কলকাতা, ১৬ এপ্রিল : হিরো গ্রুপের একটি উদ্যোগ, বিএমএল মুঞ্জল বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতার অগ্রণী স্কুলগলির প্রধান শিক্ষকদের সমবেত করে শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সূচনাকারী এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই আলোচনা সভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশব্যাপী সংলাপমালা, “শিক্ষার অন্তরাত্মাকে ফিরিয়ে আনা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষাবিজ্ঞান, উদ্দেশ্য ও সুস্থতা” এর বিষয়ে আলোচনা করতে অনুষ্ঠিত হয়।এমন এক সময় যখন প্রযুক্তি শ্রেণীকক্ষের আদলে দ্রুত পরিবর্তন ঘটাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদাগুলি উত্তরোত্তর জটিল হয়ে উঠছে, সেই সময় এই আলোচনা সভা শিক্ষা নেতাদের জন্য শিক্ষাবিজ্ঞানকে নতুনরূপে কল্পনা করা, উদ্দেশ্য পুনঃনিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের সুস্থতাকে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।
বিএমএল মুঞ্জল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ সলিল মিশ্রার নেতৃত্বাধীন কলকাতার গোলটেবিল সভায় বিশিষ্ট স্কুল শিক্ষাবিদদের একসাথে দেখা যায়, এদের মধ্যে ছিলেন নোপানি উচ্চ বিদ্যালয়ের থেকে মিস শতাব্দী পানিগ্রাহী এবং মিস শ্রীপর্ণা মিত্র; জি.ডি. বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশনের থেকে মি. ক্রেগ অ্যান্থনি লুকাস; আদিত্য অ্যাকাডেমির থেকে মিস মেঘনা ঘোষাল, এবং আলবেনি হলের থেকে মি. ক্লিন্টন সালিভান।
এই আলোচনার বিষয় ছিল স্কুলের শিক্ষা পরিবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন এবং শিক্ষাপ্রদান, শিক্ষণ, এবং শিক্ষার্থীদের বিকাশের ওপর এর গুরুত্ব। অংশগ্রহণকারীগণ সম্মত হন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রশাসন, মূল্যায়ন ও যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রগুলিতে কার্যকারিতা বাড়িয়ে, শিক্ষার এক অখণ্ড অংশ হিসেবে নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেও, এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব পর্যাপ্ত নির্দেশিকা ছাড়া সূচনা করা হলে অপব্যবহার, অতি নির্ভরশীলতা এবং বুনিয়াদী শিক্ষার অবক্ষয় সংক্রান্ত উদ্বেগগুলিও উদ্রেক করে।
গোলটেবিলে উল্লেখযোগ্য যে একটি উদ্বেগের উপর আলোকপাত করা হয় সেটি ছিল কিত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রারম্ভিক এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। শিক্ষাবিদগণ সাবধান করেন যে শিশুদের প্রাথমিক জ্ঞানীয় বিকাশের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাধনীগুলির সূচনা করলে, তা ভাষা এবং নৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রে বিপরীত ফলদায়ক হতে পারে, যার ফলে ভাসা ভাসা জ্ঞান আহরণ ও অপব্যবহার হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মধ্যশিক্ষা স্তরে শুরু করে কাঠামোগত ব্যবহারের সাথে বয়স-উপযুক্ত সংযোজন হওয়া উচিত বলে সকলে মনে করেন, এবং এই কাঠামোকে সহায়তা করবে দায়িত্বশীল ব্যবহার বিষয়ক সুস্পষ্ট নির্দেশিকা।
কথপোকথন এই নতুন পরিবেশে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের থেকে প্রত্যাশা পরিবর্তনের বিষয়েও মনোনিবেশ করে। শিক্ষার্থীরা ক্রমশ স্বাধীনভাবে তথ্য আহরণ করার সাথে, প্রধান জ্ঞান প্রদানকারী হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চিরাচরিত ভূমিকা কমে আসছে। এর পরিবর্তে, শিক্ষাবিদদের থেকে এখন আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকা, আরও উপযোগী হওয়া এবং তথ্য বিশ্লেষণ, প্রশ্ন করা ও প্রাসঙ্গিকীকরণে শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শনে সক্ষম হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও, অন্যরা একে তাদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং আরও স্মার্টভাবে কাজ করার মাধ্যমে সময়কে সর্বোত্তমরূপে ব্যবহারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন।
আরেকটি যে মুখ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় সেটি ছিল স্কুল এবং পিতামাতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। অংশগ্রহণকারীরা লক্ষ্য করেন যে স্কুলগুলি মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার সঞ্চার করার চেষ্টা করলেও, শিক্ষাগত ফলাফল এবং প্রথাগত পেশার পছন্দের উপর পিতামাদের অত্যাধিক জোর দেওয়া প্রায়ই এই প্রচেষ্টাগুলির পরিপন্থী হয়ে ওঠে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এই চাপ শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার সহ অনৈতিক শর্টকাটগুলি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে, যা পিতামাতাদের মধ্যে আরও জোরদার সঙ্গতি এবং সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করে।
আলোচনায় শিক্ষার্থীদের সুস্থতা সংক্রান্ত উদীয়মান উদ্বেগগুলির উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত পরিবেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, হীনম্মন্যতা এবং হ্রাসপ্রাপ্ত আন্তঃব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতায় অবদান রাখে। আবেগগত সমর্থন অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য শিশুদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করার দৃষ্ঠান্তগুলিকে মানবিক আলাপচারিতায় ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া ব্যবধানের সূচক হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বাড়ি ও স্কুল উভয় স্থানেই নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ এই চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে কথা বলা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও আবেগগত স্বাস্থ্যের সহায়তা করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বলে জোর দেন।
উদ্যোগ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে, বিএমএল মুঞ্জল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ লিবারেল সায়েন্সের ডিন, ডঃ অরিন্দম ব্যানার্জি বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা পদ্ধতিকে রূপান্তরকারী এক বিপ্লবী শক্তি হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। আমাদের আসল লক্ষ্য প্রযুক্তির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা নয় বরং দায়িত্ব, সততা এবং অদম্য নৈতিক বিচারবুদ্ধির সাথে বুদ্ধিমানভাবে এটা ব্যবহার করা। এই আমূল পরিবর্তনের দিকে সঞ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে, আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি – মূল্যবোধ, চরিত্র ও মানব সংযোগকে প্রচণ্ডরূপে রক্ষা এবং বলবৎ করতে হবে। এগুলো হল সেইসব আপসহীন স্তম্ভ যেগুলো নির্ধারণ করবে যে আমরা শুধুই সক্ষম প্রযুক্তি-দক্ষ প্রশাসকদের তৈরি করছি নাকি প্রকৃতভাবে সচেতন, দায়িত্ববান, ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত নেতাদের গড়ে তুলছি।”
কলকাতার গোলটেবিল বৈঠক বিএমএল -এর স্কুল ও উচ্চ শিক্ষার নেতাদের একসাথে সম্মিলিত করা একটি প্রগতিশীল, ভবিষ্যতের উপর মনোনিবেশকারী মঞ্চ গড়ে তোলার বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ। এই মঞ্চ উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে সম্মিলিতভাবে কথা বলবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহনশীল, নৈতিক ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত শিক্ষা কাঠামো যৌথভাবে তৈরি করবে।