ইরান যুদ্ধের অন্তরালে চীন-রাশিয়ার কৌশলগত ছায়া!!
ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, ট্রাম্প ইবা নেতানিয়াহু কেউই দেশের মানুষের চোখে চোখ রেখে ইন বলতে পারছেন না তারা যুদ্ধে হারেননি, বা যুদ্ধে জিতেছেন। এই যুদ্ধে ইরানের পেছনে চিন ও রাশিয়ার যে কৌশলগত অবস্থান তাতে স্পষ্ট হয়েছে আঞ্চলিক ভারসাম্যের এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে পশ্চিম এশিয়ায়। ফলে এই যুদ্ধের বিশাল মূল্য গুনতে হবে ইজরায়েলকে। ট্রাম্প তার সংসদে এবার আরও যুদ্ধের ক্ষমতা হারিয়েছেন। আমেরিকার সংবিধানের রীতিনীতি অনুসারে তার হাত থেকে ইরান যুদ্ধ প্রলম্বিত করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধে বড় ক্ষতির শিকার এখন উপসাগরে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলি। তারা এতদিন আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিশ্চিন্ত ছিল, এবার সেই ছাতা সহস্র ফুটো হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে এই দেশগুলি নিরাপত্তার স্বার্থে নয়া জোটের দিকে। তবে যে ক্ষতি নেতানিয়াহুর তার পরিমাপ কেবল যুদ্ধ পাকাপাকি বন্ধ হলেই নিরূপণ সম্ভব। সেই দিক থেকে এই যুদ্ধে লাভ কেবল পাকিস্তানেরই। অর্থনৈতিক, কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশটি এই সময়ে যুযুধান আমেরিকা ও ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার কাজটি করে পুরানো বন্ধু চিনের কাছে আরও বিশ্বাসনীয় প্রতিবেশী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশে এই বছরের শেষদিকে যে অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন হবে তাতে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বাড়তি অক্সিজেনের যোগান নিতে এসে হরমুজ প্রণালীতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তীব্র সমালোচনা এখন শুধু ডেমোক্রেটদের তরফেই নয়, চলছে নিজ দলের মধ্যেও। জর্জ ডব্লিউ বুশ যে রকম মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে আক্রমণ করেছিলেন, দাবি করা হয়েছিল যে সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, ট্রাম্পও তেমনি ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানে হামলা চালিয়েছেন। তবে তফাত খানিকটা আছে। বুশের কাছে গোয়েন্দা নথি এসেছিল তার নিজের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। ট্রাম্পের জন্য গোয়েন্দা তথ্য তৈরি করেছিল মোসাদ। মার্কিন গোয়েন্দা মহলের পরামর্শ উপেক্ষা করে মোসাদের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে ট্রাম্প এখন স্বখাত সলিলে।
নেতানিয়াহু ও মোসাদ ট্রাম্পকে বোঝান যে জানুয়ারির বিদ্রোহের পর তেহরানের সরকার এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়বে। আর মাত্র একটি শেষ ধাক্কাই যথেষ্ট। সাড়ে তিন মাস সময়ের পর ইরানে আজ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে, আর সবচেয়ে বড় পরাজিত নেতানিয়াহু। এ কারণেই তিনি মরিয়া হয়ে ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা সই করা থেকে বিরত রাখতে চান। আজ এটি স্পষ্ট, যুদ্ধ শেষ হলে এই দুই নেতার জন্যই চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের সময় আসবে। আর ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার হামলা ট্রাম্পের পক্ষে আর সম্ভব নয় নানা কারণে। দেশের জনমত এবং সংবিধান উপেক্ষা করে ট্রাম্প যদি তৃতীয়বারের মতো ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তবে নির্মমভাবে স্পষ্ট হবে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আর একটি যুদ্ধ হেরে গেছে। কারণ রণাঙ্গনে ইরানের হাতে অনেকগুলি তাস এখনো বাকি। হরমুজ প্রণালী ছাড়াও উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র টার্গেট তা যে ওই দেশগুলিতে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে, সেটি অন্তত ইরানের অজানা নয়। আরও কিছু তাস এখনো তারা ব্যবহারই করেনি, যেমন লোহিত সাগরের মুখে বাব এল- মানদেব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে ট্রাম্পের হাতে অব্যবহৃত তাস আর বাকি নেই। ইরান যুদ্ধের জয় পরাজয় স্পষ্ট দেখা গেলেও তার চূড়ান্ত পরিণতি অবধি অপেক্ষা করা দরকার। যুদ্ধ হারতে হারতে জিতে যাওয়া বা জিততে জিততে হেরে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। তবে এই যুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভূরাজনীতির বহু চমকপ্রদ পরিবর্তন দেখিয়ে চলেছে। দুই পরাশক্তি চিন এবং রাশিয়ার যে ছায়া ভূমিকা এই যুদ্ধে ইরানের পেছনে ছিল তার বার্তা একটাই, পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার প্রভুত্বের দিন শেষ। এরা নতুন করে আঞ্চলিক ভারসাম্যের কথা জানান দিয়েছে ওয়াশিংটন ও পশ্চিমী দুনিয়াকে। আরও একটি স্থানীয় জোট স্পষ্ট হতে শুরু করে যুদ্ধচলাকালীন সময় থেকেই। যখন প্রধান আরব শক্তিগুলো-সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বুঝতে পারে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে গড়ে তোলা মার্কিন সামরিক ছাতা তাদের আর রক্ষা করতে পারছে না- তারা ভিন্ন চিন্তা ভাবনা শুরু করে। যুদ্ধের উত্তাপে এক জোট হয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ওমান। ধারণা করা হচ্ছে, কুয়েত ধীরে ধীরে এই দিকেই ঝুঁকছে। এরা এখন গাজার গণহত্যা নিয়েও সরব। ইরানের বিজয়ের পর এরা আমেরিকা বান্ধব জোটভুক্তির কথা কেউ মুখ ভেঙে বলছে না। আবার ইজরায়েল ভীতিও তাদের কেটে গেছে। গাজা উপত্যকার অর্ধেক, দক্ষিণ লেবানন এবং পশ্চিম তীরের দুই-তৃতীয়াংশ স্থায়ীভাবে দখল করে রাখার ইজরায়েলি প্রচেষ্টার বিরোধিতা করছে প্রকাশ্যে। অর্থাৎ অখন্ড ইহুদি ভূমির রূপকার নেতানিয়াহুর স্বপ্ন বুঝি ভেঙেই যাচ্ছে ইরানের খোররাম শাহর আকাশবাতির তলে।