সোমবার | ১৫ জুন ২০২৬

এডিসির রেশ কাটেনি, বার নির্বাচনে ফের ভরাডুবি!!

 এডিসির রেশ কাটেনি, বার নির্বাচনে ফের ভরাডুবি!!

গত মাসখানেক আগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে ত্রিপুরা স্বশাসিত জিলা পরিষদের ( এডিসি) হাইভোল্টেজ নির্বাচন। ভোটের ফলাফল কী?তা গোটা দেশবাসী জানে।রাজ্যের শাসক দল বিজেপির লজ্জাজনক পরাজয় হয়েছে এডিসির নির্বাচনে। রাজ্য রাজনীতির হাঁড়ির খবর যাঁরা রাখেন, তাঁদের অনেকেরই অভিমত, এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো শাসকদলের মুষ্টিমেয় কিছু তথাকথিত নেতৃত্বের পাহাড়ে জয় নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখা। পাহাড়ে সাধারণ জনজাতিদের মধ্যে ওইসব নেতাদের কোনো জনভিত্তি না থাকলেও, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের বিশাল বড় নেতা ভাবতে শুরু করেছিলেন। দলকেও তাঁরা সে-রকমভাবেই নিজেদের মতো করে বুঝিয়েছিলেন। দলও তাঁদের কথায় বিশ্বাস করেছিল, তাঁদের উপর আস্থা রেখেছিল। কিন্তু পাহাড়ে যে ওই নেতাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি অনেক আগেই সরে গিয়েছিল, সেটা তাঁরা বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারলেও দলকে তাঁরা সঠিক পরামর্শ দেননি। নিজেদের পদ আঁকড়ে রাখতে, দলকে অন্ধকারে রেখে গেছেন। নিজেদের পদ বাঁচিয়ে রাখতে দলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে গেছেন। শুধু তাই নয়, এডিসির ভোটের প্রচারপর্বকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে শরিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, পাহাড়ে বসবাসকারী জনজাতিরা আসলে বিজেপি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। পাহাড়ে দলের সংগঠন যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল, সেটা জেনেও পাহাড় দখল নিয়ে শুধু লম্ফঝম্পই করা হয়েছিল। রাজ্যবাসীকেও সেটা বিশ্বাস করানোর প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই রাজ্যের জনগণ যে রাজনৈতিকভাবে খুবই সচেতন, রাজ্যবাসী যে সবকিছু বোঝে, মানুষ যে বোকা নয়, এই বাস্তব সত্যিটা হয়তো তথাকথিত নেতারা পদ ও ক্ষমতার মোহে মাঝে মাঝে ভুলেই যান। পাহাড়ে ফলাফল কী হতে যাচ্ছে, সেটা রাজ্যবাসী আগাম আন্দাজ করতে পারলেও, স্বার্থান্বেষী নেতারা সেটা বুঝতে পারেন না। এটা রাজনীতির দুর্ভাগ্য হলেও, আজ বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, মানুষের মন বুঝতে না পারা নেতারাই এখন রাজনীতির অঙ্গন বেশি করে দখল করে আছেন। তাঁদেরই রমরমা বেশি।

সে যাই হোক, এডিসির ভোটের ফলাফলের পর গোমতী, হাওড়া দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এডিসির ভোটের লজ্জাজনক পরাজয় থেকে রাজ্যের শাসক দল বিজেপি কোনো শিক্ষাই নেয়নি। তার প্রথম নিদর্শন হলো, যেসব অকর্মণ্য, অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পাহাড়ে ভরাডুবি হয়েছে, তাঁরা আজও স্বমহিমায় স্বপদে বিরাজমান। পদে বসে থেকে ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করে চলেছেন। নৈতিক দায় স্বীকার করারও কোনো দায় নেই। নিজে থেকে পদত্যাগ করা তো দূরের কথা।

এডিসির ভোটে লজ্জাজনক পরাজয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই, রাজ্যের শাসক দলকে আরও একটি নির্বাচনে পরাজয়ের মুখ দেখতে হলো। আর এটি হলো, রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালন সমিতির নির্বাচনে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সোসাইটির নির্বাচন হলেও, রাজ্য রাজনীতিতে ত্রিপুরা বারের ভোটের একটা প্রভাব রয়েছে। কেননা, ত্রিপুরা বার হচ্ছে একটি এলিট সোসাইটি। আইনজীবীদের সংস্থা বা সংগঠন। এ নিয়ে পরপর তিনবার বারের ভোটে শাসক দল-সমর্থিত আইনজীবী সেলের পরাজয় হলো। আর এবারের পরাজয়কে ভরাডুবি বললেও হয়তো কম বলা হবে। কেননা, পনের সদস্যবিশিষ্ট ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালন সমিতির নির্বাচনে শাসকদল বিজেপির আইনজীবী সেলের উন্নয়ন মঞ্চ মাত্র পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছে। অপরদিকে বিরোধী সিপিআই (এম) এবং কংগ্রেস-সমর্থিত আইনজীবীদের সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ দশটি আসনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বার বারের পরিচালন ক্ষমতা দখল করেছে।

সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, পরিচালন সমিতির সভাপতি এবং সম্পাদক পদে শাসক দলের আইনজীবী প্রার্থীদের নির্দলের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে এবং তৃতীয় স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে লজ্জাজনক হার হয়েছে সম্পাদক পদে। শনিবার রাত সাড়ে এগারোটায় বারের ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরই ফের একবার শাসকদলের আইনজীবী সংগঠনের পরাজয় নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কেননা, নির্দল প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জয় হাসিল হয়নি। এখানেও প্রশ্ন উঠেছে অযোগ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। একজন তো গত আট বছর ধরে কনভেনারের পদ আঁকড়ে আছেন। এছাড়াও দল এমন একজন নেতার (!) উপর বিজেপি লিগ্যাল সেলের দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যার রাজ্য রাজনীতিতে এখন বিন্দুমাত্রও কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এককথায় বাতিল নেতা। অথচ নিজেকে ভাবেন তিনি বিশাল কিছু। বারের ভোটের এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট, বুদ্ধিজীবীরাও বিজেপি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ভোট কাটাকাটির সুযোগ নিয়েও যাতে বারের ভোটে বিজেপি জয়ী হতে না পারে, সেটাও নিশ্চিত করেছেন আইনজীবীরা। অথচ তথাকথিত নেতারা আইনজীবীদের সেই মনের কথা মালুমই করতে পারেননি।

সামনে পুর ও নগর নির্বাচন হবে। রয়েছে ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচন। এরপর ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে হবে বিধানসভা নির্বাচন। এডিসি ও বারের ভোটের ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে শাসকের আত্মসমালোচনা করা খুবই জরুরি। ইতিমধ্যেই অনেকে বলতে শুরু করেছেন, “শাসকের শেষের শুরু” নাকি শুরু হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শাসক দলের নেতৃত্বরা কি সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *