বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬

পুস্তক পর্যালোচনা : এ জীবন এক ভালোবাসার গল্প

 পুস্তক পর্যালোচনা : এ জীবন এক ভালোবাসার গল্প

দেবযানী ঘোষ

সুতপা দাসের ‘নিম পাতার ঝোল অথবা কাসুন্দি’ উপন্যাসটি পড়লে মনে হয় উপন্যাস নয়, কোনো কবিতা পড়ছি। ভাষা এবং বর্ণনার কাব্যধর্মিতার শব্দে বাইরের কোলাহলকে ছাড়িয়ে ভিতরের বৃষ্টিপাতের আওয়াজ শোনা যায়। কাহিনিকে গুরুত্বহীন করে দিয়ে এক কাব্যিক আচ্ছন্নতা ঘিরে ধরে কুয়াশার মতো। পড়তে পড়তে মনে ভেসে ওঠে বহুকাল আগে পড়া ‘খোয়াবনামা’-র কথা। মনকথা লিখেছে উপন্যাসের চরিত্ররা। অন্ধ হরিদাস, তিষ্য, শাক্য, অনুসূয়া—সবাই মনকথা লেখে। মনের গভীরে একা মানুষ অন্য মানুষ। সেখানে বাধা নেই, সামাজিকতার অবরোধ নেই, আছে নিজের সামনে নিজে দাঁড়ানোর অনন্ত স্বাধীনতা। চরিত্রের মুখোশ সরিয়ে উপন্যাসে সেই অন্য মানুষ ধরা দেয় পাঠকের চোখে। অন্ধ ভিখারি হাটে, বাজারে, বাড়িতে, বাসস্ট্যান্ডে শব্দ শুনে পাতার পর পাতা মনকথায় লেখে ‘জীবন এক ভালোবাসার গল্প’। আর লেখক লেখেন ‘আমি শীতযোনিতে না ডুবিলে তোমার মৃত্যু শুনতে পাবো না।’ এক চিরন্তন ভালোবাসা আর বন্ধনের উপন্যাস ‘নিমপাতার ঝোল অথবা কাসুন্দি’। কখনো মাটির টান, কখনো ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার যন্ত্রণা—সমস্তই লেখা হয় মনের পাতায় একান্তে, নীরবে, নিঃশব্দে, সবার অলক্ষ্যে।
অন্ধ ভিখারির মনকথায় নিঃশব্দে বৃষ্টিভেজা ভেতরখানা নিয়ে ঢুকে পড়ে অনুসূয়া দিদিমণি। দিদিমণির একটা ভালোবাসার মানুষ হারানোর যন্ত্রণা আছে গলার আওয়াজে। অন্ধ ভিখারির অন্তরে ধরা পড়ে সেই বেদনার সুরটি।
মনকথা কি শুধু অন্ধ ভিখারি লেখে শব্দ দিয়ে? লেখে না কি মজুমদার বাড়ির অন্য সদস্যারা? শাক্য বাবা দিব্যজ্যোতি মজুমদারের মৃত্যুতে ফিরে এসেছে বিলোনিয়ায়। এসেছে বড়ো দিদি নন্দা, মেজো দিদি রাই। আরও অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন সকলেই। সবাই সান্ত্বনা দেয় শাক্যকে। অথচ শাক্যের মনে ভেসে ওঠে এক পড়ন্ত বিকেলের ছবি। বাবা চার নম্বর পুলে দাঁড়িয়ে থাকতেন ফেলে আসা দেশের দিকে তাকিয়ে। “মাটির মায়া। দ্যাশের মায়া।” মানুষ তাকে পাগল বলত। বাবার সেই দেশের টান কি মিলেমিশে যাচ্ছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার শাক্যের ঘরে ফেরার মুহূর্তে বৃষ্টিভেজা রাতে? তিষ্য হায়দ্রাবাদ থেকে আসছে। তার মনে রাগ, অভিমান, লোভ। ‘হিসেবি, কঞ্জুস, কিছুটা খচ্চর’ তিষ্য সম্পত্তি চায় সেজোকাকার। সেই তিষ্যও বদলে দেয় মাটি। “লিঙ্গরাজ মন্দির কেন বদলে দিচ্ছে তার ভেতরের সব অভিমান। চোখ বেয়ে জমা জল গলে গলে ঝরে পড়ছে বুকের ভেতর। কান্নাগলা এক সমুদ্র পরিমাণ কথা বলতে বলতে অনুতাপ বেরিয়ে আসছে তার থেকে। এক মনস্তাপ।”
মানুষের মনে লুকানো আর এক মানুষ থাকে। তারা দুঃখে জেগে ওঠে, নিভৃতে জেগে ওঠে। বাকি সময়টা মানুষ তাকে সযত্নে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। এই দ্বন্দ্বই উপন্যাসের উপজীব্য। মজুমদার পরিবারের তিন পুরুষের কাহিনি—বিলোনিয়া থেকে আগরতলা। উলম্ব সময় আর আনুভূমিক ভৌগোলিক চাটাইয়ে আশ্চর্য সুন্দরভাবে বিছানো কাহিনির পটভূমি। দেশভাগ থেকে কোভিড-পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের ছায়ায় বহমান মজুমদার পরিবারের প্রতিটি চরিত্র নিজ নিজ স্থানে স্বতন্ত্র। যেন তাদের নিজস্ব বৃত্ত আছে। অথচ সেই বৃত্তগুলি একটা সাধারণ মাটির সঙ্গে যুক্ত। কাহিনির প্রয়োজনও সেইখানেই। সেজোকাকার সম্পত্তি চায় বাকিরা। খুব সাধারণ পারিবারিক জটিলতা। প্রতিষ্ঠিত শাক্যকে সম্পত্তির অধিকার ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয় সকলেই। স্বার্থ সবার আছে। কিন্তু সেই স্বার্থের কুচক্রের ভিতর থেকে উঁকি দেয় মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার বেদনা।
রাই, অনুসূয়া দিদিমণি—বোটানির শিক্ষিকা। যার কলমের ডগা বেয়ে নেমে আসে অক্ষর। স্বকীয়া প্রেমকে ছাপিয়ে উঁকি দেয় দ্বিধান্বিত এক প্রেমের ভাসমান আকাঙ্ক্ষা। “নিজের সঙ্গে কথা বলছিল রাই। নতুন কিছু নয়। এমন কথা রাতদিনই সে বলতে থাকে। কাটাকুটি খেলে। খেলতে খেলতে ডুবে যায়, ভেসেও কি যায়? যায় হয়তো। সেই যাওয়াটা উঠে আসে তার লেখায়—এই জীবন এক অনন্ত পাঁচালি।” লেখক পাঠককে নিয়ে যান লেখকের অন্তরের কারখানায়। সেখানে লিখিত হয় জীবন। লিখিত হয় প্রেম। লেখা হয় অনন্ত জিজ্ঞাসা। তার বাসনায় যখন-তখন ঢুকে পড়ে রোচিঞ্চু। রোচিঞ্চু শিল্পী। তার প্রেম ধাবমান ঘোড়ার মতো। দুরন্ত। বাধাহীন। মনে হয় সে লম্পট, কামুক, ব্যাভিচারী। সেই প্রেমের কাছে রাইয়ের সত্তা ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে বারবার। একদিকে বন্য আকর্ষণ, অন্য দিকে নৈতিক স্থবিরতা। দুটি ভিন্ন জগতের, ভিন্ন ভাবনার মানুষ। জটিল এই দ্বন্দ্বের অবসান নেই। সমাধান নেই। পাঠক ভাবতে বাধ্য হয়, তাহলে অন্য রকম সম্পর্ক কি হয় না? অমীমাংসিত কোনও সম্পর্ক কি হয় না? ‘আমার শুধু পথ চলাতেই আনন্দ!’ হাজারো প্রশ্ন রাইয়ের নিজের কাছে নিজেরও। সেজোকাকার মৃত্যু তাকে স্মৃতির পথ ধরে টেনে নিয়ে যায় অতীতে, যেখানে ছড়ানো আছে তার গোপন সম্পর্কের কষ্ট, আনন্দ। কখনও সুদীপ্ত, কখনও পার্থ, কখনও রোচিঞ্চু। সে কাঁদে। অঝোরে কাঁদে। কাঁদে সেজোকাকার জন্য, কাঁদে নিজের পাওয়া-না-পাওয়ার ভালোবাসার জন্য। এই ছটফটানিই তো তাকে লেখক বানায়—“সারা রাত আমি শুনতে পাই জলের ফুঁপিয়ে ওঠা। সারারাত বুকের ভেতর এক অনন্ত রাত্রি বানাই।” এই হল রাইয়ের গোপন অন্তর্জগত। এখানে অন্য এক প্রেম জেগে উঠে জিজ্ঞাসা করে—শরীর নাকি মন? প্রশ্নের সমাধান হয় না। না হওয়াটাই যে সবচেয়ে সুন্দর। এখানেই লেখক সুতপা দাসের সার্থকতা। পাঠকের সংস্কারী মনকে থমকে দাঁড়াতে হয় ঠিক এইখানটায়। রোচিঞ্চুর বন্য শারীরিক আবেদন তার ভালো লাগে। কিন্তু সংশয় তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় সীমন্তে। স্বীকার আর অস্বীকারের দোদুল্যমানতায় ক্ষতবিক্ষত অন্তর কি প্রেমেরই আর এক রূপ? শরীরের তৃপ্তি নাকি অন্তরের… নাকি সবটাই হাহাকার… সবটাই ক্ষণিকের… অথৈ ক্রন্দন। প্রেম সম্পর্কে লেখকের আধুনিক চেতনা এবং তা প্রকাশের ভঙ্গি পাঠককে মুগ্ধ করে।
রোচিঞ্চুর ডাকে সাড়া দেয়নি রাই। একবার, এক মুহূর্তের জন্য রোচিঞ্চু চেয়েছিল সমস্ত শরীর, মন, আত্মা, সমাজ, উচিত-অনুচিতের ঊর্ধ্বে উঠে রাই একবার তার ডাকে সাড়া দিক। শুধু প্রেমের জন্য। সেই প্রেমের শরীর থেকে ঝরে পড়ুক সমস্ত আগাছা। মৃত্যুর আগে চিঠিতে সেই কথা লিখেছিল রোচিঞ্চু। প্রশ্ন করেছিল, শরীরকে রাই এত ভয় পায় কেন? ওটা তো ট্যাবু ছাড়া আর কিছু নয়। লেখক রোচিঞ্চুর চিঠিতে সাজিয়ে দেন সেই অমোঘ উচ্চারণ—“অর্ধনারীশ্বর মূর্তি দেখেছো? শিব আর পার্বতী। শিব তার সমস্ত শরীর দিয়ে পার্বতীকে ধারণ করে আছেন, তার সমস্ত স্পর্শ লাগছে পার্বতীর শরীরে। পরম অশ্লেষে, পরম গভীরতায়। এইভাবেই তো নতুন পুরাতনকে স্পর্শ করে থাকে। মৃত্যু জীবনকে অথবা জীবন মৃত্যুকে। তুমি আমার হতে পারতে অন্তত এক মুহূর্তের জন্য। ন সো রমণ, ন হাম রমণী…”
এই উপন্যাস পাঠককে কাহিনি থেকে সরিয়ে এমন এক অনুভূতির স্তরে নিয়ে যায়, সেখানে সে ভাবতে বাধ্য হয়—প্রেম নারী নয়, প্রেম পুরুষ নয়, প্রেম শরীর নয়, প্রেম আত্মা নয়, প্রেম ত্যাগ নয়, প্রেম গ্রহণ নয়, প্রেম পাওয়া নয়, প্রেম না-পাওয়াও নয়…। প্রেম এক অনন্ত খোঁজ, অবারিত কান্না, এক নিঃশব্দ মনকথা।
নিমপাতার ঝোল অথবা কাসুন্দি
সুতপা দাস
প্রচ্ছদ : লেখক নিজে
প্রকাশক : গাঙচিল
মূল্য : ৪৫০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *