পুস্তক সমালোচনা : অনুভূতির অনুরণন
গৌরী বর্মন
‘জীবন এক খেলাঘর। খেলাঘরের দুয়ারে পড়ে না অর্গল। খোলা থাকে দক্ষিণের বাতায়ন। …কত সাথী আশেপাশে এসে বসে, হৃদয়ের বন্দন, রক্তের টান দুর্বার হয়ে উঠে।’ …লেখক, কথাকার স্বপনকুমার খাসনবীশের ‘খেলাঘরে একা’ গল্পগ্রন্থের প্রথম কয়েকটি ছত্রে লেখক এভাবেই নিজেকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন। নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ ‘খেলাঘরে একা’-তে পঁচিশটি ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প রয়েছে। নির্মোহ ভঙ্গিতে জীবনের ওঠা-পড়া, বেলা-অবেলার গল্প শুনিয়েছেন। কথাকার জীবনপুরের পথিক…জীবনের বিচিত্র পরতে ভেঙে না পড়ে জীবনকে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উদযাপন করতে আগ্রহী। নির্লিপ্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করাই জীবনপুরের পথিকের মূল দর্শন। এতেই খুঁজে পাওয়া যায় অপার স্বস্তি। কথাকার স্বপ্নমোহে জড়িত নন, জীবনকে এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে লালন করেছেন। তাঁর লেখনী শরতের রৌদ্রকরোজ্জ্বল ছায়াকে বরণ করে। তাঁর লালিত মনোরাগ জীবন ভালোবাসে।
“শিবনাথ আজকাল নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছেন। হয়তো বয়সের ধর্ম। নিজেকে নিয়ে যখন একান্তে বসেন, তখন অতীত তাঁর কাছে ভিড় করে আসে। ধূসর স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে শৈশব-কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া নির্ভার দিনগুলো।” লেখক ডুবে যান চাঁদপুর আর মেঘনার জলে। রাতের আকাশের ঝকঝকে তারার আলো মেঘনার ঢেউয়ে তোলে মায়াবী এক স্বপ্নকুহকক্ষণ। বিচিত্র রাগ, বহুধাভাবের সমাবেশ এই গল্পগ্রন্থটি— এক কথায় অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির মিলিত সংলাপ।
‘খেলাঘরে একা’ গল্পগ্রন্থটিকে আত্মজীবনী বলা যায়? না কি স্মৃতিকথা? আত্মজীবনী, স্মৃতিকথার উদাহরণ অনেক। তবে সহজভাবে বলা যায়, আত্মজীবনীতে জন্ম থেকে বর্তমান সময়ের এক ছবি থাকে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে থাকে সময়, পরিবেশ-পরিস্থিতি। স্মৃতিকথায় অনেক চরিত্রের সমাবেশ হয়— মূলত স্মৃতিকথা অনুভূতিকে প্রাধান্য দেয়, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নয়।
আলোচিত গল্পগ্রন্থটি লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভূতি ও স্মৃতির সরণি বেয়ে এগিয়ে গেছে। প্রতিটি কাহিনি আবেগপূর্ণ, আবার কখনো কখনো ব্যক্তিগত মতামতের প্রকাশও ঘটেছে। স্মৃতির সোপান বেয়ে চলার ছন্দে গল্পগুলি উজ্জ্বল। প্রতিটি গল্প বা কথা পাঠের পরে বয়স্ক পাঠকেরা হারিয়ে যাবেন ফেলে আসা দিনের অম্লমধুর স্মৃতির টানে। তরুণ বা নবীন পাঠকেরা খুঁজে পাবে অনাস্বাদিত নির্মল আনন্দ। আবার কখনো বা উড়ে যাবে কোনো এক অজানা আকাশে।
সীমান্ত রাজ্য ত্রিপুরা। দেশভাগ, লড়াই-সংগ্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অসংখ্য পরিবারের মতো লেখকও দেশভাগের ফলে জন্মমাটি ছেড়ে এসেছিলেন। দেশ ছেড়ে আসার ব্যথার চেয়েও সেই কিশোর বয়সে নতুন দেশ, নতুন অনুভূতি লেখককে বেশি আকর্ষণ করেছিল। কিশোর বয়সে দৌড়ে টিলায় চড়া, টিলার বাঁকে হারিয়ে যাওয়ার মাঝে অন্য আনন্দ, দেদার রোমাঞ্চ। বাঁশবনের হু হু হাওয়ায় থাকে অ্যাডভেঞ্চারের মধুর গন্ধ। পরিণত বয়সে সেই অপার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ পায়— “দুঃখে দহনে, বিরহযাতনায়, মিলনের সুখ-শিহরণে ভাসিয়েছি নৌকা সময় নদীর জলে, বেঁচে আছি বেঁচে থাকব বলে… করিয়েছি কত ঘাম, কত রক্তবিন্দু পথে আর প্রান্তরে… কী পেয়েছি, কী চেয়েছি, কী চাইনি… হোঁচট খেতে খেতে, পড়ে যেতে যেতে আমি উঠে দাঁড়াই… বেঁচে থাকি, বেঁচে থাকব বলে।” ‘আত্মদর্শনে’ এভাবেই বেঁচে থাকার দিনযাপনের বহু ছবি এঁকেছেন। ‘দুপুর বেলায় নিলাম’ কবিতায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাব—“নিলাম নিলাম। ঘণ্টা বাজে বুকের মধ্যে, আর ঘণ্টা বাজে দূরে।” ‘আত্মদর্শন’ কাহিনি পর্যায়ে পাঠককে সজাগ করে তোলে, বলে— জীবন এক নকশি কাঁথার মাঠ। জীবনের বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি অজানা আর বহু পরিচিত সময়কে লেখক সরস ভঙ্গিমায় তুলে ধরেছেন। ‘শ্রমজীবী মানুষ (কর্মচারীও শ্রমজীবী) অসহায়ভাবে নিত্যদিনের দুঃসহ, দুর্বহ ক্ষণ বয়ে বেড়ায়।’ তারপরেও প্রতিটি ব্যক্তির চরম আকাঙ্ক্ষা থাকে মাঝরাতের নিশ্চিন্ত ঘুম, ঘুমের মাঝে স্বপ্ন।
কিশোর বয়সে কথাকার স্বপনকুমার জন্মমাটি ছেড়ে এসেছিলেন। তবে মাটির গন্ধ, মাটির রং ভুলে যাননি। ‘খেলাঘরে একা’ গল্পের পরতে পরতে সেই ছবি তুলে ধরেছেন। ‘দ্রোহকাল’ শিরোনামে লেখকের কলম বলে— “নিত্যদিন যাপনে মানুষের অনেক আফশোস, অভাব-অভিযোগ থাকে। মানুষ জানে এই মনোভাবকে কাছের জনও খুবই অনীহার দৃষ্টিতে ফিরিয়ে দেয়। তারপরও মানুষ তা লালন করেই চলে; সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিষাদ, অহংকার না-পাওয়ার বেদনায় ভোগে। নিজেকে বা অন্যকে শান্ত করার জন্য, মনের বাঁক ঘোরাবার জন্য ভাবে… ‘তোমাদের অভিযোগগুলি ঈশ্বরের সন্নিধানে নিয়ে যাব। তবে একটা কথা— অধিকাংশ সময় ঈশ্বর যোগনিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকেন।’” খুব সূক্ষ্মভাবে লেখক জানিয়ে দিলেন— প্রত্যাশার প্রতীক্ষায় থাকা নয়। যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন, তারা অনায়াসে মনোজ মিত্রের নাটক ‘নরক গুলজারে’র সেই সুর—“ভগবান নিদ্রা গিয়াছেন”— আওড়াতে পারেন। অথবা এ শুধু এক মায়ার ছলনা— এই সত্য অনুধাবন করে আশ্বস্ত বোধ করতে পারেন। বিজ্ঞানমনস্কদের মনে আশার দীপ জ্বলে— “ঈশ্বর এক মায়া, বিভ্রম, মরীচিকা। ঈশ্বর এক আরোপিত মিথ্যে।” লেখকের কলম দ্বিধাহীন। ‘আত্মদর্শন’, ‘ঈশ্বরের মুখোমুখি’, ‘তাতাই বৃত্তান্ত’—এই গল্পগুলি আমাদের যাপিত জীবনের ছবি। ‘হেলারাম সহজিয়া’দের জীবনও লেখকের কলমে খুব সহজে উঠে আসে।
মানুষ মানুষের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না, আবার অন্যদিকে নিজস্ব রিক্ত হেলারামেরা সহজেই চোখে চোখ রেখে নিজেদের অস্তিত্বের মেরুদণ্ড সোজা রাখে। এই মনোভাবে বিন্দুমাত্র সংশয়ের অবকাশ থাকে না। “একশো টাকার নোটে চোখ দিল না হেলারাম। দশ টাকা দেন। এত টাকায় মাধুকরী হয় না।” হেলারামেরা হেলাফেলায় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুধু নয়, জীবনদর্শন অনায়াসে বিলিয়ে যায়। লেখকের মনের জানালায় জ্বলজ্বল করে শুধু জীবনের ছবি আর আকাশের নীল ধ্রুবতারা।
কথাকার স্বপনকুমার খাসনবীশের ‘খেলাঘরে একা’ গল্পগ্রন্থ জীবনের ছোটো ছোটো ঢেউ। পাঠক অনুভবের ছোঁয়ায় শিহরিত হবে, কখনো দুলে উঠবে। কোনো এক উদাসী হাওয়ার বিকাল ফিসফিস করে বলবে— মনের অনুভূতিগুলো লিখে রাখতে শিখো— তা একদিন গল্প হয়ে যাবে।
খেলাঘরে একা
স্বপনকুমার খাসনবীশ
প্রচ্ছদ : অপরেশ পাল
প্রকাশক : বুক ওয়ার্ল্ড, আগরতলা
মূল্য : ৪৫০ টাকা