হরমুজে অবরোধ!
হাতের নাগালে এসেও কি শেষপর্যন্ত ফসকে গেল শান্তি?ইরান আমেরিকার মধ্যে বহু চর্চিত শান্তি আলোচনা কোন ও সমাধান ছাড়াই ভেস্তে যেতে গোটা বিশ্বজুড়ে এই প্রশ্নই এখন সবথেকে বড় হয়ে উঠেছে।শুধু তাই নয়, শান্তি বৈঠক ভেস্তে যেতেই নতুন করে গোটা বিশ্বজুড়ে আরও ভয়ানক সংকটের আশংকা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দীর্ঘ একুশ ঘন্টা ইসলামাবাদে কাটিয়ে কোনও সমাধান ছাড়াই ফিরে যাওয়ার কয়েকঘন্টার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। কেননা, শান্তির আশা জাগিয়েও তা কয়েক ঘন্টা স্থায়ী হতে না হতেই বুদবুদের মতো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে ফের ভয়ানক যুদ্ধের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে চলতি মাসের শুরুতে দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দিন কয়েক বাকি। শান্তি আলোচনা ভেস্তে যেতেই মার্কিন প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ভারতীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকেই তা কার্যকর হবে বলে মার্কিন সেনা বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। মোদ্দা কথা সোমবার সন্ধ্যা থেকেই হরমুজ প্রণালীতে ‘অবরোধ’ শুরু করবে আমেরিকা।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড সমাজমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, হরমুজে অবরোধ নিরপেক্ষভাবে সকল দেশের উপরেই প্রয়োগ করা হবে। যে সমস্ত জাহাজ ইরানের কোনো না কোনো বন্দরে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে, সেগুলিকেই আটকানো হবে। আরব উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের ইরানি বন্দরগুলির ক্ষেত্রেও এই নির্দেশ প্রযোজ্য হবে। তবে ইরানের বন্দরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না-রেখে যে জাহাজগুলি হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করবে, তাদের বাধা দেবে না মার্কিন সেনা। তাদের জলপথে যাতায়াতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হবে না। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, অবরোধ শুরুর আগে আনুষ্ঠানিক একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নাবিকদের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে দেওয়া হবে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানকে শুল্ক দিয়ে যে সমস্ত দেশ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে তিনি পদক্ষেপ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই অবরোধ শুরু করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহণের জন্য ইরানকে শুল্ক দেওয়া ‘বেআইনি’ বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকা-ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরুর পর হরমুজের জলে যে মাইন পেতেছিল ইরানের সেনা, সেগুলিও ধ্বংস করার কাজ আমেরিকা শুরু করবে। ট্রাম্পের কথায়, “যারা বেআইনি শুল্ক দেয়, তাদের কেউ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে না। আর আমাদের উপর ইরান থেকে কেউ যদি কোনও হামলা করে বা গুলী চালায়, শান্তিপূর্ণ ভাবে যাতায়াতকারী কোনও জাহাজের উপর যদি হামলা হয়, আমরা তাদের নরকে পাঠাব।”
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পাল্টা দিয়েছে ইরানের রেভেলিউশনারি গার্ড বাহিনী। বলা হয়েছে, হরমুজের দিকে কোনও সামরিক জাহাজ যদি এগিয়ে আসে, তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসাবে ধরা হবে এবং কঠোর ভাবে তার জবাব দেওয়া হবে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফ আমেরিকার উদ্দেশে বলেছেন, “তোমরা যদি যুদ্ধ করো, আমরাও করব। তোমরা যদি যুক্তি নিয়ে এগিয়ে আসো, আমরাও যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করব।” স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
এদিকে, ইরান দাবি করেছে,”আমেরিকা যুদ্ধে যা জিততে পারেনি, আলোচনার টেবিলে বসে তা ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল।” তেহরানের দাবি, তারা যথেষ্ট সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় এলেও আমেরিকার অনড় মনোভাবই সব শেষ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্বে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার। আলোচনার শুরুতে তা কমে ৯৫ ডলারে নামলেও, সোমবার ফের ১০২ ডলারে পৌঁছে গেছে। শুধু তাই নয়, হুমকি পাল্টা হুমকিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সমস্ত জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানোর বদলে সংঘাতের ছায়া আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অন্যদিকে খবরে প্রকাশ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরোধ করার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে সরাসরি অসম্মতি জানিয়েছে ব্রিটেন। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের এমন অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল। কেন বেঁকে বসল ব্রিটেন? কারণ, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ সম্পন্ন হয়। ব্রিটেন মনে করছে, এই পথটি অবরোধ করলে বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ফলে আমেরিকার এই সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সরাসরি মানা করে দিয়েছে ব্রিটেন। তারা বরং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সাথে মিলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, যদি আমেরিকা একতরফাভাবে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ তৈরি করে, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এনিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এর প্রভাব পড়বে ভারতেও।শেষ পর্যন্ত কি হয় এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।