বৃহস্পতিবার | ০৯ এপ্রিল ২০২৬

বারো ভুঁইয়া — মাটির সন্তান, জলের যোদ্ধা

 বারো ভুঁইয়া — মাটির সন্তান, জলের যোদ্ধা

শিবজ্যোতি দত্ত

ষোলো শতকের শেষে যখন আকবরের সাম্রাজ্য পূর্বদিকে হাত বাড়াল, বাংলা একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিলো তাকে। রাজপুতানার বালি নয়, দাক্ষিণাত্যের পাথর নয় — এখানে দিগন্ত জুড়ে নদী, খাল, জলাভূমি। বর্ষায় গোটা এলাকাটা একটা অনন্ত হ্রদ হয়ে যায়। ঘোড়া থামে, হাতি হিমশিম খায়, পদাতিক সেনা জলে দাঁড়িয়ে শত্রু খোঁজে। বাংলার ইতিহাস কিন্তু দুর্বলের ইতিহাস নয় — পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার UNESCO-স্বীকৃত, উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্য। মহাস্থানগড়ের নগর আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। কিন্তু ভাটির এই নিচু অঞ্চলটা সেই শহুরে সভ্যতার বাইরে — এখানে প্রতিরোধ দুর্গের দেওয়ালে নয়, নদীর বাঁকে। নরম মাটি, বৃষ্টির জল, অজস্র নদীনালা, সবুজ গাছপালা, লাল ডাঙায় শালের বন। এই ভূগোলটাই ছিল বারো ভুঁইয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র।
“বারো” সংখ্যাটা এখানে আক্ষরিক নয়, প্রতীকী — বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তালিকা আলাদা। তবু কয়েকটি নাম বারবার ফিরে আসে। ভাটির প্রধান শক্তি ঈসা খাঁ — সোনারগাঁয়ের অধিপতি, যাঁর নৌবহর মোগলদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মুসা খাঁ সেই প্রতিরোধের ভার কাঁধে তুলে নিলেন, শেষ পর্যন্ত লড়লেন। দক্ষিণে যশোরের প্রতাপাদিত্য — পর্তুগিজ কামানের কৌশল আর সুন্দরবনের গহিন জলকে একসঙ্গে ব্যবহার করতেন। বিক্রমপুর ও শ্রীপুরে ছিলেন চাঁদরায় ও কেদার রায় — দুই ভাই, হিন্দু জমিদার, মোগল বিরোধিতায় সমান সক্রিয়। ভূষণার রামচন্দ্র, মন্দির নির্মাণের জন্য স্মরণীয় লক্ষ্মীকান্ত রায়, ফতেহাবাদের মজলিস কুতুব — এঁরাও আছেন এই জোটে। লক্ষণীয়, এই জোটে হিন্দু এবং মুসলমান দুই ধর্মের জমিদারই পাশাপাশি আধিপত্য করেছেন। ধর্মের চেয়ে এখানে বড় ছিল — স্বাধীনতা।
মোগল ইতিহাসগ্রন্থগুলো — আকবরনামা, আইন-ই-আকবরি, বাহারিস্তান-ই-গায়বি — বাংলার এই নিচু জলাভূমি অঞ্চলকে বলেছে ‘ভাটি’। সীমানাটা মনে রাখার মতো: পশ্চিমে ইছামতী, দক্ষিণে গঙ্গা, পূর্বে ত্রিপুরা, উত্তরে ময়মনসিংহের আলাপসিং পরগনা ও বৃহত্তর সিলেটের বানিয়াচং। এই চতুর্ভুজের মধ্যে বিস্তীর্ণ জলের দেশ — সেখানেই ভুঁইয়াদের উত্থান, সেখানেই তাঁদের লড়াই।
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্বাধীনচেতা জমিদার ও সামন্তপ্রভুরা এই ভাটি অঞ্চলকে ভাগ করে নিয়েছিলেন কয়েকটি চাকলায়। শান্তির সময় প্রত্যেক ভুঁইয়া নিজের এলাকায় স্বাধীন — নিজের খাজনা, নিজের বিচার, নিজের সেনা। বাইরের শক্তি আক্রমণ করলেই এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো একটা অদৃশ্য সুতোয় জুড়ে যেত। কোনো সংগঠিত রাষ্ট্র নয় — একটা জৈব বোঝাপড়া। প্রয়োজনে জন্মায়, প্রয়োজন মিটলে আবার আলাদা হয়ে যায়।
ঈসা খাঁ ছিলেন এই ভাটির দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অধিপতি। সোনারগাঁ ছিল তাঁর রাজধানী — পদ্মা ও মেঘনার মাঝখানে এক জলঘেরা ভূখণ্ড, যেখানে পৌঁছোনোটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার।
মোগলরা উত্তর ভারতের নদীর কথা মাথায় রেখে নৌকো বানায় — বড়, ভারী, সোজা স্রোতের উপযোগী। ভাটির খাল অগভীর, বাঁকে বাঁকে ঘোরে, জোয়ার-ভাটার ছন্দে বদলায়। ঈসা খাঁর নৌকো সেই অনুযায়ী তৈরি — ছোট, চটপটে, সংকীর্ণ খালের যেকোনো জায়গায় অনায়াসে ভ্রমণ করতে পারে। আর এই নৌকোয় ছিল কামান। জলের উপর থেকে গোলা ছুটলে ডাঙার সেনারা নিরুত্তর হয়ে যেত। পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে (তাদের কাছে Porto Grande) ঘাঁটি গেড়েছিল ষোলো শতকের গোড়া থেকেই। বাংলার উপকূল ও মোহনা অঞ্চলে তারা ব্যবসা, জলদস্যুতা এবং ভাড়াটে যোদ্ধার কাজ — তিনটেই করত। এই সূত্রেই ইউরোপীয় কামান প্রযুক্তি বাংলার নদী-শাসকদের কাছে অনেক আগেই পৌঁছে যায়।
১৫৯৭ সালে এগারসিন্দুরে মানসিং এলেন ঈসা খাঁকে দমন করতে। তিনি আকবরের অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি, বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। কিন্তু ঈসা খাঁ তাঁকে টেনে নিয়ে গেলেন নিজের চেনা জলে — সংকীর্ণ খালে, যেখানে মোগলদের বড় নৌকো চলাচল করতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। দুদিক থেকে আক্রমণ হল। মোগল বহর বিপর্যস্ত হল, মানসিং পিছু হটলেন।
শক্তির মোকাবিলা শক্তিতে নয় — ভূগোলে করলেন ঈসা খাঁ। জোয়ারের সময় যে পথ দিয়ে আক্রমণ সম্ভব, ভাটার সময় সেই পথ কাদায় দুর্ভেদ্য। ভুঁইয়াদের মাঝি ও নাবিকরা ছিলেন স্থানীয় — কোন খালে শীতে জল থাকে, কোন বাঁক বর্ষায় বিপজ্জনক, কোন চরে নৌকো লুকিয়ে রাখা যায় — এসব তারা ছোট থেকেই চেনে। মোগল সেনার কাছে এসব ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না। বাংলার যে নদী মোগলদের কাছে ছিল বাধা, ভুঁইয়াদের কাছে সেই নদীই ছিল সহযোদ্ধা।
ঈসা খাঁর গল্প বেশি বিখ্যাত হলেও মুসা খাঁর প্রতিরোধ আসলে দীর্ঘতর। ইসলাম খাঁ ১৬০৮ সালে যখন বাংলার সুবাদার হয়ে এলেন, ততদিনে মোগলরা যুদ্ধের পুরো কৌশল বদলে দিয়েছে। রাজধানী সরিয়ে আনলেন ঢাকায়, স্থানীয় নকশায় নৌবহর বানালেন।
এরপর প্রায় তিন বছর ধরে মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরীর বুকে একের পর এক নৌযুদ্ধ হল। মুসা খাঁ প্রতিবার পিছু হটেন, নতুন অবস্থান নেন, আবার আক্রমণ করেন।
বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে জটিল চরিত্র ছিল সম্ভবত যশোরের প্রতাপাদিত্য। শোনা যায়, প্রতাপাদিত্য নিজের পিতাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন।
ঈসা খাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ভাটির নদীবুক। প্রতাপাদিত্যের রাজ্য আরো দক্ষিণে — যেখানে ভাগীরথী থেকে মেঘনা পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমি সমুদ্রে মেশে। ধুমঘাট ছিল তাঁর প্রধান নৌঘাঁটি — সুন্দরবনের মোহনায়, যেখানে স্থলের মানচিত্র শেষ হয়ে জলের গোলকধাঁধা শুরু হয়। এই ভূগোলে শত্রু দমন হয় দুভাবে — হয় তরবারিতে, নয় পথ হারিয়ে। সুন্দরবনের গহিনে মোগল সেনা দিক হারায়, জোয়ারে ডুবে যাওয়া পথে আটকে পড়ে। গাছের শিকড়, খাঁড়ির বাঁক, জলার কাঁদা, তার উপর বাঘ, সরীসৃপ — এগুলো প্রতাপাদিত্যের মিত্র। মোগলের কাছে এগুলো শুধু বিপদ।
তাঁর বহরে ছিলেন পর্তুগিজ নাবিক। ইউরোপীয় কামানের কৌশল আর বাংলার জলের অভিজ্ঞতা — দুটোই একসঙ্গে ব্যবহার করতেন তিনি। এখানে তিনি বাকি ভুঁইয়াদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে, বুঝেছিলেন, নিজের মাটি চেনাটা যথেষ্ট নয়, শত্রুর অস্ত্রটাও বোঝা দরকার।
তবে যেখানে তিনি ব্যর্থ হলেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ভুঁইয়াদের শক্তি ছিল সেই জৈব ঐক্যে — প্রয়োজনে একসঙ্গে যুদ্ধ করতো, প্রয়োজন মিটলে আলাদা হয়ে যেত। প্রতাপাদিত্য সেই জোটের বাইরে ছিলেন অনেকটাই। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পিতৃহত্যার অভিযোগের ছায়া — এসব তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। একা মানুষ, নিজের মাটি চিনলেও, শেষ পর্যন্ত তো একাই।
১৬১২ সালে ইসলাম খাঁর বাহিনীর কাছে পরাজিত হলেন। বন্দি অবস্থায় দিল্লির পথে মৃত্যু হয় তার। যে মানুষ এত কিছু করেছিলেন ক্ষমতার জন্য, শেষমেশ ক্ষমতাহীন হয়ে রাস্তায় মৃত্যুবরণ করলেন।
মুসা খাঁ — ঈসা খাঁর পুত্র — ১৬১১ সালে ইসলাম খাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। একে একে বাকিরাও।
কিন্তু এই আত্মসমর্পণের পরেই ঘটল সেই ঘটনা, যেটা ইতিহাসের পাদটীকায় থাকলেও, আসলে মূল পাঠ।
ইসলাম খাঁ রাজধানী সরিয়ে আনলেন রাজমহল থেকে ঢাকায় — ১৬১০ সালে, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই। কারণটা কৌশলগত। পঞ্চাশ বছর ধরে পরাজিত হতে হতে মোগল সুবাদাররা বুঝেছিলেন: দূর থেকে এই জলের রাজ্য শাসন করা যায় না। ভাটির ছন্দ শিখতে হবে।
তারপর ধীরে ধীরে তারা তাদের নৌবহরে পরিবর্তন আনেন। এবার আর নৌকা বানাতে উত্তর ভারতের কারিগর নয় — স্থানীয় মাঝি, স্থানীয় জেলে, স্থানীয় নৌকা-বানানোর প্রযুক্তি কাজে লাগানো হল। যে ছোট, চটপটে নৌকা ঈসা খাঁ ব্যবহার করতেন — সেই একই নকশা এবার মোগলের পতাকা বহন করতে লাগল। জোয়ার-ভাটার সময়জ্ঞান যাদের কাছে ছিল, তাদের রাখা হল পথপ্রদর্শক হিসেবে। কোন খালে শীতে জল কমে, কোন বাঁকে লুকিয়ে থাকা যায় — এই জ্ঞান এখন থেকে হল বিজয়ীর সম্পদ।
ভুঁইয়াদের পরাজয় হল। কিন্তু তাঁদের যুদ্ধের ভাষা টিকে রইল — বিজয়ীর মুখে।
ভাটি অঞ্চলের পূর্বসীমা ছিল ত্রিপুরা। ঈসা খাঁর সঙ্গে ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের সম্পর্ক ছিল — মোগল চাপের মুখে এই দুই শক্তির মধ্যে একটা কূটনৈতিক ভারসাম্য কাজ করত। সরাসরি জোট কিনা সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে ত্রিপুরা যে একটা নিরাপদ পশ্চাদ্ভূমি হিসেবে ভুঁইয়াদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল — এটা অনুমানযোগ্য।
পঞ্চাশ বছর ধরে একটা সাম্রাজ্য এই জলের দেশে এসে বারবার হোঁচট খেল, তারপর অবশেষে জিতল — কিন্তু জিততে গিয়ে নিজেকে বদলে ফেলল। বিজিতরা চলে গেলেন, কিন্তু তাঁদের মাটি, তাঁদের নদীর ছন্দ, তাঁদের নৌকো-বানানোর যুক্তি থেকে গেল — বিজয়ীর শরীরে। এই অর্থে ভুঁইয়াদের পরাজয় একটা অদ্ভুত ধরনের সংক্রমণ, যার কথা ইতিহাস লেখেনি।
পদ্মার ভাঙনে তাঁদের গড় মিশে গেছে। ঘাঁটির পাথর কাদায় ঢেকে গেছে। নদী নিজের পথ বদলেছে, নতুন চর জেগেছে পুরনো রণাঙ্গনের উপর।
তারপরেও — দেড়শো বছর পরে — ব্রিটিশ কর্মকর্তারা লিখছেন যে বাংলার নদীপথে কোম্পানির গানবোট আটকে যাচ্ছে, স্থানীয়রা কোন পথে জল আছে তা বলছে না। বিদ্রোহ হচ্ছে ছোট ছোট দলে, পরিচিত মাটিতে, অপরিচিত শত্রুকে বিভ্রান্ত করে। ১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধারা নদীর পাড়ে, জঙ্গলের ভেতরে যে গেরিলা কৌশল নিলেন, সেখানেও সেই একই হিসাব: ছোট দল, পরিচিত মাটি, বড় শত্রুকে সেখানে টেনে নাও যাতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বারো ভুঁইয়া আসলে উদ্ভাবক নন। তারা নিজস্ব মাটি চিনতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *