শনিবার | ১৮ এপ্রিল ২০২৬

পুস্তক পর্যালোচনা : ভুবন ডাঙা : একটি সম্ভাবনাময় সৃষ্টির ক্ষুদ্র পদক্ষেপ

 পুস্তক পর্যালোচনা : ভুবন ডাঙা : একটি সম্ভাবনাময় সৃষ্টির ক্ষুদ্র পদক্ষেপ


(লিটল ম্যাগ/শারদ সংখ্যা পর্যালোচনা)

সুদীপ পাল
সাংস্কৃতিক বিপন্নতায় আজ খোয়াই। শারদ আবহে অনুপস্থিত মননের সেই নান্দনিক চর্চা। দিনগত পাপ ক্ষয়, যেন টেনেটুনে সাহিত্যচর্চাকে একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। সর্বত্রই আজ পাবলিসিটির স্টান্টবাজি। খোয়াইতে এই ব্যাধি মারাত্মক। লেখা নয়, মুখ দেখানোই আসল উদ্দেশ্য। তাই মুখ ঢেকে যায় লেখার জঞ্জালে।
খোয়াই জেলা গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক জহরলাল দাসের সম্পাদনায় এবছর প্রকাশিত হয় শারদীয় ভুবন ডাঙা। ছোট কলেবর, ক্ষীণ শরীর, কিন্তু দামে ভারী। ৪০-৫০ পৃষ্ঠার বই ১৫০ টাকা। এখানেও কমার্শিয়াল স্টান্টবাজি। মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত ম্যাগের খরচাপাতির হিসাবে। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে পাঠক কেন অনর্থক একটা বোঝা নেবেন মাথায়? যদিও ছোট কলেবর, কিন্তু বেশ সাজানো-গোছানো একখানি সাহিত্যপত্র। ঝকঝকে ছাপা, ভালো কাগজ, মুদ্রণপ্রমাদ-মুক্ত লিটল ম্যাগাজিনটি তবুও কি প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়েছে? সেটা বিচার করতে হলে প্রকাশিত লেখাগুলির উপর ফোকাস করতে হবে।
গল্প বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলি পাঠক-প্রত্যাশা পূরণে কতখানি সক্ষম হল, এ প্রশ্ন থেকেই যায় মনে। একটা ভালো গল্পের খরা কাটিয়ে কবে দাঁড়াতে পারব, আমরা—সময়ই বলতে পারবে। গল্পের প্লট নির্বাচন, কাহিনি, ঘটনাপ্রবাহ, কল্পনা ও অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রক্ষায় কবে আমাদের এইসব নিস্প্রাণ লেখায় “প্রাণপ্রতিষ্ঠা” হবে?
ভুবন ডাঙার প্রথম গল্পটি শিবজ্যোতি দত্তের লেখা “প্ল্যাটফর্ম”। গল্পের প্রধান চরিত্র মৃণালিনীর জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক বিস্তৃত হওয়া দরকার ছিল। গল্পটি আরও পরিসর দাবি করে। মৃণালিনীর নীল নোটবুক হঠাৎ একদিন অরূপের হস্তগত হয়ে যায়, আর অরূপ সঙ্গে সঙ্গেই লেখক হয়ে ওঠে—কাহিনিটি অবাস্তব ঠেকেছে।
মিতা রায়ের আত্মজয়ের আর্তনাদে বর্ণাত্মক কাহিনি আছে, কিন্তু গল্প নেই। পুরোটা লেখায় ভাষার একটা কাব্যিক সৌন্দর্য চোখে পড়বে অবশ্যই। কিন্তু গল্প কোথায়? “শহরের প্রান্তদেশে অবস্থিত এক নির্জন বস্তির কুঁড়েঘরে জন্ম হয়েছিল লাবনীর”। কিন্তু লাবনীর লাবনী হয়ে ওঠার স্ট্রাগলটি কোথায় দেখানো হল? বরং গল্পকার একের পর এক লাবনীর সাফল্যগাঁথার বৃত্তান্ত গেয়ে গেছেন নিজের মতো।
মেঘালয়ের নর্থ গারো হিলসের পটভূমিতে লেখা প্রণব চৌধুরীর গল্প “বাঁধন ছিঁড়ে”। কিছুটা অসমবয়সি দুই নর-নারীর প্রেমের গল্পটিও আরও পরিসর দাবি করে। সামান্য চেনাজানায় এক ঝড়বৃষ্টির রাতে এক গারো মহিলা মলিনা সাংমা, আগন্তুক এক বাঙালি যুবককে অতি সহজেই ঘরে আশ্রয় দিয়েছে, যা বাস্তবতার প্রবাহে তাল কেটেছে। “প্রায় দিনই রাত কাটাই ওর ঘরে”—এর ঠিক পরেই “হৃদয়ের সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই ছিল না ওর সঙ্গে”—এই সাফাই গল্পের নিরিখে অসত্য ঠেকেছে। প্রেম তো দেহবর্জিত নয়, তবে কেন এই ছুঁতমার্গ? এ তো আত্মপ্রবঞ্চনা!
একটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্প জহরলাল দাসের “চক্রান্তের ফাঁসে”। নায়ক কমলেশ, গল্পের খলচরিত্র সুবর্ণের চক্রান্তের শিকার হয় এবং এক অভাবনীয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে শারীরিক হেনস্থা ও সামাজিকভাবে অপমানিত হতে হয়। গল্পটিকে দাঁড় করাতে গল্পকারের চেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু ঠিক জমাট হলো না গল্পটি।
কবিতা বিভাগটিই এই লিটল ম্যাগাজিনের মুখ রক্ষা করেছে। শুধু কবিতার নিরিখে বিচার করলে, খোয়াই থেকে যতগুলি শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, ভুবন ডাঙাকে সবার থেকে এগিয়ে রাখতে হবে।
অপাংশু দেবনাথের “ফেরারি মন” আত্মসন্ধানের কবিতা। এই আত্মানুসন্ধান কেমন? এই আত্মানুসন্ধান এক পূর্ণ সত্যের দিকে যাত্রা করে। “যাবতীয় অর্ধসত্য উপলব্ধির কথা জেনেও/পূর্ণসত্যের দিকে হেঁটে যাবে এ ফেরারিমন”।
কবি পৃথ্বীশ দত্তের “বিজয় বিলাস” কবিতাটি এই ম্যাগাজিনের একটি উজ্জ্বলতম কবিতা। “যতই মেরেছো আমারে/আমি তবু চলে গেছি মৃত্যু থেকে বহু দূরে”। এ যে মৃত্যুকে অতিক্রম করা। পরের পঙ্‌ক্তিগুলি—”যারে তুমি বারবার করেছো কঠোর আঘাত/সে আমার ছায়া/ছায়াযুদ্ধে বিজয় নিয়েছো তুমি”। কবিতাটির শেষ দুটি লাইন দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না—”অমরত্ব পেতে হলে/গরল গিলে খাওয়ার উদারতা থাকা চাই”। এ যে কণ্ঠে বিষ নিয়েও হৃদয়ে উদারতা ধারণ করা, আর এখানেই সেই অমরত্ব।
এছাড়াও যাদের কবিতায় ভুবন ডাঙা সমৃদ্ধ হয়েছে, সেসব কবিতাগুলি অবশ্যই পড়তে হবে, ভাবতে হবে। এই তালিকায় আছেন সংহিতা চৌধুরী, গোপেশ চক্রবর্তী, অমলকান্তি চন্দ, সুস্মিতা দেবনাথ, শঙ্কর সাহা, গোপা রায় এবং সুমিতা বর্ধন।
এই ম্যাগাজিনে সবে ধন মণি একটি প্রবন্ধই আছে। “আদর্শ ছেলে” কবিতার কবি কুসুমকুমারী দাশের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ড. নারায়ণ ভট্টাচার্য।
ভুবন ডাঙার প্রচ্ছদ সংগৃহীত। “সংগৃহীত” এই বানান-বিভ্রাটটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে প্রচ্ছদ করানো যায় কিনা, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।
প্রবঞ্চনামূলক প্রচারণা ও প্রচারে খোয়াইয়ের সাহিত্য-সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। তবুও খোয়াইয়ে নিদাঘপীড়িত সাহিত্যের শুষ্ক বাগানে হঠাৎ জলসিঞ্চনের মতো এই ক্ষুদ্রপ্রয়াসগুলি ব্যর্থ তো নয়ই, বরং একটি সম্ভাবনাময় সৃষ্টির ক্ষুদ্র পদক্ষেপ।
শারদীয় ভুবনডাঙা—১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ বর্ষ, ৯ম প্রকাশ
সম্পাদক: জহরলাল দাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *