শনিবার | ২২ আগস্ট ২০২৬

প্রথম ভারতীয় মহিলা বৈমানিক সরলা ঠাকরাল

 প্রথম ভারতীয় মহিলা বৈমানিক সরলা ঠাকরাল

মণীষা গুপ্ত পাল

কথায় আছে শাড়িতেই নারী। আর এই শাড়ি নিয়েই রচিত আছে বহু কাহিনি। ভারতীয় নারীরা বারো হাত শাড়িকে অঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও সম্ভ্রম বজায় রেখে আকাশ থেকে যুদ্ধক্ষেত্র সবেতেই দক্ষতার সঙ্গে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছ। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ শাড়ি পড়ে নেমেছিলেন রণাঙ্গনে আর আজ যার কথা লিখব বলে কলম ধরেছি সেই ভারতীয় নারী যিনি স্বাধীনতার পূর্বে মাত্র ২১ বছর বয়সে শাড়ি পরেই বিমান চালকের আসনে বসে ছিলেন।
১৯১৪ সালের ৮ ই আগস্ট দিল্লির এক সচ্ছল পরিবারের সরলা ঠাকরাল জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর মাত্র ১৬ বছর বয়সে সরলার বিয়ে হয় তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত পাইলট পি ডি শর্মার সঙ্গে। সরলার শ্বশুরবাড়িতে নয়জন পাইলট ছিলেন। কথায় আছে, একজন সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর অবদান অনস্বীকার্য। সরলার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টোটাই হয়েছে। তাঁর স্বামী তাঁকে প্রথম আকাশে উড়ানের যাত্রায় উৎসাহিত করেন। শ্বশুরমশাই তাঁকে দিল্লির একটি ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেন। সরলা অবশ্য সেইসব পুরুষদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ ছিলেন যারা তাঁকে অন্দরমহলের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে প্রতিভা বিকাশের সাহায্য করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে চার বছরের একটি কন্যা সন্তানের দায়িত্ব সামলে শাড়ি পরে এক রমণী দুই ডানার ‘জিপসি মথ’ বিমানের ককপিটে প্রবেশ করেন এবং এবং যখন এই বিমানটি মাটিতে ফিরে এলো ততক্ষণে প্রথম ভারতীয় মহিলা বিমান চালক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা হয়ে গেল। মাত্র ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিটের প্রশিক্ষণের পরেই তাকে একক ভাবে বিমান চালানোর অনুমতি দিয়েছিলেন প্রশিক্ষক। প্রয়োজনীয় ১০০০ ঘণ্টা উড্ডয়ন সময় সম্পন্ন করার পর সরলার প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে ‘এ লাইসেন্স’ অর্জন করা এবং বাণিজ্যিক বিমান চালানোর জন্য তাঁকে উপযুক্ত মনে করা হয়।
কিন্তু বিধি বাম, বিধাতা যে অলক্ষ্যে অন্য কিছু ভেবে রেখেছেন। ১৯৩৯ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় সরলার সহায়ক স্বামী পি ডি শর্মার মৃত্যু তাঁর জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে থেমে যাওয়ার পাত্রী সরলা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরলা যোধপুর যান, বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্সের প্রশিক্ষণ নিতে। সে সময়ে দাঁড়িয়ে সরলার শ্বশুরবাড়ি ছিল আধুনিক মনস্ক ও নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যে সময়ে মেয়েরা ঘরের চার দেওয়ালের বাইরে গিয়ে কাজ করার সাহস দেখাতে একেবারেই অক্ষম ছিল। সমাজ ছিল নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি তাঁর চেষ্টা থেকে সরে আসেননি। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বেসামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। তবু সরলা ভেঙে পড়েননি। তিনি প্রতিকূলতার মুখে হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো মানুষই ছিলেন না। জীবন যখন খারাপের দিকে মোড় নিত তিনি তখন সাফল্যের নতুন পথ খুঁজে বের করার সাহস সঞ্চয় করতেন। বিমান চালনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সরলা লাহোরের ‘মেয়ো স্কুল অফ্ আর্টস’ থেকে চারু ও চিত্রকলার উপর ডিপ্লোমা করেন এবং সফলভাবে একজন জুয়েলারি ডিজাইনার, শাড়ি ডিজাইনার ও চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সন্তানের লালনপালনের দায়িত্ব এবং নিজের ভরণপোষণের প্রয়োজনে সরলা এমন পথ বেছে নেন যা তাঁকে সমাজে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।
সেই সময়ের বিখ্যাত সব নারীরা যেমন বিজয় লক্ষ্মী পণ্ডিতের মতো ব্যক্তিত্বরা তাঁর ডিজাইন করা শাড়ি পরিধান করতেন। সরলা ছবি আঁকা কাপড়ের নকশা এবং গয়না ও পোশাকের নকশা করা শুরু করেন। তিনি তাঁর শিল্পকর্মে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে তাঁর এই সমস্ত কাজ কটেজ এম্পোরিয়াম এবং ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামাতেও পাঠিয়েছিলেন। তিনি হয়ে উঠলেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর সরলা দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে লাহোর থেকে দিল্লি ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন আর পি ঠাকরালকে। এখানেও সরলা তৎকালীন সমাজের নিরিখে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন নিজের মতো করে ভালোভাবে বাঁচার অধিকার আছে । কেনই বা তিনি সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন?
বিমান চালনার ক্ষেত্রে ভারতীয় নারীদের মধ্যে প্রেম মাথুর দূর্বা ব্যানার্জি এবং পদ্মাবথু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নারীদের নাম সর্বাগ্রে মনে আসে। তাঁরা সকলেই আকাশে নিজেদের কর্মদক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন এবং লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নারীর জন্য পথ মসৃণ করে দিয়ে গেছেন তবে সকল ভারতীয় নারী বৈমানিকদের একজনই ছিলেন পথপ্রদর্শক তিনি সরলা ঠাকরাল।
২০০৮ সালের ১৫ই মার্চ স্বাধীনচেতা স্বাবলম্বী এই নারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা এই শিক্ষায় নিতে পারি যে প্রতিকূলতা সংকল্পকে নিভিয়ে দিতে পারে না। তাঁর সাফল্য ও সংগ্রামের কাহিনি প্রত্যেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণা। পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হয় তিনি কখনও নিজের জীবনকে বাধ্যবাধকতার অন্ধকারে ঠেলে দেননি।
সরলা ঠাকরাল একজন বৈমানিক, একজন ডিজাইনার, চিত্রশিল্পী ও একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে প্রমাণ করেছেন যে জীবনের সফল হওয়ার জন্য নিজের এবং নিজের লক্ষ্যের উপর দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট।
যেসব নারীরা নিজেদের গণ্ডির বাইরে বেরোতে ভয় পান আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন বা সমাজের ভয়ে স্বপ্নের উড়ানে ডানা মেলতে ভয় পান সরলা ঠাকরালের গল্প শুধুমাত্র তাদের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *