পথের ক্লান্তি ভুলে নতুন ঘর চিনে নিল বিহার থেকে আসা বাঘিনি
নিজস্ব সংবাদদাতা, ২ অক্টোবর- দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি কাটিয়ে বক্সার নতুন পরিবেশের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে তিন বছরের রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনি। বুধবার বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে আলিপুরদুয়ারের বক্সা টাইগার রিজার্ভে পৌঁছনোর পর প্রথম দিন প্রায় পুরোটাই বিশ্রামে কাটিয়েছিল সে। খাবারেও বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছবিটা বদলে যায়। ঘেরাটোপে পায়চারি শুরু করে নতুন অতিথি। পরে দেওয়া হয় প্রায় ১০ কেজি টাটকা মাংস। বন দফতর সূত্রের খবর, সেই খাবার শেষ করতে তার বিশেষ সময় লাগেনি।
শুক্রবার থেকে বক্সায় শুরু হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম সংগঠিত ব্যাঘ্র সংরক্ষণ। বক্সায় বহু বছর ধরে স্থায়ী বাঘের উপস্থিতি নেই। ২০১৮ সালের গণনাতেও এখানে বাঘের অস্তিত্ব মেলেনি। সেই শূন্যতা কাটাতেই বাল্মীকি থেকে আনা হয়েছে এই বাঘিনিকে। শুক্রবার বাঘিনিকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছাড়ার কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। লাইভ স্ক্রিনে তা দেখানোও হবে।
বাঘিনির জন্য তৈরি বিশেষ ঘেরাটোপে কয়েকটি হরিণ রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল নতুন পরিবেশে তার স্বাভাবিক শিকার-প্রবণতা কেমন থাকে, তা দেখা। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নতুন অতিথি হরিণগুলির দিকে এগিয়ে যায়নি। এরপরই তাকে ১০ কেজি টাটকা মাংস দেওয়া হয়। সেই খাবার অবশ্য সে খেয়ে নেয়।
এর পরেই দেখা যায় আর এক স্বাভাবিক আচরণ। ঘেরাটোপের মধ্যে তৈরি কৃত্রিম জলাশয়ে গিয়ে জল খায় বাঘিনি। আলিপুরদুয়ারে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে একাধিকবার জলাশয়ে নেমে শরীর ঠান্ডা করতেও দেখা গিয়েছে তাকে। তার চলাফেরা পর্যবেক্ষণের জন্য ঘেরাটোপের বিভিন্ন জায়গায় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
বনকর্তাদের পর্যবেক্ষণ, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঘেরাটোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাঘিনি। নতুন জায়গা চিনে নেওয়া এবং নিজের চারপাশ বুঝে নেওয়ার এই আচরণকে আপাতত ইতিবাচক বলেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাল্মীকি থেকে বক্সায় আসার পথও ছিল দীর্ঘ। বিহারের জঙ্গল থেকে প্রথমে সড়কপথে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরের উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় বাঘিনিকে। সেখান থেকে বিশেষ বিমানে পৌঁছায় আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা। তারপর ফের প্রায় ৩৭ কিলোমিটার সড়কপথ পেরিয়ে বক্সা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ট্রাঙ্কুলাইজ করার পর রাতভর এই দীর্ঘ যাত্রার ধকল সামলেই বুধবার সকালে নতুন ঠিকানায় পৌঁছায় সে।
বক্সায় পৌঁছনোর পরে পশুচিকিৎসক ও বনকর্তারা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। প্রথমে রাজাভাতখাওয়া এলাকায় বিশেষ সফট এনক্লোজারে রাখা হয়। বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী ধাপে তাকে ২.২ হেক্টরের বড় প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে স্থানান্তর করা হবে।
সাম্প্রতিক বন দফতর-ভিত্তিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাঘিনিকে প্রথমে ২.২ হেক্টরের বড় সফট এনক্লোজারে রাখা হবে প্রায় এক মাস। সেখানে মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে রেখে তার আচরণ, শিকার করার ক্ষমতা এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে। সব কিছু সন্তোষজনক হলে পরবর্তী পর্যায়ে তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত জঙ্গলে ছাড়া হবে। এই প্রকল্প একটি বাঘিনিতে থেমে থাকার কথা নয়। বন দফতরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বক্সায় ফের একটি প্রজননক্ষম বাঘের জনসংখ্যা তৈরি করা হবে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব।
এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ জানিয়েছেন, প্রাথমিক লক্ষ্য একটি ইউনিট তৈরি করা—একটি পুরুষ বাঘ ও দু’টি বাঘিনি। তবে পরবর্তী বাঘ আনার আগে প্রথম বাঘিনির গতিবিধি ও অভিযোজন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। আরও বড় পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। আগামী দু’বছরের মধ্যে অন্য রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে আরও অন্তত ছ’টি বাঘ বক্সায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বন দফতর সূত্র জানানো হয়েছে।
এই প্রকল্প সফল হলে তার গুরুত্ব শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বক্সার বাস্তুতন্ত্রে শীর্ষ শিকারির প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ডুয়ার্সের পর্যটনেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে বন দফতর। পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাঘের প্রত্যাবর্তন উত্তরবঙ্গের পর্যটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’