‘কুরুম্বেরা’ শুধু একটি দুর্গ নয়, সম্প্রীতির স্মৃতিস্তম্ভও
রুপক কর্মকার
নানান রাজ রাজাদের কাহিনী, তাদের রহন সহন, তাদের বেশভূষা জানার আগ্রহ আমাদের সব সময়ই ভালো লাগে। তারপর যদি তাদের নির্মিত স্থাপত্য, শৈলী ও শৈল্পিক নমুনা সম্বন্ধে নানান তথ্য কাছে আসে তবে তার থেকে রোমাঞ্চকর আর কিছু হওয়ার নেই। তেমনি বেশ কিছু রোমাঞ্চ ও স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে কুরুম্বেরা দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশিয়াড়ি ব্লকের গগনেশ্বর নামে একটি গ্রামে তার আলাদাই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কুরুম্বেরা দুর্গের কাঠামোটি এমন ভাবে তৈরি যেটা ওড়িশার শিল্প শৈল্পিক ধাঁচের। আসলে কুরুম্বেরা দুর্গ নির্মাণ যার মস্তিষ্কপ্রসূত তিনি হলেন গজপতি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কপিলেন্দ্র দেব। কপিলেন্দ্র দেব ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হিন্দু রাজা। তিনি তার সময়ে এক বিস্তৃত সাম্রাজ্যের স্থাপন করেছিলেন। তার উত্থানও বেশ চমকপ্রদ বলে ধরে নেওয়া হয়।
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মণ্ডলা পঞ্জির নথি থেকে জানা যায়, কপিলেন্দ্র দেব পূর্বে কপিল রাউত নামে পরিচিত ছিল এবং সূর্যবংশীয় ছিলেন। দৈব স্বপ্নের উপর ভর করে পূর্ব গঙ্গা বংশের শেষ শাসক ভানুদেব তাকে দত্তক নেন। অল্প বয়সেই তাকে গঙ্গা বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং বাংলার মুঘল শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে মাদলা পঞ্জির আরেকটি সংস্করণ বলছে কপিলেন্দ্র দেব গঙ্গা রাজা চতুর্থ ভানু দেবের অধীনে প্রাসাদে থাকতেন। ভানুদেব যখন মোঘলদের দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়েন তখন কপিল সামন্ত (কপিলেন্দ্র দেবের আগের নাম) একজন সাহসী সৈনিক হিসেবে নিজের বীরত্বের পরিচয় দেন এবং ভানু দেবের মৃত্যুর পর কপিলেন্দ্র দেব নাম ধারণ করে ওড়িশার শাসক হন। যদিও তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই যুদ্ধবিগ্রহে অতিবাহিত হয়েছিল। তবে তার শাসনকালেই জগন্নাথ মন্দির নাটক, নৃত্য এবং অন্যান্য শিল্পকলার বিকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তিনি সংস্কৃতির একজন খ্যাতিনামা পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং নিজে ‘পরশুরাম বিজয়’ নামে একটি সংস্কৃত নাটকও লিখেছিলেন। এমনকি ভগবান জগন্নাথের চন্দন যাত্রা উৎসব তার শাসনকালেই শুরু হয়েছিল। তবে বাংলার সাথে কপিলেন্দ্র দেবের আত্তিক যোগাযোগ ছিল। সমগ্র বাংলা জুড়ে সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আমরা কমবেশি সকলেই জানি পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা একদা ওড়িশার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পঞ্চদশ শতকে আফগান এবং মোগল শাসকেরা মুহুর্মুহু গজপতি সাম্রাজ্য আক্রমণ করত। গজপতি দেব কপিলেন্দ্র তখন কুরুম্বেরা দুর্গটি নির্মাণ করেন বাংলা ও ওড়িশা অঞ্চলের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে। কুরুম্বেরা নামটির পেছনে বেশকিছু সদর্থক মানে লুকিয়ে আছে। কুরুম শব্দটি এসেছে ওড়িয়া ‘কুরমা বেধ’ (কচ্ছপের প্রাচীর) থেকে, আর ‘বেড়া’-র অর্থ ‘প্রাচীর’। দুর্গের চারপাশের সুউচ্চ পাথর বাঁধানো প্রাচীর কচ্ছপের পিঠের মতো শক্ত হওয়ার কারণে এই নামকরণ করা হয়। ল্যাটেরাইট পাথর অর্থাৎ লাল পাথরের তৈরি এই দুর্গের ভেতরে প্রশস্ত উঠান, খিলানযুক্ত করিডর এবং তিনটি উচুঁ গম্বুজ রয়েছে। এটি ওড়িশার ‘রেখা দেউল’ শৈলী অনুসরণ করে তৈরি বলে মনে করা হয়। আবার অনেকে এটিকে হিন্দু ও মুসলমান স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ সংমিশ্রণ বলেও মনে করেন। দুর্গের ভিতরে রয়েছে প্রশস্ত আঙিনা এবং খিলানযুক্ত করিডর যা এক সময় ধর্মীয় কার্যকলাপের কেন্দ্র ছিল বলে মনে করা হয়। আবার দুর্গের ভিতর এক সময় একটি শিব মন্দির ও ছিল যা এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত সুতরাং সেই থেকেই ধরে নেওয়া হয় দুর্গটি হিন্দু ও মুসলমান রীতির পীঠস্থান। প্রথমত এই স্থাপত্যটি ওড়িশার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনুরূপ বলে ধরা হত, পরে অবশ্য একই সাথে মুঘল স্থাপত্যের উপাদানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ ১৫৭৫ সালে টুকারোইয়ের যুদ্ধে বাংলার আফগানদের পরাজিত করে মুঘলেরা ওড়িশা দখল করে। যদিও দুর্গটিতে একটি বেদির ওপর তিনটি গম্বুজ বিশিষ্ট কাঠামো ও যজ্ঞবেদী রয়েছে। গম্বুজের অংশগুলো গোলাকার স্তম্ভের ন্যায় ফলে এই দুর্গের স্থাপত্যের সাথে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার রায়বানিয়া দুর্গের অনেক মিল রয়েছে।
কুরুম্বেরা প্রথম পুরাতত্ত্ববিদদের নজরে আসে বাংলায় কর্মরত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট ডব্লিউ হার্শেলের মাধ্যমে। যিনি ১৮৬৭ সালের ডিসেম্বরে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল এর জন্য এই স্থানটি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তবে হার্শেলের মতে এটি কোন দুর্গ নয়, কারণ দুর্গের মতো এটি তে কোনো প্রতিরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য নেই। তবে যাই হোক আজ থেকে ৬০০ বছর আগের তৈরি কোন স্থাপত্য যা বাংলা ও ওড়িশা-কে এক করে দিয়েছিল তা পুরাতত্ত্ববিদদের নজরে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। এই স্থাপত্য কেন গড়ে উঠেছিল তা নিয়ে নানান মতামত থাকলেও বর্তমানে এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান শুধু নয়, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও বেশ প্রসিদ্ধ।