বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬

আশা আমাদের এক ও একমাত্র রকস্টার

 আশা আমাদের এক ও একমাত্র রকস্টার

সুদর্শনা চক্রবর্তী

আশির দশকের শেষাশেষি, একেবারেই বালিকা এক মেয়ে। তাঁদের মধ্যবিত্ত বাড়ি। সেই বাড়িতে মধ্যবিত্ত সংসারের টুকিটাকি। একটা রেডিও, একটা রেকর্ড প্লেয়ার। রাত্রিবেলা সেই সব লোডশেডিং-এর সন্ধ্যা-রাতে রেডিও চালালে শোনা যেত, “আপ সুন রহে হ্যায় বিবিধ ভারতী”…। আর তারপর কোনো এক আশ্চর্য দেশ থেকে ভেসে আসত অদ্ভূত সব সুর। বালিকা কেমন যেন বেভুল হয়ে যেত। তারপর সে একদিন শুনে ফেলল সেই এক গান, “রাত বাকি, বাত বাকি/হোনা হ্যায় যো/হো জানে দো”। কী ছিল সেই কণ্ঠে? সেই বালিকা জানত না, জানে না এই মাঝবয়সে পৌঁছে যাওয়া নারী। শুধু জানে, ঠিক যেমনভাবে রাত্রি তার রহস্য নিয়ে অপেক্ষায় থাকে জেগে কিংবা ঘুমিয়ে, তেমনিভাবে সেই জাদুকণ্ঠ সারা জীবনের জন্য তার মাথার ভেতর রিনরিন করে বাজতে থাকবে। সেই লো ভোল্টেজ হলুদ বাল্ব-এর আলো, সেইসব আলো নেভা রাত, নিশ্চিন্ত জীবন আর সেখানেই যেন কোনো এক অচেনা, অজানা দুনিয়ায় হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো, নেশাতুর করে তোলার মতো এক কণ্ঠ।
বালিকা কিশোরী হয়, গান তার বড় প্রিয়। সেই কণ্ঠে সে আরও গান শুনতে থাকে। অবাক হয়ে ভাবে, গায়িকা ম্যাজিক জানেন। কী করে পারেন গলা দিয়ে এমন এক পৃথিবীতে নিয়ে যেতে, যেখানে সুরের খেলায় মনে হয়, যেন যাবতীয় আবেগ মস্তিষ্ক থেকে হৃদয়— সব কিছু দখল করে নিতে পারে! কী করে যিনি “জাওয়ানি জানে মন” গানে অমন করে “না জানু ম্যায়, না জানে উও”-র পরে “ওহো” বলে শিহরণ তুলতে পারেন, তিনিই অমন মিষ্টি করে গাইতে পারেন, “ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে” আর সেখানে “সয় না সয় না সয় না ওগো/সয় না এত জ্বালা সয় না/ঘরেতে আমার এ মন রয় না কেন রয় না রয় না” গাইবার সময় ওই দুষ্টুমি-ভরা বিরহী শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন—তা ভেবে সেই কিশোরী মেয়ে পড়ত অকূল পাথারে। বিস্ময় কাটত না। যা এখনও কাটেনি।
আশা ভোঁসলে – শুধু গায়িকা নন, তিনি যেন সুরকে স্পর্শ করতে পারা। আশা সেই গায়িকা, যাঁর গানকে চোখে দেখা যেত। কিন্তু যা দেখা যেত না, যাবে না কোনোদিন, তা তাঁর নিজস্ব ম্যাজিকের পৃথিবী। আশা সেই গায়িকা, যিনি গানের কথা আর সুরের সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেন বাস্তব থেকে দূরে, বা বাস্তবের মধ্যেই ঘুরতে থাকা স্বপ্নে, না কি স্বপ্নের ঘোরে লুকোনো বাস্তবে!
আশা শুধু গান গাইতেন না। সুন্দর করে গান গাইতে তো তাঁর আগে, তাঁর সম সময়ে, তাঁর পরবর্তী সময়ে অনেক দক্ষ গায়িকাই পেরেছেন। আশা সেই গানের চরিত্র, সেই গানের গল্প হয়ে উঠতে পারতেন। সেই কারণেই মধুবালা থেকে কাজল, আশা পারেখ থেকে উর্মিলা মাতোন্ডকর, ওয়াহিদা রহমান থেকে টাবু, রেখা, পারভিন বাবি, জিনাত আমন থেকে প্রীতি জিন্টা—এই প্রত্যেক অভিনেত্রীর যে স্বকীয় শৈলী ছিল, তাই অননুকরণীয়ভাবে স্টাইলাইজড হয়ে উঠত আশা ভোঁসলের গানে। সেই বালিকা-কিশোরী ততদিনে মেয়ে। বহুদিন পর্যন্ত মেয়েটি ভাবত, কোনো দূর দেশের বাসিন্দা এইসব নায়িকাদের জন্য গান করেন যিনি, তিনিও কোনো স্টাইল ডিভা।
যখন প্রথম আশা ভোঁসলেকে দেখল, সে ভেবেছিল, এত সাধারণ কেউ এমন অসাধারণ, দুঃসাহসিক সব গান গাইতে পারেন! ততদিনে সে শুনে ফেলেছে “পিয়া তু আব তো আ যা” এবং হেলেন নামক আরেক জাদুকরী আর আশার অপ্রতিরোধ্য যুগলবন্দী যে কী মারাত্মক হতে পারে, তা সে জেনে গেছে। জেনে গেছে ক্যাবারে নামক দুর্ধর্ষ ফর্মের একামেবাদ্বিতীয়ম ‘কুইন’ হওয়ার পাশাপাশি তিনি স্তব্ধ হয়ে শোনার মতো গজল গাইতেও একই রকম পারদর্শী। রেখা যখন গাইছেন “…এক তুম হি নহি তনহা/উলফত মে মেরে রুসওয়া/ইস শহর মে তুম জ্যায়সে/দিওয়ানে হাজারো হ্যায়”, তখন মনে হয় ভালোবাসার মানুষী রূপ উমরাও-এর কণ্ঠের যে বিষণ্ণ আকর্ষণ, তা এমন করে আর কে-ই বা উচ্চারণ করতে পারতেন। গজলের প্রতি যে অনুরাগ তৈরি হয় এরপর, যা আজীবন রয়ে যাওয়ার, বলার অপেক্ষা রাখে না, তার জন্য এই আশা ভোঁসলে নামক নারীই দায়ী থাকবেন।
গানের সুরের সঙ্গেই স্মৃতি এগিয়ে, পিছিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। সেই মধ্যবিত্ত বাড়িতে এল সাদা-কালো টিভি। প্রতিবেশীর বাড়িতে সবাই মিলে টিভি দেখার বদলে এখন টিভিতে সকলের পছন্দের নানা অনুষ্ঠান। রবিবার সকালে চাদর মুড়িয়ে শুয়ে মশারির আলো-ছায়া ভেদ করে দেখা এক অপার্থিব মুখ। সাদা-কালোয় তিনি যেন এক অপরূপ মায়া – ওয়াহিদা রহমান। গাইছেন, ‘ভঁওয়ারা বড়া নাদান, হায়/বাগিয়ান কা মেহমান, হায়”, সেই গানের দৃশ্যায়নে নায়িকা গানটি লিখছেন, ভেবে ভেবে। সেই যে মনে ভেবে একটা গান লেখার উচ্ছ্বাস, কী অবলীলায় ফোটাচ্ছেন আশা, আবার তিনিই কিঞ্চিৎ খুনসুঁটি, ব্যঙ্গ, ভাব-ভালোবাসা মিশিয়ে তিনি যখন ডিভা মধুবালার কণ্ঠে গাইছেন, “আচ্ছা জি ম্যায় হারি/চলো মান যাও না”, তখন কেমন যেন মনে হয় প্রেম বোধহয় এমনিই উচ্ছ্বাসের মতো। তখন কে-ই বা জানে, অনেক বছর পর কোনো এক তরুণী উদাসীন বিষাদে টানা শুনতে থাকবে, “এক সো সোলা চাঁদ কি রাতে/এক তুমহারে কাঁধে কা তিল/গিলি মেহেন্দি কি খুশবু/ঝুট-মুট কে শিকওয়ে কুছ/ঝুট-মুট কে ওয়াদে ভি সব ইয়াদ করা দো/সব ভিজওয়া দো/মেরা উয়ো সামান লওটা দো।”
বয়ঃসন্ধি। পর্দায় সমুদ্রের তীরে স্লো মোশনে দৌড়ে আসছেন উর্মিলা। জীবনের, যৌবনের, প্রেমের এর চেয়ে রোম্যান্টিক উদযাপন আর সে দেখেনি আগে। আর তাকে সম্পূর্ণতা দিচ্ছে যে কণ্ঠ—“তানহা তানহা ইয়াহাঁ পে জিনা ইয়ে কোই বাত হ্যায়/কোই সাথ নেহি তেরা ইয়াহাঁ তো ইয়ে কোই বাত হ্যায়/কিসি কো পেয়ার দে দে/কিসি কা পেয়ার লে লে/ইস সারে জমানে মে এহি প্যারি বাত হ্যায়।” লাস্য আর অপাপবিদ্ধতা একসঙ্গে আশার মতো করে এমন আর কে মেলাতে পেরেছেন! এবং ‘রঙ্গিলা রে!’ নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠতে থাকা আমাদের অ্যান্থেম। স্রেফ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এটা ভেবে যে ছোট্টবেলায় পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে যে কণ্ঠ আর সুর শুনে মনে হতো কোনো এক দূর গাঁয়ে এক মেয়ে চলেছে আর মাতাল করা কণ্ঠে আশা গাইছেন—“মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো/ও কনে দেখা মেঘে যে ওই/সোনা রং লেগেছে ওই/পালকিতে চলেছে কার বৌ গো”, তিনিই, হ্যাঁ তিনিই কলার তুলে গাইতে পারেন “চল মেরে সঙ্গ সঙ্গ, লে লে দুনিয়া কে রং/হো যা রঙ্গীলা রে”।
শাড়ি, খোঁপা বা স্টাইলিশ করে বাঁধা চুল, মানানসই অলঙ্কার। স্টেজ হোক বা টেলিভিশনে অনুষ্ঠান, আশাকে দেখতে পেলে মেয়েটি প্রত্যেক বয়সের সঙ্গে যেন শুনতে পেত নিজের হারিয়ে যাওয়ার সুর। সেই যে শুনেছিল, “কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে যেন আমায়/ কে ডাকে আয়, চলে আয়,” আর মাঝবয়সে পৌঁছে নিজে সেই গান তুলতে গিয়ে যখন পৌঁছায় “কোন পাখি তার দুঃসাহসের ডানা মেলে/যায় হারিয়ে অন্ধ মনের আঁধার/এই মন সঙ্গী করে আকাশের নীল নগরে/আমিও যাব রয়ে তারই পাখায়” পংক্তিতে, তখন অজান্তে কেন চোখ ভিজে আসে, তা আশা-ই হয়তো জানেন। তিনিই কীভাবে যেন একলা স্বপ্ন দেখা কোনো নারী, যে থাকে ভালোবাসারও অপেক্ষায়, তাঁরই জন্য নব্বইয়ের মাঝামাঝি গাইতে পারেন, “ও ভাঁব রে/দেখো হাম দিওয়ানো কো/মস্তি মে মস্তানো কো/আপনি হি ধুন মে চলে হ্যায়/দুনিয়া সে কেয়া লেনা হ্যায়/ও ভাঁব রে…” আর সেই সুর ভাসিয়ে নিয়ে যায় নিরুদ্দেশের পানে। অনেক বছর পর আবার যখন তিনি বলছেন, “মুঝে রং দে” এবং লাইট ক্লাসিকাল সেই গানে শরীর, মনে হিন্দোল জাগছে, তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় কী!
২০০০ সাল। এম টিভি, চ্যানেল ভি তরুণীর সামনে নতুন পৃথিবী খুলে দিচ্ছে। ইন্ডি-পপ হয়ে উঠছে কাল্ট। তখন বিস্ময়ের সীমা পেরিয়ে আশা সেখানেও হয়ে উঠছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জগজিৎ সিং-এর সঙ্গে গাইছেন ‘যব সামনে তুম আ যাতে হো’, আদনান সামির সঙ্গে ‘কভি তো নজর মিলাও’, রিমিক্স করছেন নিজের তুঙ্গ জনপ্রিয়তার গান “ও মেরে সোনা রে”, সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে ‘আপ কি দিল মে থোড়ি সি জায়গা চাইয়ে’, ব্রেট লি-র সঙ্গে ‘ইউ আর দ্য ওয়ান ফর মি’ এবং এখনও হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার মতো “রাত শবনমি, ভিগি চাঁদনি/তিসরা কোই দূর তক নেহি/ইস কে আগে হম অউর কেয়া কহে/জানম সমঝা করো!” আশা লেজেন্ড নন, আশা আমাদের এক ও একমাত্র রকস্টার!
সেই বালিকা মাঝবয়সে পৌঁছে বোঝে, আশা ছক ভেঙেছেন কণ্ঠে। তিনি নারীবাদী কি না জানা হবে না। কিন্তু তিনিই যে স্বর তুলেছেন, তা আমাদের, মেয়েদের নিগড় ভেঙেছে। তিনি গলা খুলে বলেছেন, “রাত আকেলি হ্যায় বুঝ গয়ে দিয়ে,” বলেছেন, “ইয়ে মেরা দিল পেয়ার কা দিওয়ানা”। তাঁর কণ্ঠ কোনো নির্দিষ্ট খোপে আটকে পড়াকে অনায়াসে অস্বীকার করেছে সাহসী ঔদ্ধত্যে।
আর যখন স্মৃতি ঘিরে ধরে, অনিশ্চিত আগামী দূর থেকে ডাকে, তখন শুধু নিজের কিছু মুহূর্তরা সেই মেয়ের পাশে বসে গায়, “কাতরা কাতরা মিলতি হ্যায়/কাতরা কাতরা জিনে দো/জিন্দেগি হ্যায়/বহেনে দো/পিয়াসি হুঁ ম্যায়, পিয়াসি রহনে দো…”। জীবন দূরতর হবে, ভেসে আসবে সুর—“পিয়াসি হুঁ ম্যায়, পিয়াসি রহনে দো…”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *