শনিবার | ১৭ অক্টোবর ২০২৬

নানা পাটেকর— এক অহঙ্কারী, আত্মবিশ্বাসী অভিনেতা

 নানা পাটেকর— এক অহঙ্কারী, আত্মবিশ্বাসী অভিনেতা

নানা পাটেকরের অভিনয়-জীবনের মূল দিকটি হল চরিত্রের বৈচিত্র্য। মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্ব সংকট থেকে প্রেম, জটিল মনস্তত্ত্ব থেকে রাজনীতি, সমাজ থেকে ব্যক্তি— প্রতিটি চরিত্রের ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অভিনেতা হিসাবে যা তাঁর সহজাত দক্ষতা ও চর্চার ফসল।

সুদর্শনা চক্রবর্তী

‘পলট’ বললেও আর ডাক শুনে ফিরে তাকাবেন না জাদুকর। এমন এক সীমা পেরিয়ে চলে গেছেন যেখানে ‘লাভেরিয়া’-র স্পর্শ পৌঁছাবে না আর। নানা পাটেকরের মৃত্যু যেমন এক অভিনেতার মৃত্যু, তেমনি আবার তা একভাবে গোটা আশি-নব্বইয়ের দশকে আর্ট ফিল্ম, প্যারালাল সিনেমা ও মূলস্রোত চলচ্চিত্র— এই তিন ধরনের হিন্দি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই যেন একটা পর্দা নেমে আসা। নানা চলে গেলেও সিনেমাগুলি রয়ে গেল। শুধু তাঁর অভিনয় দক্ষতার দারুণ উদাহরণ হয়েই নয়, তিনি যেমন ভাবে এই দশকগুলির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন সেই গল্পও রয়ে গেল সিনেমাগুলির পরতে পরতে। ‘অঙ্কুশ’ থেকে ‘রাজু বন গয়া জেন্টেলম্যান’, ‘থোড়া সা রুমানি হো যায়ে’ থেকে ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘প্রহার’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’— নানা পাটেকরের অভিনয় আসলে অভিনয় শিক্ষার একটি পাঠ্যক্রমও হয়ে উঠতে পারে।
এ কথা নিঃসন্দেহে ঠিক যে নানা পাটেকরের অভিনয়ে তাঁর নিজস্ব শৈলী ছিল খুবই স্পষ্ট। যাকে আমরা সাধারণত ম্যানারিজম বলে থাকি। তবে লক্ষ করলে দেখা যাবে তিনি যখন হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় অভিনয় করতে শুরু করেন, সেই তরুণ বয়সে তাঁর আদপেই এই ধরনের ম্যানারিজম ছিল না। নানা যদিও আর্ট ফিল্ম দিয়েই অভিনয় যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং নিজেকে একজন অপরিহার্য অভিনেতা হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন, ধীরে ধীরে মূলস্রোতের অভিনেতা হিসাবেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
‘পরিন্দা’ সিনেমাটি কেবলমাত্র মূলস্রোতের হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রেই একটি মাইলস্টোন নয়, তা নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনেও একটি নতুন মোড় নিয়ে আসে এবং এক বড় সংখ্যক দর্শকদের কাছেও তাঁকে অনেক বেশি পরিচিত করে তোলে। মূলস্রোতের সিনেমায় বেশি সংখ্যায় কাজ করতে শুরু করার পরেই ক্রমশ নানা-র অভিনয়ে নির্দিষ্ট ধরনের ম্যানারিজম তৈরি হয়— যা একইসঙ্গে তাঁর অভিনয়কে স্বতন্ত্র করে তোলে, তেমনি কোনও কোনও সময়ে এক ধরনের একঘেয়েমিও তৈরি করেছে বটে। অবশ্য প্রতিবারেই নানা তাঁর অভিনয়ের জাদুতে শেষ পর্যন্ত দর্শক-সমালোচকদের মুগ্ধই করেছেন।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে সংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে নানা পাটেকর যত সংখ্যক সিনেমায় অভিনয় করতে পারতেন, দেখা যাবে হয়তো তেমনটা হয়নি, কিন্তু সংখ্যা নয়, গুণগত মান দিয়েই তাঁর অভিনয় জীবনকে বিচার করতে হবে। কারণ তাঁর মতো অভিনেতারা অধিকাংশ সময়েই এক আশ্চর্য প্যাশন মাথার মধ্যে নিয়ে বাঁচেন। যেখানে তাঁদের জীবনও অভিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ওতপ্রোতভাবে। বেঁচে থাকা, যাপন, সম্পর্ক, অভিনয়— সবকিছু মিলেমিশে তৈরি হয় এক মানুষ, যিনি কেবলই সাদা-কালো নয়। ধূসর মানুষ। যে কারণে বিতর্ক, অভিযোগ তাঁর পিছু ছাড়েনি। বিবাহিত, সন্তানের পিতা নানা সম্পর্কে জড়িয়েছেন সহকর্মী-অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার সঙ্গে। বহু চর্চিত সেই সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর এক সময়ে ভেঙে গেছে। তিক্ততা সামনে আসেনি, দু’জনেই পরিণতভাবে তা সামলেছেন। নানা ক্রমশ সমাজসেবামূলক বিবিধ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এরই মাঝে ‘মি টু’-র অভিযোগ এনেছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। তনুশ্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। একজন দক্ষ অভিনেতা, সচেতন মানুষ যে কখনও কখনও সীমা অতিক্রম করে যেতে পারেন, তাও যেন প্রমাণ করেছেন নানা। অভিযোগ প্রমাণিত নয়, তবুও অভিযোগকারী মহিলার বয়ানকে অনেকেই সম্মান দিয়েছেন। নানা পাটেকর তাঁর মধ্যে থাকা ‘ম্যাচো’, রাগী পুরুষের ইমেজ থেকে সব সময়ে বাস্তবেও যে বেরোতে পারেননি, তা বহু ঘটনাই প্রমাণ করে।
নানা পাটেকরের অভিনয়-জীবনের দিকে চোখ ফেরালে যা চোখে পড়ে তা হল বৈচিত্র্য। একটা নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে আটকে পড়েও তিনি চরিত্রের পর চরিত্রে নিজস্ব মাত্রা যোগ করেছেন এবং দেখলে অবাক হতে হয় যে কত বিচিত্র ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। আর্ট ফিল্ম ‘গমন’ দিয়ে যে পথ চলা শুরু হয়, ‘অঙ্কুশ’-এ গিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া তিনি এবং এমন চরিত্রের জন্যই তিনি নিজেকে তৈরি করে নিতে পারেন, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্ব সংকট থেকে প্রেম, জটিল মনস্তত্ত্ব থেকে রাজনীতি, সমাজ থেকে ব্যক্তি— এই সমস্ত আবেগ ও চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যে নিজেকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তা অভিনেতা হিসাবে তাঁর সহজাত দক্ষতা ও চর্চার ফসল। অভিনেতা হিসাবে তিনি নিজেকে যেমন এক ধরনের নির্দিষ্ট ম্যানারিজম দিয়ে সকলের থেকে আলাদা করে তুলতে পেরেছিলেন, তেমনি তিনি নিজে যথেষ্ট সচেতনও ছিলেন যে তাঁর এক ধরনের ব্র্যান্ড নির্মাণ হয়েছে, যা যেকোনও চরিত্র করার সময়েই তিনি মাথায় রাখতেন ও সচেতনভাবেই সেই ইমেজ প্রথম থেকে শেষ সিনেমা পর্যন্ত হিন্দি ও মারাঠি — দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই ধরে রেখেছিলেন।
নানা পাটেকরের চেহারার মধ্যেও এক ধরনের আলাদা করে চোখে পড়ার মতো বিষয় ছিল। শানিত তরবারির মতো এক ধরনের উপস্থিতি। দীর্ঘ, গভীর, উজ্জ্বল চোখ, শরীরী উপস্থিতি, এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কণ্ঠস্বর ও সংৈলাপ বলার একেবারেই স্বতন্ত্র ধরন— নানাকে তাঁর সমসাময়িক অন্যান্যৈ অভিনেতাদের থেকে আলাদা করেছিল। আবার অন্যদিকে শরীরচর্চা ও যাপনের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজের পুরুষালি ইমেজ সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। ফলে যখনই চরিত্র বেছেছেন, তখনই সেগুলির মধ্যে অন্তত এই দিকটি উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসত। ‘সালাম বম্বে’-র বাবা থেকে তাই অনায়াস দক্ষতায় তিনি ‘তিরঙ্গা’র শিবাজি রাও ওয়াগলে হয়ে উঠতে পারেন। নানা পাটেকর সেই জাতের অভিনেতা ছিলেন যিনি একটিও সংলাপ ছাড়া উপস্থিতির জন্যই ভিড়ের মাঝেও দর্শকদের দৃষ্টি টেনে নিতে পারতেন।
সেই একই অভিনেতা আবার শরীরী অভিনয়ে নিজেকে নিংড়ে দিতে পারেন। একের পর এক মারাঠি ও হিন্দি সিনেমার মধ্যে দিয়ে তিনি সেই প্রমাণ রেখেছেন। খেয়াল করলে দেখা যাবে তিনি রগচটা, কঠিন, শক্তিশালী পুরুষ চরিত্র বেশি করেছেন, কিন্তু সেই প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই এক অদ্ভুত নরম হৃদয়ের পুরুষও রয়ে যেত কোনও না কোনওভাবে। থাকত তার কোনও এক দুর্বলতা। নানা, সাধারণত জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রগুলিকে রক্তমাংসের করে তোলার ক্ষেত্রে নিজেকে এক প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাছাড়াও দেখা যেতে পারে যে আদর্শ ও বিবেকবান চরিত্র, যারা কোনও অবস্থাতেই কোনও সমঝোতা করতে রাজি নয়, সেই ধরনের চরিত্র করার ক্ষেত্রেও একটা সময়ে নানা ছিলেন সব ধরনের সিনেমাতেই পরিচালকদের প্রথম পছন্দ। তাই ‘ক্রান্তিবীর’ হোক বা ‘গোলাম-ই-মোস্তাফা’ নতুন অ্যাংরি ম্যান বা রাগী অথচ শান্ত আদর্শবাদী পুরুষ হিসাবে নানা এক সময়ে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সিনেমা থেকে তাঁর অভিনীত চরিত্রদের দৃশ্য, সংলাপ তাই এখন নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ফিরে আসছে, যা এখনও একই রকম প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।
নানা পাটেকর কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিনেতা ছিলেন তা ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে তাকালেই বোঝা যেতে পারে। এই এক বছরে তাঁর যে তিনটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল সেগুলি হল— ‘পরিন্দা’, ‘থোড়া সা রুমানি হো যায়ে’, ‘দিশা’। আশ্চর্যজনক এই কারণেই যে তিনটি চরিত্রই হিন্দি সিনেমায় এমন তিনটি চরিত্র হয়ে থাকবে যা প্রায় এক ও একমাত্র এবং তিনটি চরিত্রই নানা পাটেকর ছাড়া অকল্পনীয়। একজন ঠান্ডা মাথার, শীতল রক্তের খল চরিত্র যার মধ্যে রয়েছে এক ভয়ানক ট্রমা সেরকম হল ‘পরিন্দা’-র আন্না, এক জাদুকর যে শুধু বৃষ্টি আনতে পারে তাই নয়, নিয়ে আসে প্রেম, নিয়ে আসে বিশ্বাস— কাব্যিক ও প্রায় সারিয়্যাল সিনেমা ‘থোড়া সা রুমানি হো যায়ে’-র নটবরলাল, শহর জীবনে কোনওমতে টিকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক দিশা-র বসন্ত মান্দ্রে— সম্পূর্ণ তিন ধরনের চরিত্রে নানা পরপর যে পারফরম্যান্স দিয়ে গেছিলেন তা থেকে বোঝা যায়, তিনি অভিনয়ের মধ্যে নিজেকে কতটা ডুবিয়ে দিতে পারতেন।
একই রকম উদাহরণ রয়েছে ঠিক তার দু’বছর পরেই। নানা অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা— ‘রাজু বন গয়া জেন্টেলম্যান’ ও ‘অঙ্গার’। প্রথমটিতে তিনি কথা বেচে খাওয়া, অত্যন্ত সংবেদনশীল জয়। আর অন্যটিতে তিনি নৃশংস ডন মজিদ খান। কীভাবে যে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী চরিত্রে তিনি নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন তা অভিনেতাদের কাছে শিক্ষণীয়। আর এর মাঝখানে তিনি নিজের সাহস ও শারীরিক ফিটনেস তথা আদর্শের পরিচয় রেখেছেন নিজের পরিচালিত ‘প্রহার’ সিনেমায়।
যে দু’টি সিনেমার কথা না বললেই নয়, সেগুলো হল— ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘খামোশি’। ‘অগ্নিসাক্ষী’-তে অবসেসড, সাইকোপ্যাথ, অত্যাচারী স্বামীর চরিত্রে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়ে শেষ দৃশ্যে এক প্রবল প্রেমিকের মৃত্যুতে গলার কাছে হাল্কা ব্যথা তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আর ‘খামোশি’ কেন? কারণ দ্রুত, রূদ্ধশ্বাস সংলাপ বলাই যে অভিনেতার ট্রেডমার্ক স্টেটমেন্ট, সেই তিনিই একটি গোটা সিনেমায় অভিনয় করছেন একজন বাক্ প্রতিবন্ধী চরিত্রে। এই সিনেমায় তাঁর অভিনয়, তাঁর তো বটেই ভারতীয় সিনেমায় সেরা অভিনয়গুলির তালিকায় জায়গা করে নেবে নিঃসন্দেহে।
নানা-র অভিনয় নিয়ে আলোচনা শেষ হবে না যে বিষয়গুলির কথা না বললে, তা একদিকে যেমন আদর্শবাদী, সাহসী, রাগী, সত্যবাদী চরিত্রে তাঁর অভিনয়, অন্যদিকে খল চরিত্রে তাঁর ভয় পাওয়ানো অভিনয়, তেমনি না বললে নয় কমেডি চরিত্রে তাঁর অসামান্য টাইমিং, যা হয়তো ‘ওয়েলকাম’ সিরিজের পর বেশি জনপ্রিয় হয়েছে, তবে ‘কোহরাম’ বলে সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা জানেন অ্যাকশন হিরো নানা একইসঙ্গে কমেডি-তে ঠিক কতটা দক্ষ ছিলেন। পাশাপাশি সুদর্শন নানা-র মধ্যে ছিল ছাই-চাপা আগুনের মতো যৌন আবেদন, যা তাঁর অপূর্ব হাসি আর ঋজু চেহারা আর কণ্ঠস্বরের ওঠানামায় স্পর্শ করে যেত। ‘তৃষাগ্নি’-র মতো সিনেমায় তিনি তার নজির রেখেছেন। অন্যদিকে প্রেমিক চরিত্রে বা এমন পুরুষ যে কোনও না কোনওভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তেমন চরিত্রে নানা ছিলেন আশ্চর্য মোলায়েম। যেমন স্বল্প আলোচিত ‘ওয়াজুদ’, ‘যুগপুরুষ’, ‘যশবন্ত’ এবং ‘হু তু তু’।
নানা পাটেকর এক প্রবল আত্মবিশ্বাসী অভিনেতা ছিলেন, ছিল অভিনেতার অহঙ্কার আর পরোয়াহীন বেঁচে থাকা। ধূসর মানুষ ছিলেন। সমাজবিচ্ছিন্ন নন, তবে হয়তো বা একলা শিল্পী মানুষ ছিলেন। খোলা খাতার মতো জীবন থেকেও ছিল এক অদ্ভুত রহস্যের মোড়ক। তাই নিয়েই চলে গেলেন। ‘পলট’ বললেও ফেরা যায় না, এমন এক জাদুর দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *