সোমবার | ০১ জুন ২০২৬

অভিষেক হেনস্তা ও দলীয় দূরত্ব: সোনারপুর কাণ্ডে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ!!

“সেমসাইড” বলতে সাধারণত ফুটবল বা অন্যান্য দলগত কোনও খেলায় নিজেদের দলের ভুলে নিজেদের পোস্টেই গোল করে ফেলাকে বোঝায়। এককথায় “নিজের জালে গোল”। তবে রূপক অর্থে কোনও ব্যক্তি বা দলের নিজের ক্ষতি নিজেই করা অথবা নিজেদের দলের বা কৌশলের বিরুদ্ধে কাজ করাকেও সেমসাইড বলা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, খেলাধুলা কিংবা ব্যক্তি জীবনের বাইরেও রাজনীতি, যুদ্ধ বা সাধারণ জীবনে যখন কেউ নিজের দলের কোনও ক্ষতি করে বসে, তখন তাকে সেমসাইড বা “নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা” বলা হয়। কেন এই “সেমসাইড” প্রসঙ্গের উত্থাপন? কেননা, শনিবাসরীয় বিকেলে পশ্চিমবঙ্গের সোনারপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর যে নজিরবিহীন হেনস্তা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে বঙ্গ রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেই ঘটনাকে অনেকেই “সেমসাইড” বলে আখ্যায়িত করছেন। এই দাবির পিছনে অন্যতম কারণ হলো, ঘটনার পর পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত একটি মামলা গ্রহণ করেছে। মামলা গ্রহণ করেই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যারা শনিবার অভিষেককে জুতো, ডিম ছুড়ে মেরেছে। কেউ কিল-ঘুষি দিয়েছে। জামার কলার ধরে টেনে জামা ছিঁড়ে দিয়েছে। পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, এরা প্রত্যেকেই তৃণমূলের একনিষ্ঠ কর্মী। শুধু তাই নয়, এরা প্রত্যেকেই এলাকার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়িকা (এবার পরাজিত) লাভলী মৈত্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। গত ৪ মে ভোট গণনার দিন দুপুর পর্যন্ত এরা তৃণমূলেই ছিল। এদের কেউ তৃণমূলের পোলিং এজেন্ট, কেউ কাউন্টিং এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছে বলে খবরে প্রকাশ। এমনকী ধৃতদের পরিবারের লোকেরাও তাদের তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সোনারপুরের এই হাইভোল্টেজ কাণ্ড ঘিরে নানা কথা উঠে আসছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বঙ্গ রাজনীতির পারদ যেমন চড়েছে, তেমনি এই ঘটনাকে অনেকেই সেমসাইড বলে আখ্যায়িত করছেন।

প্রশ্ন উঠেছে আরও একাধিক। বঙ্গে ভোটের ফল প্রকাশের প্রায় ছাব্বিশ দিন পর শনিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম বাড়ির বাইরে পা রাখলেন। প্রথমে তিনি বেলেঘাটা গেলেন দলের নিহত এক কর্মীর বাড়িতে। নিহত কর্মীর পরিবারের লোকদের সমবেদনা জানাতে। তখন অভিষেকের সঙ্গে ছিলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক (এবারই জয়ী হয়েছেন) কুণাল ঘোষ। তখন সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। সেখান থেকে অভিষেক সোনারপুর যান অন্য এক নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে। যদিও সোনারপুরের ওই তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু নিয়ে এলাকাতেই জনগণের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, ওই কর্মী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাকেই নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসের বলি বলে চালানো হচ্ছে। সেই নিহত কর্মীর বাড়িতেই গিয়েছিলেন তৃণমূলের সেনাপতি। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, সোনারপুরে অভিষেকের সঙ্গে কোনও তৃণমূলের নেতা-নেত্রী, দলীয় কর্মী, এমনকী সোনারপুরের সদ্য প্রাক্তন হওয়া বিধায়িকা লাভলী মৈত্রকেও দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে অভিষেককে ঘিরে এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলতে থাকলেও, তৃণমূলের কোনও সাংসদ, বিধায়ক, এমনকী দলের শীর্ষ স্তরের নেতা-নেত্রী কাউকেই এলাকায় যেতে দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দলের সেনাপতির সোনারপুর সফরে দলের কেউই কি সঙ্গী হতে রাজি হননি?

অথচ, এক মাস আগেও ছবিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। এতদিন জোড়াফুলের কোনও মঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থাকলে তার চারপাশে ল্যাং ল্যাং করতে করতে অনেক নেতা-মন্ত্রীকে দেখা যেত। এমনভাবে তারা অভিষেকের সঙ্গে সেঁটে থাকতেন যেন তার ছায়া পর্যন্ত মাটিতে না পড়ে। কিন্তু আজ, এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে ছবিগুলো কেমন পাল্টে গেল! আজ অভিষেক জনরোষের মুখে, অথচ তার পাশে কেউ নেই। খবরে প্রকাশ, শনিবার সোনারপুরে অভিষেকের সঙ্গে থাকার জন্য ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে বারবার কিছু বিধায়ক-সাংসদকে ফোন করা হয়েছিল। অভিষেক নিজেও কয়েকজন বিধায়ক ও সাংসদকে নাকি ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রায় সকলেই নাকি নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেছেন। কেউ ফোন সুইচ অফ করে রেখেছেন, তো কারও মোবাইল ফোনের কল ডাইভার্ট করা ছিল।

শুধু তা নয়, সোনারপুরে অভিষেক হেনস্তা হওয়ার পর ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে অনেক বিধায়ককে নাকি ফোন করে বলা হয়েছে, ফেসবুকে পোস্ট করে ঘটনার নিন্দা করতে। কুণাল ঘোষ-সহ কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ বিধায়ক-সাংসদকে সরাসরি তেমন কোনও পোস্ট করতে দেখা যায়নি। কুণাল ঘোষ নিজেও তার সোশ্যাল মিডিয়ায় পৃথকভাবে একটি পোস্ট করে মনের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন, স্বদলীয় নেতা-নেত্রী, সাংসদ, বিধায়কদের এহেন ভূমিকার বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ছে। এরই মধ্যে রবিবার বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে বিধায়ক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠক কী চেহারা নেয়, সেটাও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে সব ছাপিয়ে যে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, সেটা হলো “সেমসাইড”। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শনিবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিষেকের রাজনীতির পুনর্জন্ম হতে পারত, কিন্তু “সেমসাইড” তত্ত্ব সামনে চলে আসার পর তা বাধাপ্রাপ্ত হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *