বুধবার | ১৭ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার : ‘অনেকেই মনখারাপ আর অবসাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন’

 সাক্ষাৎকার  : ‘অনেকেই মনখারাপ আর অবসাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন’

প্রৈতি চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত মনোবিজ্ঞান বিভাগে গবেষণারত। জড়িত অধ্যাপনার সঙ্গেও। আলাপচারিতায় বাসব মৈত্র

প্রথমেই জানতে চাইব, আজকাল মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচুর কথা হয়।এই মানসিক স্বাস্থ্য বলতে ঠিক কী বোঝায়? কোন কোন বিষয় এর অন্তর্গত?
শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত মানসিক স্বাস্থ্যকে আমরা ততটা গুরুত্ব দিতে পারি না। বরং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক ট্যাবু স্টিগমা এখনও রয়ে গেছে। খোলাখুলি মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এখনও অনেকেরই সমস্যা হয়। শরীর আর মন তো আলাদা নয়। শরীর ভাল না থাকলে মনও আমাদের ভাল থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্যকে সহজ কথায় যদি গুছিয়ে বলতে হয়— এটি হচ্ছে প্রত্যেকদিনের চাপ, প্রত্যেক দিনের আমার যে কাজ তা করতে পারা, আমার নিজের ভাল থাকাকে এনশিওর করা, নিজের প্রতি যত্ন নেওয়া, প্রত্যেকদিনই তো কিছু না কিছু কনট্রিবিউট করার থাকে, সে যে যা কাজই করি না কেন— এগুলো করতে পারা। এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের নির্ধারক। কোনও মানসিক অসুখ নেই মানেই আমি মানসিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তা নয়। দিনের শেষে আমাদের যে মানসিক স্যাটিসফেকশন, আমি আমার দিনটা ভাল কাটালাম— এটা জরুরি। এমন অনেকেই রয়েছেন যাদের মানসিক অসুখ রয়েছে, সেটা নিয়ে তারা দিব্যি চলছেন। আবার অনেকেরই কোনও মানসিক অসুখ না থাকলেও তারা ঠিক অ্যাডজাস্ট করে উঠতে পারছে না তাদের চাপগুলোর সঙ্গে। বা নিজেকে ভাল সময় দিতে পারছেন না, বা তার কোয়ালিটি অফ লাইফ যেটা সেটার মান কোথাও নেমে যাচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের তিনটে দিক রয়েছে—
১। আমি আমার ইমোশনগুলো কীভাবে বুঝছি। কীভাবে প্রসেস করছি।
২। আমি আমার চাপগুলোকে কীভাবে সামলাচ্ছি।
৩। নিজেকে নিজে কতটা ভালবাসতে পারছি, নিজেকে নিজে কতটা মূল্য দিতে পারছি।
৪। আমি কত ভাল কমিউনিকেট করতে পারছি।
৫। পরিবার, পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব। আমার সহকর্মী— তাদের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক। বিপদে পড়লে তারা পাশে থাকবে কিনা এটাও কিন্তু ভাল থাকার মাপকাঠি। মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে এই দিকগুলো উঠে আসে।

অনেকেই বলেন,আজকাল যে ভাবে মানুষ সমাজ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছেন,সেটা মানুষের থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করছে । এটা যেমন একটা দিক,সমাজমাধ্যমে আসক্ত হওয়ার ফলে মানুষ নিজের মত,নিজের রুচি,শৈল্পিক সত্তা সবটাই একটা বৃহৎ জগতের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারছেন। এই বিষয়টাকে একজন মনোবিদ হিসেবে কীভাবে দেখেন?
সামাজিক মাধ্যমের অবশ্যই ভালো দিক আছে। যেমন অনেক ভালো ভালো লেখা, ছবি, গান আগে সামাজিক মাধ্যম না থাকার কারণে আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারতাম না, সেগুলো যেমন ভাগ করে নিতে পারছি দেখা বা শোনার সুযোগ পাচ্ছি। আবার উল্টোদিকে সামাজিক মাধ্যমের খারাপ দিকও আছে। সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি কিন্তু আমাদের সু-স্বাস্থ্যের পরিপন্থি। যত আমার স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাবে আমার কিন্তু ততটাই কাজের প্রতি অনীহা বাড়বে। আমার কাজের প্রতি মনঃসংযোগ নষ্ট হবে। আমার মানসিক সমস্যা হতে পারে। আমার মুড খারাপ থাকলে আমি খিটখিটে হয়ে যাব। সামাজিক মাধ্যমের আরেকটি খারাপ দিক হল— অনেক অপ্রয়োজনীয় তথ্যও আমার কাছে চলে আসছে। ফলে আমার কাছে ইনফরমেশন ওভারলোড হয়ে যাচ্ছে। যে ইনফরমেশনগুলো আমার না জানলেও চলে সেগুলো যখন আমি ইনপুট হিসেবে নিচ্ছি, সেটা যখন প্রসেস করছে আমার ব্রেন তখন কোথাও একটা ইনফরমেশন ওভারলোড হচ্ছে। এত তথ্যের তো আমার দরকার নেই। এবং তার সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে এমন অনেক কিছু আসছে যেটা দেখে আমার মনে হচ্ছে যে আমিই বুঝি সবচেয়ে খারাপ আছি, সবচেয়ে দুঃখে আছি, আর সবাই ভাল আছে। একটা অবাস্তব ভাল থাকার স্ট্যান্ডার্ড সেট হয়ে যায় এবং সবাই সবার মতো করে বাকিদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে যেটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়।
উত্তরণের পথ বলতে, যদি আমরা নির্দিষ্ট সময় আমরা বেঁধে দিই যে দিনের এইটুকু সময় আমরা এটা ব্যবহার করব তাহলে এটা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কোনও খারাপ প্রভাব ফেলবে না। এখন সামাজিক মাধ্যমের অ্যাপ বেরিয়েছে যেগুলো ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার সুযোগ দেবে। নির্দিষ্ট সময় পর সেটা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করলে আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু যদি তা না পারি তাহলে আমাদের ভাল থাকা, আমাদের প্রোডাকটিভিটির ওপর তা প্রভাব ফেলবে।

অবসাদ মানুষকে ভীষণ ভাবেই দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। অবসাদের বিভিন্ন কারণ হতে পারে। সম্ভাব্য কারণ ও তার থেকে মুক্তির কথা যদি বলেন?
অনেকেই মনখারাপ আর অবসাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। মন যেমন ভাল থাকে, মন খারাপ হতেই পারে। কিন্তু মানসিক অবসাদ বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, একটি ডায়গনোজেবল কন্ডিশন। এটি একটি ডায়গনোজ করা একটি মেন্টাল স্টেট। মেন্টাল ইলনেস, মানসিক অসুখ। যারা প্রকৃত অর্থে অবসাদে ভুগছেন তারা কোথাও যেন উপেক্ষিত। লোকে মানে না জেনেই ‘অবসাদ’ কথাটিকে ব্যবহার করছে। অবসাদ মৃত্যু অবধি ডেকে আনতে পারে। অবসাদ আত্মহত্যার একটি কারণ। অবসাদের সঙ্গে যেমন ব্রেন বায়োলজির সম্পর্ক আছে বা জিনের সম্পর্ক আছে, বাড়িতে যদি কারও ফ্যামিলি হিস্ট্রি থাকে তার সম্পর্ক আছে তেমনই জীবনে যদি নেতিবাচক বা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে মানসিক অবসাদ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
মানসিক অবসাদ হলে আমাদের খুব দ্রুততার সঙ্গে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
নিজেকে দেখা ও ভাবার মধ্যে যদি কোনও অসঙ্গতি থাকে, নিজেকে যদি আমি ভাল না বাসি, নিজেকে যদি আমি ভীষণ অসহায়, ভীষণ হোপলেস, অকর্মণ্য মনে করি তাহলে কিন্তু মানসিক অবসাদ হওয়ার চান্স অনেক বেশি। আমি যতই সফল হই না কেন। বাইরের দুনিয়ার কাছে আমি হয়তো খুব সফল সাকসেসফুল কিন্তু আমি নিজের কাছে কখনওই গুড এনাফ হয়ে উঠতে পারছি না। নিজেকে নিয়ে যে ভাবনা এবং ভাবনার মধ্যে যে অসঙ্গতি সেটা বড় কারণ অবসাদের। সামাজিক দিক যদি ধরি বা রাজনৈতিক দিক যদি ধরি, এই যে বেকারত্ব, চাকরি চলে যাওয়া বা ফিকসড সোর্স অব ইনকাম না থাকে, মাথা গোঁজার ঠঁাই না থাকা — এগুলোও অবসাদ ডেকে আনতে পারে। এই অবসাদের কোনও রেমিডি নেই। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে এর রেমিডি আনা সম্ভব নয়।
কারও যদি দিন ১৫ বা তার বেশি সময় ধরে মন ভীষণ খারাপ থাকে, কান্না পায়, ঘুম আসছে না, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন হয়, প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি মনে হয় বা মৃত্যু চিন্তা আসে— এই ধরনের আরও কিছু লক্ষণ দেখে দিলে সাইক্রিয়াটিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সাইকোথেরাপি একটি বড় অস্ত্র যেটা দিয়ে আমরা অবসাদকে অনেক মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারি।

বই, গান, শিল্প, সংস্কৃতি যা নিয়েই পুরুষ বা নারী মেতে থাকুন না কেন সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে এদের গুরুত্ব কতখানি?
বই পড়া, গান গাওয়া বা যে কোনও শিল্প মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকা, যে কোনও ক্রিয়েটিভ লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ভালো। আমাদের মনের মধ্যে যে চাপ, উদ্বেগ বা দ্বন্দ্ব যা কিছু চলে তা অনেকটাই এই ক্রিয়েটিভ কাজগুলোর মধ্যে দিয়ে চ্যানেলাইজ হয়ে যায়।
তবে এটা কখনই কোনও সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না, কারণ আজকে আমার পরিবারের সঙ্গে যা সম্পর্ক বা বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রীর বা সন্তানের সঙ্গে যে সম্পর্ক এগুলো আমাদের ভাল থাকার এক-একটা স্তম্ভ। অবশ্যই আমার কিছু ভাল ছবি থাকতে পারে, নিজেকে ভাল রাখার জন্য, নিজেকে ভাল সময় দেওয়ার জন্য কিছু করতে পারি কিন্তু সেটা ভাল সম্পর্কর কোনও বিকল্প হতে পারে না। সম্পর্ক বিভিন্ন ধরনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে— সামাজিক চাহিদা, মানসিক চাহিদা, শারীরিক চাহিদা। যখন আমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার প্রশ্ন আসছে, সামাজিক-মানসিক সেখানে কিন্তু এটার কিছু বিকল্প হতে পারে না। তবে নিজের সঙ্গে ভাল সময় কাটানো সেটা যে কোনও শিল্প মাধ্যমকে আশ্রয় করেই হোক, সেটা কাটানোও খুব দরকার। তারও অনেক উপকারিতা আছে।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *