সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬

ঘা মেরে চেতনাকে জাগিয়ে তোলার নিদর্শন বাকি ইতিহাস

 ঘা মেরে চেতনাকে জাগিয়ে তোলার নিদর্শন বাকি ইতিহাস

পরিবেশনায় রূপম নাট্যসংস্থা

সান্নিধ্য দাশ

বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে “বাকি ইতিহাস” নাটকের এক অনবদ্য প্রদর্শন করল রূপম নাট্যসংস্থা। কিংবদন্তি নাট্যকার বাদল সরকারকে উদযাপন করার জন্য “বাকি ইতিহাস” অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কী করে রূপম নাট্যদল অত্যন্ত সেনসিটিভ কিছু বিষয়কে নবকলেবরে মঞ্চে জাগিয়ে তুলল, তার বিশ্লেষণ করা যাক।
মানুষের চেতনা তার অনুভবের প্রতিবিম্ব। মানুষের অনুভব তার সংস্কার দ্বারা সজ্জিত। দশটা মানুষ যেভাবে ভাবে, যা কল্পনা করে এবং যে সংস্কারের মাধ্যমে সেই কল্পনাকে বাস্তবায়িত করে, তার থেকেই সামাজিক চেতনা নির্ধারিত হয়। এক-একটি সামাজিক পরিকাঠামোর নিজস্ব চেতনা, অনুভব এবং সংস্কার রয়েছে। এই পরিকাঠামোগুলো যতক্ষণ গোষ্ঠীবাদের রূপ ধারণ করে উঠতে পারে না, ততক্ষণ সেই গোষ্ঠীর মধ্যে থাকা মানুষও সুরক্ষিত অনুভব করে না। ক্লাসিক্যাল ফিলোসফারবৃন্দেরা, যেমন বুদ্ধ, প্ল্যাটো বা সক্রেটিস, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে মোক্ষলাভের পথ পেয়েছেন। অসাধারণ সামান্যতায় জীবন কাটানো কিছু সোশিওপ্যাথিক মাথারা একটু “অন্যভাবে” তাদের মোক্ষলাভ নির্ধারণ করেন। এখানে সোশিওপ্যাথিক শব্দটা বর্ণনামূলক; নিন্দার্থে ব্যবহৃত নয়।
শরদিন্দু ও বাসন্তী কনটেম্পোরারি প্রেক্ষাপটে শিবশক্তির মতো দ্বন্দ্ব করছেন। বাদল সরকার শরদিন্দুর আঙ্গিককেই বেশি প্রাধান্য দেন। ঠিক যেভাবে শরদিন্দু সীতানাথের দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি হাইলাইট করেন। এখানে উল্লেখ্য, শরদিন্দু বা বাসন্তী, কেউই অসাধারণ ব্যাপ্তিসম্পন্ন লেখক নন। তারা নিজেদের অনুভূতির অন্তর্জালে আবদ্ধ থেকেই খণ্ড-গল্প রচনা করেছেন এক কাল্পনিক সীতানাথের মৃত্যুকে ঘিরে। সীতানাথের মৃত্যু হওয়ার আগে তার বিবাহ, বিবেক, বন্ধুত্ব ও বোধের মৃত্যু হতে দেখি আমরা মঞ্চে—দুটি গল্পেই। আত্মহনন; সামাজিক ও ব্যক্তিস্তরে; দুটো নিয়েই কিছু মনোলোগ পরিবেশিত হয়। সবটাই খুব থমথমে।
এখানে অভিনয়, পরিচালনা, আবহ, আলো, শব্দ, মঞ্চ-পরিকল্পনা ও সম্পাদনা সব সমানতালে কাজ করেছে। কুমার শংকর পাল এই সমসাময়িক বাস্তবতাকে অনুধাবন করে কিছু ক্রিয়েটিভ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা চমৎকারভাবে কাজ করেছে একসঙ্গে। যেমন: নাটকের দৈর্ঘ্য প্রশমন, রূপসজ্জার সিদ্ধান্ত ও “প্রপের প্রতিবিম্বতা”। এখানে সুরজিৎ রায়ের বিরামহীন মঞ্চসজ্জার প্রদর্শন সত্যিই উল্লেখ্য। ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে স্টেজের প্রপ পরিবর্তন হয়েছে। এবং পরিবর্তনগুলো খুব সাবটল। গল্পের চরিত্র এবং তার ভেতরের চরিত্রগুলোর মৌলিক একীকরণের সঙ্গে খাপ খেয়েছে পুরো বিষয়টা। সম্পাদনায় সোনালী রায় বাগচীর কাজও উল্লেখ্য। আলোয় প্রভিতাংশু দাশ অনবদ্য কাজ করেছেন। ভারী সাবজেক্ট-ম্যাটারের নাটকগুলিতে প্রায়ই আলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার চোখ ধাঁধিয়ে গল্পের বিষয়বস্তু থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এখানে দক্ষতার সঙ্গে প্রভিতাংশুবাবু আলোর সঙ্গে গল্পের ছন্দকে ব্যালান্স করেছেন। আবহে সৌম্যেন্দ্র নন্দীর কাজও অতুলনীয়। রূপা নন্দীর কাজের কথা বলাই বাহুল্য।
মানুষের পাশবিকতা থেকে উত্তরণের আশা জাগানো কাহিনি “বাকি ইতিহাস” আত্মহত্যার বিষয়কে হাইলাইট করে আমাদের নিস্তেজ অস্তিত্বগুলোকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে অনুসন্ধিৎসু চিন্তার বীজ বপন করে দিতে উদ্যোগ যোগায়। কিন্তু এই বার্তা অনুধাবন করা একটু শক্ত। কারণ কাহিনির প্রতিটি পাতায় পাতায় মানুষ হওয়ার লিমিটেশনগুলোকে ক্রিটিক করা হয়। সীমিত গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের সীমাবদ্ধতার পোস্টমর্টেম করে এই কাহিনি। অভিনেতাদ্বয় জয় দত্ত ও কুমার শংকর পাল এই দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ করেন নিজেদের আত্মহত্যার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গা ছমছমে পরিবেশনা এবং আবহের অস্বস্তিকর দাবদাহে দর্শকদের কমফোর্ট জোন থেকে জোর করে টেনে বের করেছেন এরা। আবার এই উত্তাপকে ব্যালান্স করতে নারীমনের খুঁটিনাটি নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজের প্রদর্শন পাই অভিনেত্রী অনিন্দিতা সেন এবং সোনালী রায় বাগচীর পরিবেশনায়। “কণা আসলে কাউকেই ভালোবাসেনি।” খুব অবলীলায় এক নারীচরিত্রের ব্যাপারে আরেক নারী চরিত্রের ভাষ্য শুনতে পাই। এগুলো হয়তো উত্তেজনাময় সংলাপ নয়, কিন্তু একইরকমভাবে হাড় হিম করে দেয়।
সহঅভিনেতাদের কাজও উল্লেখ্য। অনেকেই অভিনয়ের পাশাপাশি প্রোডাকশনের বিভিন্ন আঙ্গিক ম্যানেজ করেছেন। সঞ্জয় দেবনাথ, অরবিন্দ কুমার ভট্টাচার্য, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য ও দিবাকর চক্রবর্তী সকলেই অসাধারণ কাজ করেছেন। বৃদ্ধের চরিত্রে তাকে লাগিয়েছেন সুরজিৎ রায়।
যারা উগ্র মেটাফোরের মাধ্যমে গতানুগতিক চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করতে ভালোবাসেন, তারা এই নাটক আবার মঞ্চস্থ হলে অবশ্যই দেখবেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রকৃত প্রাসঙ্গিক কাহিনি ও তার পরিবেশনার মরীচিকায় বেঁচে আছি আমরা। আমাদের আধমরা মনগুলোয় একটু ঘা না পড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কুলোবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *