সাক্ষাৎকার : ‘বর্তমান সময়ের সমাজের একটা বড় অবক্ষয় সমকামিতা’
গণেশ দেবরায় তরুণ গল্পকারদের মধ্যে একজন। তার বেশ কিছু গল্পে সাম্প্রতিক সময়ের ছবি রয়েছে, যা আধুনিক সমাজ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, সমাজকে বার্তাও দেয়। গণেশ দেবরায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাসব মৈত্র।
১/ প্রথমেই জানতে চাইব,সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ কবে থেকে? কীভাবে এই আকর্ষণের সূচনা? পরিবার থেকে কতটা সমর্থন পান সাহিত্য চর্চার প্রতি?
সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ সেই ছোট্টবেলা থেকেই, যখন স্কুলে পড়তাম।
আসলে আমি ছোট বেলায় ভাবতাম কবিতা গল্প যেগুলো পড়ি আমরা সেগুলো ভগবানের সৃষ্টি। একদিন আমার প্রাইভেট টিউটর রতন আচার্য দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম— এগুলো কী ভাবে লেখা হয়েছে?
তখনই তিনি এই লেখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং বলেন ইচ্ছে করলে আমি লিখতে পারব। সেই থেকেই আমার চেষ্টা শুরু হয়। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই শুরু হয় লুকিয়ে লুকিয়ে লেখা। সপ্তম শ্রেণিতে উঠেই প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়— ‘ডেইলি দেশের কথা ‘পত্রিকার ‘শিশু মহলে’ । যা আমি এক বন্ধুর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে লুকিয়ে পাঠিয়েছিলাম। সেই দিনই প্রথম সবাই জানতে পারে আমি কবিতা লিখি। তা দেখে আমার টিউটর ভীষণ ভাবে আমাকে উৎসাহিত করেন। ঐ দিন থেকেই লেখার প্রেরণা পেয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখতে থাকি।
বাড়িতে সবাই ভীষণ ভাবে সহযোগিতা করে। আমার মা, বাবা, দাদা দিদিরা ভীষণ ভাবে উৎসাহিত করে আসছে প্রথম থেকেই। এখন আমার ভাইজি, ভাইপো, ভাগ্নি ভাগ্নে সবাই আমার লেখা নিয়ে গর্ব অনুভব করে। যা আমাকে লেখার অনুপ্রেরণা দেয় ভীষণ ভাবে। আর সবচেয়ে বেশি এখন সহযোগিতা করছে আমার স্ত্রী প্রতিমা (পূর্বা)দাস। আমার লেখার বর্তমান প্রথম পাঠক সে।
২/ আপনার বেশ কিছু গল্প— ‘বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, আবেগ’ গল্প বা ‘ফাঁদ’ গল্পে সমকামিতাকে আপনি জীবনের অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।সমাজকে সরাসরি কোনো বার্তা দিতে চাইছেন?
বর্তমান সময়ে সমাজের একটা বড় অবক্ষয় আমি মনে করি সমকামিতা। দিকে দিকে এর বিভৎসতার কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অনেক সংসার। বিঘ্নিত হচ্ছে জীবনের সুন্দর ধারা। এই ভুল পথ পরিত্যাগ করে সৃষ্টির প্রকৃত পথে ফিরে আসতে আজকের সমাজের কাছে আমার আবেদন থাকবে।
৩/ একজন গল্পকার হিসেবে,সমাজকে সাদা – কালো দেগে দেওয়া_ এতে কি গল্পের ক্ষতি হয়না? অন্তত গল্পের মধ্যে যে সত্য রয়েছে তার তো নানারকম স্তর ,আলো অন্ধকার রয়েছে; এই সাদা কালোতে দেগে দেওয়ায় জীবন ও সম্পর্কের প্রতি একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভার চাপিয়ে দেওয়া হয় না কি?
অবশ্যই ক্ষতি হয়। লেখক হতে হবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। যখন যেদিকে ইচ্ছে ডানা মেলে উড়ে যাবে। তাকে কোনো ভাবেই বেঁধে রাখা উচিত নয়। কারণ জোর করে কোনো নতুন লেখা আসে না। সেটা আসবে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। আর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে লেখাই হবে গ্রহণযোগ্য লেখা। সেইজন্য সমাজকেও সাদা কালোতে দেগে দেওয়া একদম উচিত নয়। কারণ তাতে করে সমাজে বেড়ে যায় হিংসা, হানাহানি। যার ফলে সামাজিক জীবনে নেমে আসে আঘাত। সমাজ হতে হবে সুন্দর ও সম্প্রীতির এক ঠিকানা। তাই মুক্ত থাকা দরকার সাদা কালোর দাগ থেকে।
৪/ ‘ আমি দ্রৌপদী নই ‘— এই গল্পেও দেখি, প্রভাত তার স্ত্রী সুরভিকে নিজের চাকরির জন্য তার বসের হাতে তুলে দিতে চায়।কিন্তু সুরভি তীব্র প্রতিবাদ করে। মদের ঘোরে কাজটা প্রভাত যে ঠিক করেনি,সেটা একসময় বুঝতে পারে। পরে এফ আই আর করতে যায়। এই যে সামগ্রিক প্লট এত বহু ক্লিশে, পুরোনো। এই সময়ের লেখক হিসেবে নতুন কী সংযোজন করা যেত বলে মনে করেন?
এখনো সমাজে এই ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে ঠিক উল্টোটাও। সুরভি নিজেই এই প্রলোভনে পা দিতে পারে বিশেষ করে স্ত্রীরা যেমন এখন পরকীয়ায় লিপ্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যেটা সমাজের আরো একটা বড় অবক্ষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সুযোগে সুরভি ও উচ্ছন্নে যেতে পারে, শুধুই টাকার লোভে আর প্রভাতের সাহায্যে।
৫/ ‘ গাজনের বাজনা বাজে ‘ গল্পে চরিত্রদের গাজনের সংস্কৃতির ওপর একটা তীব্র টান লক্ষ করা যায়। এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে রাধাকৃষ্ণের কথা,কীর্তনের কথা, মন্ত্রের বিভিন্ন শক্তির কথা। কতটা কাছ থেকে ত্রিপুরায় এই সংস্কৃতির বিবর্তন লক্ষ করেছেন?
খুব ছোট থেকেই দেখছি গাজনের সংস্কৃতি, যদিও এখন সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন গাজন আর আগের মতো নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাজগোজের যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি গান বাজনাতেও এসেছে নতুনের ছোঁয়া। বিশেষ করে আমাদের এখানে গাজনের অঙ্গ হিসেবে আগে আসত দিনের বেলা— হরগৌরীর নাচ। আর রাতে আসত শিব-কালী এবং রাধা-কৃষ্ণ। কিন্তু এখন দেখা যায় তার সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু সখিও। আবার আগে শুধুমাত্র পুরুষরাই গাজনে অংশ নিত, কিন্তু এখন সেখানে মেয়েরাও অংশ নিচ্ছে। চড়ক মেলাতেও এসেছে পরিবর্তন। কোথাও কোথাও সারা রাত ব্যাপী দুইদিন বা তিনদিন চলে মেলা এখন। অর্থাৎ গাজনের সংস্কৃতি এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তাই হারিয়েছে মূল সুর।
৬/ বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোত বলে কিছু হয় বলে মনে করেন?
বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোত অবশ্যই আছে। সেই স্রোত গ্রাম বাংলার নদী, মাঠ, ক্ষেত, ফসলের সঙ্গে যেমন মিশে আছে তেমনি মানবতাবাদ, ঈশ্বর ভক্তি বা বিভিন্ন লোকগাথাগুলো হল এর উৎস।
৭/ একজন উত্তর পূর্ব ভারতের লেখক হিসেবে ত্রিপুরার কবি সাহিত্যিকরা কি পশ্চিমবাংলায়, বিশেষত কলকাতায় উপেক্ষিত মনে হয়?
দূরত্ব এবং সঠিক যোগাযোগের কারণে কিছুটা তো অবশ্যই। তবে আমার মনে হয় ভালো লেখক বা গল্পকার অবশ্যই সব জায়গায় সমান ভাবে সমাদৃত। তাই সেই ভাবেই নিজেকে আগে তৈরি করতে হবে। তারপর সেই লেখা পৌঁছতে হবে সঠিক স্থানে। কারণ সঠিক স্থানে না পৌঁছলে তার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। সেই ক্ষেত্রে যোগাযোগে ঘাটতি তো রয়েছেই। কারণ আমাদের পাণ্ডুলিপিগুলো সঠিক স্থানে সব সময় পৌঁছতে পারে না।
৮/ আপনি গদ্য,গল্পের পাশাপাশি কবিতাও লেখেন।কবিতায় কতটা গল্প বলায় বিশ্বাসী?
আমি গল্প, কবিতার পাশাপাশি নাটক ও লিখি। ছোটদের এবং বড়দের অনেক নাটক ইতিমধ্যেই রাজ্যের এবং রাজ্যের বাইরে বহু পুরস্কারে ভূষিত ও সমাদৃত। এমনকি জাতীয় স্তরেও অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে।
আমি একটু অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলাম তার জন্য দুঃখিত। এবার আসি মূল প্রসঙ্গে – কবিতায় গল্প বলায় আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। তবে অবশ্যই বলার ধরন হতে হবে সম্পূর্ণ কাব্যিক।
উদাহরণ স্বরূপ আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাঁশী, ক্যামেলিয়া বলতে পারি। বলতে পারি সুবোধ সরকারের ঘুষ, বেলুড় ইত্যাদি কবিতাগুলো।
৯/ সমালোচনাকে কী ভাবে নেন? যদি বলা হয়, আপনার কবিতা গদ্যের তুলনায় সাদামাঠা হয়ে যাচ্ছে।কী বলবেন?
সমালোচিত না হলে কেউ সমৃদ্ধ হতে পারে না, এটা আমার বিশ্বাস। তবে অবশ্যই সমালোচকের এবিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে এবং আলোচনা গঠনমূলক হতে হবে। কবিতা গদ্যের তুলনায় সাদামাঠা হয়ে যাচ্ছে, ঠিক মানতে পারছি না। আসলে কবিতা লেখে তো প্রচুর কবি, যার সংখ্যা অগণিত। কিন্তু কবিতা তৈরি হচ্ছে কয়টা! সেটা হলো বড় প্রশ্ন। যদি কবিতা একেবারেই সাদামাঠা হয় তবে শ্রীজাতকে আদালতে যেতে হবে কেন? তসলিমাকে দেশ ছাড়াতে হবে কেন? প্রকৃত কবিতার মতোই হতে হবে কবিতা তবেই আসল রস থাকবে তাতে।
১০/ সাম্প্রতিক সময়ের প্রিয় কয়েকজন ত্রিপুরার কবি,গল্পকারের নাম করতে বললে কার কার নাম বলবেন?
অবশ্যই গল্পকার হিসাবে ছিলেন আমার ভীষণ প্রিয় প্রদীপ সরকার। তার লেখায় আমি বাস্তবতা খুঁজে পেতাম। ইদানীংকালে শ্যামল বৈদ্যের লেখা বেশ মুগ্ধ করছে। কবি হিসাবে ত্রিপুরার বেশ কয়েকজনের কবির কবিতা আমার বেশ ভালো লাগে। সেই তালিকায় আছেন— কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, চিরশ্রী দেবনাথ, দিলীপ দাস ইত্যাদি।
১১/ সাধারণত কখন লেখেন? একটা কবিতা,বা গল্প সম্পূর্ণ করতে গেলে কটা ড্রাফট করতে হয়?
আমার লেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান নেই। কারণ আমি মোবাইলের নোট প্যাডেই লিখি, তাই যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে সুযোগ পেলেই লিখতে থাকি। সেটা ট্রেন যাত্রা হোক বা ঘরে বা স্টলে বসেও লিখি।
সেটা কোনো নির্দিষ্ট থাকে না। একটু বড় গল্প হলে কয়েকটা ড্রাফট করতে হয়। ছোট হলে দুই একটাতেই হয়ে যায়।
১২/ গত ১ মাসে কী কী বই পড়েছেন? সব থেকে ভালো কোন বইটা লাগলো? কেন?
গত একমাসে আমি বেশ কিছু ম্যাগাজিন পড়েছিলাম। কারণ ওগুলো পড়ে আছে পড়া হচ্ছিল না, তাই পড়ে নিলাম। সেখানে বেশ কিছু গল্প কবিতা ভালো লেগেছে। সেই সঙ্গে শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দের শ্রী রামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গের দ্বিতীয় খণ্ড পড়ছি। বইটা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে লেখা। যা সত্যিই মুগ্ধ করেছে আমাকে। সেখানে এত সুন্দর শব্দ চয়ন, ব্যাখ্যা এবং ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে যা অনবদ্য।
১৩/ লেখার ভেতর রাজনীতিকে আনতে চান? বা এনেছেন আগে? সরাসরি ভাবে?
একবাক্যে না। কখনো আনিনি বা আনতে চাইও না।
১৪/ আগামী দিনে লেখক হিসেবে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
প্রত্যেক পিতা মাতা চায় তার সন্তান সবার শীর্ষে পৌঁছে যাক। আমাদের সৃষ্টি আমাদের এক একটি সন্তান। তাই আমিও সেটাই প্রত্যাশা করি। তবে এটা সম্ভব যদি মানুষ আমার লেখা পড়ে মজা পায়। তাই প্রথমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছতে চাই এটাই প্রথম লক্ষ্য।