শুক্রবার | ১৬ অক্টোবর ২০২৬

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন

 ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন

দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামা, সাজগোজ আর পাঁচদিনের আনন্দ। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর ফ্যাশনের ধরনও। শাড়ি, সালোয়ার কিংবা ধুতি-পাঞ্জাবির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে এবার ফ্যাশনে জায়গা করে নিচ্ছে ফিউশন, কো-অর্ড সেট, ইন্দো-ওয়েস্টার্ন কাট এবং ঐতিহ্যবাহী বাংলার মোটিফ। ষষ্ঠী থেকে দশমী— কোন দিনে কেমন সাজে ধরা দেবেন, রইল তারই হালহকিকত। খোঁজা নিলেন আনন্দিতা সরকার।

পুজো আসছে— এই দুটো শব্দই যেন বাঙালির কাছে এক আলাদা উৎসবের শুরু। পুজোর কয়েকদিন নতুন জামা পরা, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, প্যান্ডেল হপিং, অষ্টমীর অঞ্জলি কিংবা দশমীর সিঁদুরখেলা—প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সাজগোজের পরিকল্পনা। তাই পুজোর বাজার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় কী পরব, কী ভাবে সাজব— তার ভাবনাও। তবে এ বার পুজোর ফ্যাশনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন। নতুন প্রজন্ম শুধু চিরাচরিত পোশাকেই আটকে থাকতে চাইছে না। সাদা-লাল রং, পদ্ম বা ফুলের মোটিফ, জামদানি, কাঁথা স্টিচ কিংবা বাংলার লোকশিল্পের নকশা—সবই উঠে আসছে আধুনিক ড্রেস, ক্রপ টপ, জ্যাকেট, স্কার্ট এবং কো-অর্ড সেটে।

ফিউশনেই নতুনত্ব
সাদা বা অফ-হোয়াইট পোশাকের সঙ্গে লাল পাড় কিংবা লাল রঙের ডিটেলিং পুজোর আবহ তৈরি করতে পারে অনায়াসেই। লং ড্রেসের কলার, হাতা বা হেমলাইনে লালের ব্যবহার, তার সঙ্গে ফুলের এমব্রয়ডারি— শাড়ি না পরেও বাঙালিয়ানার ছোঁয়া এনে দিতে পারে সাজে। আবার সাদা স্কার্টের সঙ্গে লাল টপ, তার উপর ছোট জ্যাকেট বা কেপ— এমন কো-অর্ড সেটও হতে পারে প্যান্ডেল হপিংয়ের জন্য আরামদায়ক ও স্টাইলিশ বিকল্প। কাঁথা স্টিচ, জামদানি কিংবা বাংলার লোকশিল্পের মোটিফ এখন শুধু শাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক কাটের ড্রেস, স্কার্ট, জ্যাকেট কিংবা ক্রপ টপেও সেই নকশা নতুন ভাবে দেখা যাচ্ছে। পুজোর দীর্ঘক্ষণ ঘোরাঘুরির কথা মাথায় রাখলে আরামের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঢিলেঢালা স্কার্ট, সফট ফ্যাব্রিকের ড্রেস, হালকা জ্যাকেট কিংবা ছোট কেপ— সব মিলিয়ে ‘কমফোর্ট উইথ স্টাইল’ এখন পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র।

সাজ হোক মেপে
ফিউশন পোশাকের সঙ্গে সাজও থাকুক পরিমিত। লাল চুড়ি, অক্সিডাইজড বা স্টেটমেন্ট গয়না, ছোট টিপ, ফুল কিংবা খোলা চুল— এই সামান্য কিছু উপকরণেই সম্পূর্ণ হতে পারে লুক। পোশাকের ডিজাইন যদি নজরকাড়া হয়, তবে অতিরিক্ত গয়না বা মেকআপের প্রয়োজন নেই। আর যদি চিরাচরিত বাঙালি সাজেই ফিরতে চান, তা হলে লাল পাড় সাদা শাড়ির আবেদন আজও অমলিন। সঙ্গে সোনার গয়না, কানে ঝুমকা কিংবা কানপাশা, খোঁপায় ফুল—এই সাজের কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই।

পুরুষদের ক্ষেত্রে সাদা বা অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবি, ধুতি কিংবা পাজামার সঙ্গে জহর কোট যোগ করলে তৈরি হবে সাবেকি অথচ পরিপাটি লুক।

ষষ্ঠী শুরু হোক হালকা সাজে :
পুজোর শুরুতেই খুব ভারী সাজের প্রয়োজন নেই। ষষ্ঠীর দিনে হালকা ইন্দো-ওয়েস্টার্ন লুক হতে পারে আদর্শ। কো-অর্ড সেট, স্কার্ট-টপ কিংবা হালকা ড্রেসের সঙ্গে মিনিমাল গয়না রাখুন। অফিস থেকে সরাসরি পুজোর আড্ডায় যেতে হলে ইক্কত বা হালকা হ্যান্ডলুমের শাড়ির সঙ্গে কলার-নেক ব্লাউজও বেছে নিতে পারেন। ষষ্ঠীর জন্য সূতি ও হ্যান্ডলুমের পোশাক বিশেষ আরামদায়ক।
পুরুষেরা মেরুন, সাদা কিংবা অন্য কোনও উজ্জ্বল রঙের শার্টের সঙ্গে বেইজ বা হালকা রঙের ট্রাউজার পরতে পারেন। খুব বেশি ভারী সাজ নয়—পুজোর আবহের শুরুটা হোক স্বচ্ছন্দে।

সপ্তমী সকালে সাবেকি, রাতে ফিউশন :
সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের আবহে ধনেখালি, তাঁত কিংবা অন্য কোনও হালকা হ্যান্ডলুম শাড়ি বেশ মানানসই। সি-গ্রিন বা হালকা রঙের শাড়ির সঙ্গে হলুদ বা উজ্জ্বল রঙের ডিজাইনার ব্লাউজে তৈরি হতে পারে সুন্দর কনট্রাস্ট। রুপোর কানপাশা, ছোট নাকছাবি এবং আলগা খোঁপায় ফুল— সাজ সম্পূর্ণ। রাতে অবশ্য বদলে ফেলতে পারেন লুক। প্যান্ডেল হপিংয়ের জন্য মিডি বা লং স্কার্টের সঙ্গে অফ-শোল্ডার টপ, কিংবা আরামদায়ক কো-অর্ড সেট হতে পারে দারুণ বিকল্প।
পুরুষদের জন্য সকালে পাঞ্জাবির সঙ্গে জিনস একটি সহজ অথচ স্টাইলিশ কম্বিনেশন। রাতে সাদা টি-শার্ট ও কালো জিনসেও সারারাত স্বচ্ছন্দে ঠাকুর দেখা যাবে।

শাড়িতেই মন মাতানো অষ্টমী :
অষ্টমীর অঞ্জলি মানেই শাড়ি। এ দিন সাজে ফিরে আসুক বাঙালিয়ানার চেনা রূপ। লাল, মেরুন কিংবা গাঢ় রঙের শাড়ির সঙ্গে স্লিভলেস বা অন্য কোনও আকর্ষণীয় কাটের ব্লাউজ বেছে নিতে পারেন। জামদানি, সিল্ক কিংবা হ্যান্ডলুম—সবই মানানসই। সোনালি চোকার, বড় দুল, কপালে টিপ এবং চোখে কাজল— এই কয়েকটি উপকরণেই তৈরি হবে সম্পূর্ণ বাঙালি সাজ। তবে শাড়ির নকশা ভারী হলে গয়না রাখুন তুলনামূলক হালকা। রাতের বেলা পোশাকের স্টাইলে অনায়াসেই রদবদল আনতে হবে। প্যাস্টেল শেডের সারারা সেট কিংবা অন্য কোনও ফিউশন আউটফিটে পারিবারিক আড্ডা বা ডিনারে যেতে পারেন। সকলের নজর অনায়াসেই নিজের দিকে টানতে এর থেকে ভাল লুক আর কী হতে পারে!
পুরুষদের জন্য অষ্টমীর দিনে ধুতি-পাঞ্জাবি একটা আলাদা আবেদন সৃষ্টি করে। সাদা ধুতির সঙ্গে লাল, হলুদ বা অন্য উজ্জ্বল রঙের কাজ করা পাঞ্জাবি হতে পারে সাবেকি পছন্দ। রাতে আবার কো-অর্ড সেটে ফিরতে পারেন।

নবমীতে জাঁকজমক :
নবমী মানেই পুজোর শেষ রাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাই এই দিনের সাজে থাকুক একটু বেশি গ্ল্যামার। ম্যাজেন্টা, গোল্ড, এমেরাল্ড গ্রিন কিংবা ব্ল্যাক—গাঢ় ও সমৃদ্ধ রঙের সিল্ক, টিস্যু বা অরগ্যানজা শাড়ি বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে স্টেটমেন্ট জুয়েলারি এবং পরিমিত গ্ল্যাম মেকআপ। সকালে শাড়ি পরলে রাতে ওয়েস্টার্ন ড্রেস, জাম্পস্যুট কিংবা স্টাইলিশ কো-অর্ড সেটে বদলে ফেলতে পারেন সাজ।
পুরুষেরা কুর্তার সঙ্গে স্ট্রেট-ফিট ট্রাউজার পরতে পারেন। সঙ্গে ক্লাসিক ঘড়ি বা একটি ব্রেসলেটই যথেষ্ট।

দশমীতে লাল-সাদা :
দশমীর সাজে বাঙালিয়ানার কোনও বিকল্প নেই। সাদা-লালই থাকুক দিনের মূল রং। সাদা শাড়ির উপর লাল সুতোর কাঁথা স্টিচ, গুজরাটি স্টিচ বা অন্য কোনও কারুকাজের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে লাল ব্লাউজ, চুড়ি, কপালে টিপ ও খোঁপায় ফুল। বিবাহিত নারীর সাজে শাখা-পলা ও সিঁদুর যোগ হলে দশমীর ঐতিহ্য আরও পূর্ণতা পায়। বর্তমানে সাদা-লালের ওপরে কাজ করা বিভিন্ন মেটিরিয়ালের শাড়ি চোখ টানে। এছাড়াও সাদা-লাল কম্বিনেশনের বিভিন্ন ডিজাইনের সালোয়ারগুলোও এবার পুজোর সাজে বেশ হিট।
পুরুষদের জন্য সাদা পাঞ্জাবির উপর লাল কাজ কিংবা লাল ডিটেলিং এবং সঙ্গে চুড়িপ্যান্ট হতে পারে সুন্দর বিকল্প। পায়ে কোলাপুরি বা অন্য কোনও ঐতিহ্যবাহী জুতোয় সাজ সম্পূর্ণ করুন।

শুধু শাড়ি নয় :
সব সময় শাড়ি পরে প্যান্ডেল হপিং করা সম্ভব নয়। তাই সালোয়ার-কামিজ, লেহেঙ্গা-চোলি, সারারা, কুর্তা কিংবা আধুনিক ড্রেসও হতে পারে পুজোর পোশাক। জরির কাজ, প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি কিংবা হ্যান্ডক্রাফটের ডিটেলিং পোশাকও উৎসবের আবহ এনে দেবে। জিনসের সঙ্গে ফ্যাশনেবল কুর্তিও মন্দ নয়। সাদা রং হল শুভ্রতার প্রতীক, শান্তির প্রতীক। সাদা রঙের পোশাক কখনওই আকর্ষণ হারায়নি। তাই পুজোর সময় সকালের দিকে জিনসের ওপর সাদা রঙের কুর্তি, টি-শার্ট যেমন কমফর্টেবল তেমনই আবার ফ্যাশনেবলও।
ছোটদের সাজেও থাকতে পারে অভিনবত্ব। মেয়েদের জন্য লেহেঙ্গা-চোলি বা ফ্রক, ছেলেদের জন্য কুর্তা-পাজামা— আরামদায়ক কাপড়ে তৈরি হলে সারাদিন ছোটা ছুটিতেও সমস্যা হবে না।
কাপড় বাছুন আবহাওয়া বুঝে :
পুজোর সময় গরম ও আর্দ্রতা মাথায় রেখে কাপড় বাছাও জরুরি। সূতি ও হ্যান্ডলুমের পাশাপাশি লিনেন হতে পারে আরামদায়ক বিকল্প। প্রাকৃতিক ফাইবারের এই কাপড়ে বাতাস চলাচল করে এবং দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ পরেও তুলনামূলক স্বস্তি পাওয়া যায়।
লিনেন ও সুতির মিশ্রণে তৈরি হালকা কাপড়ও পুজোর দিনের জন্য উপযোগী। অন্য দিকে রেয়ন সিল্কের তুলনায় হালকা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মেঘলা আবহাওয়া বা হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে জর্জেটের মতো দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন কাপড়ও বেছে নিতে পারেন।

পুরোনো দিনের রং, নতুন দিনের কাট:
পুজোর ফ্যাশনে পুরোনো রং ও মোটিফ নতুন ভাবে ফিরে আসছে। সাদা-লাল, গাঁদা ফুল, পদ্ম, কাঁথা স্টিচ, জামদানি কিংবা বাংলার লোকশিল্প—সবই এখন আধুনিক পোশাকের অংশ। ফলে ঐতিহ্যকে বাদ না দিয়েও নিজের ব্যক্তিগত স্টাইল তৈরি করা সম্ভব।
সেলিব্রিটি ফ্যাশন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া যেতে পারে, তবে হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। নিজের গায়ের রং, শরীরের গড়ন, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সবচেয়ে বড় কথা— আরামকে গুরুত্ব দিয়েই পোশাক বেছে নেওয়া ভালো।

পুজোর ফ্যাশনের আসল সৌন্দর্য শুধু নতুন পোশাকে নয়। সেই পোশাকে স্বচ্ছন্দ থাকা, নিজের মতো করে সাজা এবং চার দিনের আনন্দকে উপভোগ করাতেই তার স্বার্থকতা।

প্রিয়াঙ্কা বন্দ্যোপাধ্যায় (অভিনেত্রী) : আমার কাছে ফ্যাশনের অর্থই হল কমফর্ট। যে পোশাক পরে নিজেকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়, সেটাই আমার কাছে ফ্যাশন। দামি পোশাক হতেই হবে তার কোনও মানে নেই। ফ্যাশন বলতে আমার কাছে দুটো বিষয় প্রাধান্য পায়— আমি যে পোশাক পরছি তাতে আমাকে কেমন দেখতে লাগছে এবং সবচেয়ে বড় কথা হল সেই পোশাক পরে নিজে কতটা সন্তুষ্ট। শুধু পোশাকের ক্ষেত্রে নয়, জুতো, জুয়েলারি সব ক্ষেত্রেই আরাম হল প্রধান বিষয়। নীল, কালো-লালের কম্বিনেশন, মাস্টার্ড ইয়ালো— এই রংগুলো খুব প্রিয়। আমি শাড়ি পরতে খুব ভালবাসি। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ড্রেস পরতেও খুব ভালবাসি। জিনস-টি শার্ট, ট্যাঙ্ক টপ এগুলো সবসময়ই হিট। এবার পুজোতে পরার ইচ্ছা আছে আনারকলি। বোন যেহেতু ডিজাইনার, মায়ের অনেক শাড়ি থেকে আমাকে ড্রেস বানিয়ে দিয়েছে। অনেকেই হয়তো জানেন না, আমার একটা বুটিক আছে। ওখানেও মায়ের শাড়ি থেকে বানানো নানা ধরনের পোশাক লঞ্চ করব। এবারের পুজোতে আনারকলি ড্রেস, শাড়ি তো পরবই পাশাপাশি বডি কন, আমার বিশেষ পছন্দের। সবার পুজো ভালো কাটুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *