পক্ষের শেষে থাকে আবার আলো তথা পূর্ণিমা। এই আলোআঁধারির খেলা চলতেই থাকে তা কবি জানেন বলেই দুটিকে সঙ্গে করেই এগোতে চান। তাই কবির মৃত্যু হয় কিন্তু তার কবিত্ব দুই পক্ষ জুড়েই বিদ্যমান থাকে। “কবিপক্ষ” শব্দটি বহুল ব্যবহৃত নয়, কবিতার প্রথম দিকে এই শব্দের ব্যবহার কবিতার সঙ্গে সময় এবং আধ্যাত্মিকতাও যুক্ত করে। এই আধ্যাত্মিকতা ধর্মীয় নয়, ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে মুক্ত এবং তা সর্বমানবের। কবির মতে কবির জন্ম কবিতার কোলে এবং মৃত্যুর পর সেই কোলই তার ঠিকানা।
কবিতার বিষয়ের ক্ষেত্রে এভাবেই গোলাকার পরিসমাপ্তির পথে ধাবিত হন কবি। তবে এই সমাপ্তি বিষয়গত। উপস্থাপনার বিচার করলে দেখা যায় কবিতায় বিমূর্ততা রয়ে গেছে। এর পেছনেও দায়ী সময়। এই অসমাপ্তি প্রায় উত্তর আধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জন্ম ও মৃত্যু যদি কবিতা হয় তাহলে কবির ভাষায় জীবন হল পর্ণমোচী। পর্ণমোচী উদ্ভিদের পাতার মতো ঝরে যায় প্রতিটি প্রাণীর জীবন। ঋতু তথা সময়ের উপর নির্ভরশীল এই জীবন তাই তার পক্ষে কখনোই চিরহরিৎ বনভূমি হওয়া সম্ভব নয়। তাই পাতাঝরা অরণ্যের মতো জীবনের শেষ পাতা ওল্টাতে হয় সবাইকেই। এখানেই মানুষের সঙ্গে এক হয় প্রকৃতি। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির একাত্মতা রোমান্টিক যুগের ফসল হলেও সাহিত্যে কোনো “ism”-ই শেষ কথা নয় তাই কবির এই কবিতা প্রাসঙ্গিক আজও। “চুপকথা” কবিতায় কবি লেখেন, “অরণ্যে মিশে গিয়ে, একজোড়া গাছ হয়ে যাই।” এখানে আত্মিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে কবি নিজেকে কোনো “বাদ”-এ সীমাবদ্ধ না রেখে সহৃদয়তার পরিচয় দেন। মহত্ত্ব বরাবরই প্রশস্ত করে কবিহস্ত। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেলে মানুষ আশ্রয় নেয় প্রকৃতির। কবিও তাই বললেন, বললেন চুপ হয়ে যাবার কথা। এই নীরবতাও অর্থবহ যা আসলেই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। তাই নীরবতাকে দুর্বলতা বললে ভুল হবে। এই নীরবতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সব উত্তর। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন কখন কোন উত্তর প্রদান করতে হয়। কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয় তার নামকরণে প্রতিভাত হয়েছে। “উজান” শব্দটি পুনরায় সচকিত করে। হতচকিত পাঠককে আবার সেই নদীর কাছেই ফিরতে হয়। কবির মতো বয়ে চলতে চলতে পাঠক প্রকৃত জীবন খুঁজে পান যে জীবন এগিয়ে চলে মৃত্যুর দিকে। কবির কবিতা এভাবেই ভাষা খুঁজে পায়, খুঁজে পায় সেই গতিপথ যা তাকে তার লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চালিত করতে সক্ষম হয়। সচেতন এই কবির কবিজীবন দীর্ঘায়িত হোক।
উজান বেয়ে যাই
সুমন্ত ঘোষ
নীহারিকা প্রকাশনী
আগরতলা
মূল্য:- ১৭০ টাকা