শনিবার | ১৩ জুন ২০২৬

দেখে এলাম, শুনে এলাম তানজিনিয়ার মেয়েদের সংগ্রামের কাহিনি

 দেখে এলাম, শুনে এলাম তানজিনিয়ার মেয়েদের সংগ্রামের কাহিনি

সুস্মিতা ধর
“ম্যা ডাম, আপনাদের মেয়েরা যেমন ঘরের কাজ করে, বাচ্চা সামলায়, আবার বাইরেও রোজগার করে, ঠিক তেমনি আমাদের মেয়েরাও।”
“তাই না-কি? তো আপনারা, মানে ছেলেরা, কী করেন?”
“আমরা? আমরাও বাইরে কাজ করি। কৃষিকাজ এখানের প্রধান কাজ। সঙ্গে আছে মাইনের কাজ, ট্যুরিস্ট ব্যবসা, গাড়ির কাজ-সহ টুকটাক আরও অনেক কিছু।”
কথা হচ্ছিল তানজিনিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী দার-এ-সালাম শহর ঘুরে দেখার সময় গাড়ির ড্রাইভার এড্রোর সঙ্গে।
“আচ্ছা, এড্রো, এখানকার মেয়েরা পড়াশোনা করে তো? এখানে কি মেয়েদের ছোটো বয়সে বিয়ে হয়? মেয়েদের স্বাধীনতা কতটুকু”
“আরে ম্যাডাম, রাখুন রাখুন। একসঙ্গে এত প্রশ্ন করলে উত্তর দেব কীভাবে? চলুন, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি আমার বোন হাওয়ার কাছে। ও ব্র্যাকে কাজ করে। ব্র্যাক হল একটি এনজিও, যে এখানকার মেয়েদের উন্নতির জন্য কাজ করে চলেছে গত প্রায় বেশ কয়েক বছর ধরে। ও আপনাকে নিয়ে যাবে সেইসব মহিলাদের কাছে, যারা ব্র্যাকের সহায়তায় নিজের চেষ্টায়, নিজের উদ্যোগে পরিচিতি পেয়েছে সমাজে, পেয়েছে আর্থিক সফলতা।”
গেলাম অ্যাড্রোর দিদি হাওয়ার সঙ্গে। কথা বললাম প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন মেয়ের সঙ্গে। কথাবার্তা হল ইংরেজিতেই। দোভাষীর কাজ করল অ্যাড্রোর বোন হাওয়া।
আর আমি আশ্চর্য হয়ে শুনে গেলাম তাদের কাহিনী। শুনতে শুনতে মনে হল এ আমি কী শুনছি? এ যে আমার দেশের মেয়েদের যন্ত্রণা, লাঞ্ছনা, দুর্দশা, অপমান আর সংগ্রামের কাহিনী? তাই কী সাহিত্যিকরা বলে গেছেন—
“ভারতীয় সমাজ কেন বিশ্বের প্রায় সব সমাজ ব্যবস্থায়ই পরিলক্ষিত হয় নারী-পুরুষের বৈষম্য। মানব সভ্যতা বিকাশের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের বৈষম্য চলে আসছে মানব সমাজের একেবারে আদিম যুগের পরবর্তী সময় থেকেই। এই বিভিন্ন স্তরে আমরা দেখি এই বৈষম্য কখনো নগ্ন, কখনো প্রচ্ছন্ন, কখনো নমনীয় এবং কখনো এতটাই কদর্য যে তা ভাবতে বসলে আঁতকে উঠতে হয়। প্রাচীন যুগ থেকে আজ অব্দি পুরুষ-শাসিত সমাজব্যবস্থা ধরেই নিয়েছে যে নারী-পুরুষের মধ্যে এই যে বৈষম্যের ব্যবধান, এই যে পুরুষের প্রাধান্য এবং নারীর এই যে বশ্যতা, এ যেন শাশ্বত, বিধির বিধান— চিরকালই ছিল, এখনো আছে আর অনাগত ভবিষ্যতেও চলবে বা থাকবে। তাই শুধু আমাদের দেশ নয়, সকল দেশের মানুষ এই অবস্থাকে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছে সভ্যতা বিকাশের বিভিন্ন স্তরে। তারই প্রতিফলন পড়ছে মানুষের মনে, ধ্যান-ধারণায়, চিন্তা-ভাবনায়, আবেগ-অনুভূতিতে, শিল্প-সাহিত্যে, কাব্য-সঙ্গীতে সর্বত্রই।”
ছাব্বিশ বছর বয়সি মরিয়ম রুনগেম্বার কথা দিয়েই শুরু করি চলুন। তানজানিয়ার কিলোলো (Kilolo) জেলার কিটেলিওয়াসি (Kitelewasi) গ্রামের মরিয়মের খুব ইচ্ছে ছিল পুলিশ অফিসার হওয়ার। কিন্তু বিধি বাম। শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল তার। সমাজের নিয়ম মেনে বিয়ে হয়ে গেল তাড়াতাড়িই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই বিয়েও টিকল না। এদিকে ততদিনে দুই সন্তানের মা হয়ে গেছেন মরিয়ম। কীভাবে মানুষ করবেন, কী করবেন এই চিন্তায় মরিয়ম যখন অস্থির, তখনই শুরু হল ব্র্যাক মেন্ডেলিওর প্রোগ্রাম। ২০২৪ সালে এই প্রোগ্রামে যোগদান করেন তিনি। আমাদের রাজ্যের বন্ধনের মতো ভিলেজ সেভিংস অ্যান্ড লোন অ্যাসোসিয়েশন থেকে লোন নিয়ে মরিয়ম শুরু করেন বিভিন্ন আকৃতির সুদৃশ্য পটের (pot) ব্যবসা। কঠোর শ্রম আর ডিসিপ্লিন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সফলতা এনে দেয় মরিয়মকে। মোটামুটি দেড় বছরের মধ্যেই সংসারের চাহিদা মিটিয়ে লোনের সিংহভাগ শোধ করে ফেলেন মরিয়ম। আজ মরিয়ম অন্যান্য তরুণীদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন, বিশেষ করে যারা তাদের দাম্পত্য জীবনে সহিংসতার সম্মুখীন হচ্ছেন তাদের কাছে। জীবনের সকল প্রতিকূলতাকে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি জীবন্ত উদাহরণ তিনি। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মরিয়ম কেবল তার নিজের জীবনকেই বদলে দেননি, বরং একই রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছেন।
আটু ইবোনি স্থানীয় হাঁস-মুরগি পালনে উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু এদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় এবং অধিক উৎপাদনশীল না হওয়ায় আতু বিশেষ লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন না। অথচ আতু কিন্তু ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবারই দিতেন তাদের। এমন সময়ই শুরু হল “এক্সিলারেটিং ইমপ্যাক্ট ফর ইয়ং ওমেন বা এআইএম” নামে ব্র্যাক মেন্ডেলিওর একটি প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করে ব্র্যাক (BRAC)-এর সহায়তায় উন্নত ও স্থানীয় জাতের মুরগির মধ্যে ক্রসব্রিডিং (সংকরায়ণ) ঘটিয়ে অধিক উৎপাদনশীল, রোগ-প্রতিরোধী এবং সহজে লালন-পালনযোগ্য উন্নত জাতের সাসো মুরগির সরবরাহ, আতুর পরিশ্রম, সংগ্রাম আর অধ্যবসায় অচিরেই আতুর ব্যবসার কলেবরকে বৃদ্ধি করে তুলল।
কিছুদিনের মধ্যেই আতু তার ব্যবসার জন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে ফেললেন। এর ফলে পরিবারের প্রতিদিনের চাহিদা মিটিয়েও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্যও কিছুটা উদ্বৃত্ত রাখতে সমর্থ হন তিনি। আতুর সফলতা তানজানিয়ার ডোডোমা অঞ্চলের কোন্ডোয়া (Kondoa) জেলায় আজ একটি নিদর্শন।
“আমি হাবিবা। ২৬ বছর বয়সে আমি তিন সন্তানের জননী হয়ে গেলাম। স্বামীর স্বল্প রোজগারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমি। নিত্যদিন সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। পয়সার অভাবে আর বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে পড়াশোনাও ঠিকঠাক করতে পারিনি। এমন সময় পরিচয় হল ব্র্যাক মেন্ডেলিও কোন্ডোয়া শাখার প্রজেক্ট সহকারীর সঙ্গে। ওদের ওখানে ট্রেনিং নিয়ে আমার সাহস বাড়ল। ঠিক করলাম ফ্রুট জুস সরবরাহের কাজ করব আমি।”
“ফ্রুট জুস কেন?”
“আসলে আমি চিন্তা করে দেখলাম ক্ষেত-খামারে কাজ করা আমার পোষাবে না। আর হাঁস-মুরগি পালনের জন্যও আমার বাড়ি অনেক ছোটো। তাছাড়া আমাদের দেশ মূলত গ্রীষ্মপ্রধান। আর এখানকার ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে শীতের দেশের লোকের সমাগম হয় খুব বেশি। ওরা টাটকা ফ্রুট জুস খেতে খুব পছন্দ করে।”একমুখ হাসি নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই কথাগুলো বললেন হাবিবা।
“তারপর?”
“তারপর? তারপর লেগে গেলাম কাজে। বিভিন্ন ধরনের ফল কিনে ফ্রেশ ফ্রুট জুস তৈরি করে বসে গেলাম রাস্তার পাশে। জানেন, প্রথম দিনেই আমি প্রায় তিন লিটার ফ্রুট জুস বিক্রি করে ফেললাম। ২০২৩ সালে শুরু করে আজ তিন বছরে আমি অনেকটাই সফল। আমার নিজস্ব রোজগার আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, দিয়েছে আর্থিক সফলতা, মাথা উঁচু করে চলার যোগ্যতা, অপমান এবং শোষণ কাটিয়ে ওঠার সাহস, আর সঙ্গে সঙ্গে কমিয়েছে আমার নির্ভরতা ও বিচ্ছিন্নতা।
তানজিনিয়ার ইবোনি সোয়েটো স্ট্রিটের (Iboni Soweto Street) তিন সন্তানের জননী ছাব্বিশ বছর বয়সি হ্যাপিনেস গৃহবধূ হয়েই কাটিয়ে দিয়েছিলেন বিয়ের পরের দশ-দশটি বছর। ছেলে-মেয়েরা বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের অভাব-অনটন যেন গিলতে আসত হ্যাপিকে। কী করবেন, কোথা থেকে শুরু করবেন—এই চিন্তায় যখন অস্থির, তখনই তিনি পেলেন নতুন দিশা। ব্র্যাক মেন্ডেলিওর AIM প্রজেক্টের ট্রেনিং সাহস আর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল হ্যাপির। মায়ের কাছ থেকে কিছু শিলিং ধার করে লিকুইড টয়লেট সোপ, লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ তৈরি করে নিয়ে গেলেন রাস্তার ধারের ছোটো ছোটো কফিশপ, চায়ের দোকান, আর খাবারের দোকানে। কারণ হ্যাপি জানতেন, রাস্তার পাশের এই দোকানগুলোতে ট্যুরিস্টের আনাগোনা বেশি, ফলে সোপের চাহিদাও থাকবে সবসময়। দামে মোটামুটি সস্তা হওয়ায় বেশিরভাগ দোকানই হ্যাপির তৈরি করা সাবান রাখতে রাজি হল। যখন দেখলেন প্রফিট মোটামুটি ভালোই হচ্ছে, তখন এই লিকুইড টয়লেট সোপ আর হ্যান্ড ওয়াশের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করা শুরু করলেন কাপড় কাচার ডিটারজেন্ট পাউডার। ছোটো ছোটো পাউচ তৈরি করে সরবরাহ করা শুরু করলেন রাস্তার ধারের ছোটো ছোটো হোম-স্টে, হোটেলগুলোতে। ভালোই সাড়া পেলেন।
“কী লিখবেন ম্যাডাম? আমার এই ব্যবসা তো আর বিশেষ কোনো বড়ো ব্যবসা নয়? তবে হ্যাঁ, আমি কিন্তু খুশি এতে। আমার রোজগার দিয়ে আমি আমার পরিবারের চাহিদার কিছু অংশ মেটাতে পারি, মেটাতে পারি আমার ছেলে-মেয়ের চাহিদা-সহ আমার নিজের কিছু কিছু শখ-আহ্লাদও।”
ঢেঁড়স এবং টমেটো চাষ করে সফলতার মুখ দেখেছেন চিনিয়াসুংউই নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী নীমা আশেলি কুটোনা। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে ব্র্যাক মেন্ডেলিও সংস্থা থেকে এআইএম প্রোগ্রামে ছয় মাসের সামাজিক ক্ষমতায়নের ট্রেনিং নেন তিনি। সেখানে শেখেন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, নিজস্ব অধিকার, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন এবং বিপণন সম্পর্কে। এই ট্রেনিং নিমার মধ্যে এক স্ফুলিঙ্গ জাগিয়ে তোলে। নিমার মনে হয়, কেন আমি এতদিন ঘরে বসে ছিলাম? কেন আমি আরও আগে শুরু করিনি কাজ? গুলওয়ে সম্প্রদায়ের নেগেঙ্গে কুমিতে ভাড়া নেওয়া এক একর জমিতে টমেটো এবং ঢেঁড়স চাষ করা শুরু করেন তিনি। উন্নত মানের বীজ, সার আর সঙ্গে নিমার কঠোর পরিশ্রম ভালো মানের ফলন উৎপাদনে সহায়ক হল। পরিমাণে কম হলেও প্রথম বছরেই লাভের মুখ দেখেন নিমা। ২০২৫ সালের লাভের অংশ দিয়ে নিমা পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতেও সমর্থ হন কিছুটা।
এখন নিমা স্বপ্ন দেখেন খামারের আয় দিয়ে সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তুলবেন, তৈরি করবেন একটি সুন্দর বাড়ি আর খুব সাজবেন।
“জানেন দিদি, ছেলে-মেয়েরা কিছু কিনতে চাইলে কিনে দিতে পারতাম না, নিজের জন্য একটা সাধারণ ড্রেস কিনতে হলেও সাতবার ভাবতে হত, সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম— এই বুঝি কোনো বাচ্চা অসুখে পড়ল। ডাক্তার দেখাব কী করে?”— দুই চোখে জল নিয়ে কথাগুলো বললেন নিমা। আজ নিমা আশেলি কুটোনা তার সম্প্রদায়ের কাছে অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সঠিক সুযোগ আর অটল দৃঢ় সংকল্প থাকলে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
মাসুয়া (Maswa) জেলার সিনায়াঙ্গা মুইঙ্গে (Shinyanga Mwenge) গ্রামের ২৭ বছর বয়সি দুই সন্তানের জননী লুসি মুইগুলু মাসুঙ্গা স্থানীয় বীজ ব্যবহার করে ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করতেন। কঠোর পরিশ্রম করেও লুসি ঠিকঠাক ফুল ফোটাতে পারছিলেন না। ব্র্যাক-এর ভিজানা কিলিমো বাইসারা (Vijana Kilimo Baishara) প্রজেক্টে টেকনিক্যাল ট্রেনিং নিয়ে তিনি শিখলেন সঠিক সময়ে জমি প্রস্তুতির পদ্ধতি, শিখলেন কী ধরনের সার ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে গাছকে রক্ষা করতে হবে পোকামাকড়ের হাত থেকে। এবার লুসি উন্নত প্রজাতির তিন ধরনের সূর্যমুখী গাছের চাষ করা শুরু করলেন। খরার কারণে তাঁর সম্ভাব্য উৎপাদন কিছুটা কমে গেলেও, আগের থেকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেল উৎপাদনে। শখের কৃষিকাজ থেকে কৃষি ব্যবসায় লুসির যাত্রা তাঁর কঠোর পরিশ্রম, মহিলা ক্ষমতায়ন এবং কৃষি প্রশিক্ষণের সঠিক শিক্ষাকে চিত্রিত করে। আজ লুসির সফলতা কৃষক সংগঠন এবং বৃহত্তর সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁকে একজন আদর্শ নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি এখন কৃষিকাজকে কেবল বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবেই দেখেন।
Mwangta ওয়ার্ডের একটি ছোট্ট গ্রাম, নাম হল ইসোকা (Isoka)। চার সন্তানের জননী ঊনত্রিশ বছর বয়সি সেভারিনার কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় আজ এই গ্রামের সকলের কাছে উদাহরণ হয়ে আছে। ক্লাস সেভেন পাশ করার পর পরই বিয়ে হয়ে যায় সেভারিনার। প্রথাগত শিক্ষার অপ্রতুলতা সত্ত্বেও নিজস্ব রোজগারের ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা সবসময় কাজ করত ওর মনের মধ্যে। ছোটো থাকতেই বিভিন্ন ডিজাইনের ড্রেস, ফেব্রিক, এমব্রয়ডারির নকশার প্রতি ঝোঁক ছিল সেভারিনার। ব্র্যাক মেন্ডেলিও সংস্থার এআইএম প্রোগ্রামে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওদের সরবরাহকৃত সেলাই মেশিনের সাহায্যে খুব তাড়াতাড়িই সেভারিনা শুরু করে দিলেন ড্রেস তৈরির কাজ। নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করলেন আধুনিক রুচিসম্মত ড্রেস। ফলে খুব সহজেই বিক্রি হয়ে গেল সেভারিনার তৈরি করা সব ড্রেস। ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ সেভারিনা স্বপ্ন দেখে টেইলারিংয়ের পাশাপাশি শুরু করবেন মাছের ব্যবসা, শুরু করবেন লিকুইড সাবানের ব্যবসাও।
শুধু হাবিবা, আতু ইবোনি, মরিয়ম, হ্যাপিনেস, নীমা, লুসি, ইসোকা নয়, তানজিনিয়ায় আজ অনেক মেয়েরাই স্বামীর রোজগারের প্রত্যাশায় বসে না থেকে এগিয়ে আসছেন স্বনির্ভর—
হবার লক্ষ্যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণভিত্তিক উদ্যোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে ঘরের কাজের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসছেন নিজস্ব পরিচিতি গড়ার লক্ষ্যে।
তানজিনিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করেছেন সামিয়া সুলুহু হাসান (Samia Suluhu Hassan) ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। ২০২১ সালে প্রথমবার তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তানজিনিয়ায় নারীদের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। নারী নেতৃত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি, যা দেশের সামগ্রিক নারী ও লিঙ্গ উন্নয়ন নীতি এবং ভিশন ২০২৫-এর মূল লক্ষ্য। এছাড়া, বিগত বছরগুলোতে মাতৃমৃত্যু কমেছে, উন্নত হয়েছে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা। প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রশাসনে ও উচ্চপর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছেন তিনি। নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন নারী শিক্ষার প্রসারে, বাড়িয়েছেন আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি।
তবুও প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার অভাবের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। এখনও প্রায় ঊনত্রিশ শতাংশ মেয়ে বিবাহিত হয় ১৮ বছরের আগেই। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে গর্ভাবস্থার জটিলতার কারণে আজও মৃত্যু বরণ করে বহু নারী। শিক্ষায় অগ্রাধিকার এখনও পায় পরিবারের ছেলেরা, যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত থেকে যায় মেয়েরা। তবে দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান নেতার অধীনে নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে দেশের প্রায় সর্বত্র, যা আশাবাদী করে তুলছে বিশ্বের আপামর নারীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *