বুধবার | ১৩ মে ২০২৬

২৩৬ কোটির মেগা প্রকল্প অনুমোদন,কুইন চইন আনারসে বিশ্বজয়ে বড় বাজি রাজ্যের!!

 ২৩৬ কোটির মেগা প্রকল্প অনুমোদন,কুইন চইন আনারসে বিশ্বজয়ে বড় বাজি রাজ্যের!!

দৈনিক সংবাদ অনলাইন প্রতিনিধ :-রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী কুইন আনারসকে কেন্দ্র করে এবার আরও বড় আকারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক চাষপদ্ধতি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং, বিপণন ও রপ্তানিকে একসূত্রে বেঁধে প্রায় ২৩৬ কোটি টাকার একটি সমন্বিত মিশন মোড প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন (ডিপিআর) ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রকে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনও মিলেছে। শীঘ্রই এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

রাজ্য সরকারের লক্ষ্য, জিআই স্বীকৃত কুইন আনারসকে আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি আনারসকে ঘিরে একটি
পূর্ণাঙ্গ কৃষি-শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি
গড়ে তোলা। প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উপজাতি অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চলে কুইন আনারস চাষ সম্প্রসারণের ওপর।

কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী রতন লাল নাথ জানিয়েছেন, রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী
রসালো ফসল কুইন আনারসের বাণিজ্যিক চাষ, বাজারজাত ও রপ্তানির জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজ্যের বহু কৃষক, বিশেষ করে উপজাতি অংশের কৃষক লাভবান হবেন। এছাড়া বাজারজাত ও রপ্তানির কাজে বহু শিক্ষিত যুবক যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং উদ্যান দপ্তরের অধিকর্তা ড. ফণিভূষণ জমাতিয়া জানিয়েছেন, মিশন মোডে বাস্তবায়িত হবে এই প্রকল্প। একজন মিশন অধিকর্তার তত্ত্বাবধানে কাজ হবে। সর্বোপরি কৃষি ও উদ্যান দপ্তর-সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি নিয়মিত পর্যালোচনা করবে।

উদ্যান দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ত্রিপুরায় বর্তমানে মূলত দুটি জাতের আনারস চাষ হয় ‘কুইন’ এবং ‘কিউ’। এর মধ্যে কুইন জাতটি তার সুগন্ধ, মিষ্টতা, আকর্ষণীয় রং ও উচ্চ গুণমানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষভাবে সমাদৃত। ইতিমধ্যেই এই জাতের আনারস জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনস বা জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও শুরু হয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ১২ হাজার ৯৭ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৬২৮ হেক্টরে কুইন আনারস এবং প্রায় ৮ হাজার ৪৬৯ হেক্টরে কিউ জাতের আনারস উৎপাদিত হচ্ছে। মোট উৎপাদন প্রায় ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮৬৩ মেট্রিক টন। কুইন আনারসের গড় উৎপাদনশীলতা প্রতি হেক্টরে প্রায় ১২.২২ মেট্রিক টন এবং কিউ জাতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৫.৭২ মেট্রিক টন।

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে সিপাহীজলা, গোমতী ও খোয়াই জেলার আটটি ব্লকের ৮১টি এডিসি ভিলেজকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ব্লকগুলির মধ্যে রয়েছে জম্পুইজলা, মোহনভোগ, বক্সনগর, কাঠালিয়া, কিল্লা, পদ্মবিল, মুঙ্গিয়াকামি ও তুলাশিখর। এই অঞ্চলগুলিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৯৯ হেক্টর জমিতে কুইন আনারস চাষ হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর এলাকা আনারস চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরবর্তী পর্যায়ে ধলাই ও ঊনকোটি জেলার মনু, গন্ডাছড়া, দুর্গা চৌমুহনী, কুমারঘাট, চণ্ডীপুর ও গৌরনগর ব্লকেও কুইন আনারস চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলকে ভবিষ্যতে বৃহৎ আনারস উৎপাদন জোন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘ফার্ম টু ফরেন মার্কেট’ মডেল। অর্থাৎ চারা উৎপাদন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত চক্রের আওতায় আনা হচ্ছে। এজন্য উৎপাদন ও চাষাবাদ, ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্র্যান্ডিং ও বাজার উন্নয়ন – এই তিনটি প্রধান বিভাগে মোট ২৫টি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রথম বিভাগে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আনারস সেল গঠন, এলাকা সম্প্রসারণ, উন্নত চারা সরবরাহ, জৈব সার ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও আধুনিক চাষপদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় বিভাগে প্রায় ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেল, বহু বছর ধরে কার্যত অচল নালকাটা প্রসেসিং ইউনিটের পুনরুজ্জীবন, আগরতলায় নতুন ইউনিট স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের জিএমপি ও এইচএসিসিপি ব্যবস্থা, জৈব সার্টিফিকেশন, রোমেলিন ও পিএএলএফ শিল্প গড়ে তোলা এবং উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে আনারস গাছের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশ, বিশেষ করে পাতা, খোসা ও ডাঁটা কার্যত ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এই অংশ থেকেই পিএএলএফ বা আনারস পাতার ফাইবার, জৈব-এনজাইম, জৈব সার ও বিভিন্ন শিল্পজাত পণ্য তৈরি সম্ভব। প্রকল্পে এই জৈব-অর্থনীতি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত কাঁচামাল ছাড়াই কয়েক কোটি টাকার মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তৃতীয় বিভাগে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্র্যান্ডিং ও বাজার সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে। বাজার সমীক্ষা, রপ্তানি সংযোগ, ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলন, আনারস উৎসব, জিআই কর্মশালা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন পরিকল্পনাও এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পের অর্থায়নে কেন্দ্র ও রাজ্যের একাধিক দপ্তরকে যুক্ত করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রক, কৃষি মন্ত্রক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রক, এপিডা, জিআই ও রপ্তানি সংস্থা, নাবার্ড, রাজ্য পরিকল্পনা দপ্তর এবং বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই প্রকল্পে অর্থ জোগানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যেই ‘ত্রিপুরা কুইন পাইনঅ্যাপেল মিশন’-এর আনুষ্ঠানিক সূচনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রাজ্যে পৃথক সেল গঠন, লোগো, প্রচারচিত্র ও পূর্ণাঙ্গ মিশন ডকুমেন্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শীঘ্রই এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। উদ্যান বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কুইন আনারসকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরায় নতুন কৃষি-শিল্প অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, উপজাতি এলাকার আর্থিক উন্নয়ন, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ত্রিপুরার পরিচিতি- সবদিক থেকেই এই প্রকল্প আগামী দিনে রাজ্যের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *