শনিবার | ১১ এপ্রিল ২০২৬

পুস্তক পর্যালোচনা : কুয়াশার ভেতরে রোদের ঝিলিক “৪৮ আখাউড়া রোড”

 পুস্তক পর্যালোচনা : কুয়াশার ভেতরে রোদের ঝিলিক “৪৮ আখাউড়া রোড”

লক্ষ্মণ কুমার ঘটক

“এই যে বালকের চোখ অবাক,
এই যে বুঝতে পারে সে,
এই যে চারপাশে এতো চিল চিৎকার,
ডিজে আর মানুষে,
কেউ কি নেই তাঁদের না করতে পারে,
কেউ কি নেই বুঝিয়ে বলার,
এত আওয়াজে পৃথিবীর কষ্ট হয়।“

সভ্যতার দ্রুতগতির ডামাডোলে এখন অবাক হওয়াটাই অবাক করে দেওয়ার মতো। চারপাশে এত এত বিবমিষা, সুস্থ চিন্তা করাই যেন অসুস্থতার লক্ষণ। তবুও মানুষ ভাবে, ভাবায়, আনন্দে বাঁচতে চেষ্টা করে সবাইকে নিয়ে। এরই এক দুরন্ত উদাহরণ, আগরতলার পরিযায়ী আড্ডার মুখপত্র “৪৮ আখাউড়া রোড”। ওয়ান এইট ডাবল ক্রাউন সাইজে আটচল্লিশ পাতার প্রথম সংখ্যা নি:সন্দেহে কিছুটা অন্যরকম। লেখক তালিকায় নয়, এর জোর হচ্ছে ভাবনা বিস্তারে। আড্ডা শীর্ষক সম্পাদকীয়তে সেই ভাবনাই পাওয়া যায়, “পরিযায়ী-র বিশ্বাস, অভিমুখ, গন্তব্য বা স্থির লক্ষ্য … যাহাই বলি না কেন, তা সে একটাই … মানুষ ও সুস্থ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির মানবিক মেলবন্ধন যা উদার মননে, চিন্তনে সমৃদ্ধ। …. এই অকৃত্রিম, কর্কট জলধির মত স্বচ্ছ প্রবহমান ও আবেগময় সংবেদনশীলতায় ঋদ্ধ আড্ডা হোক আমাদের কাঙ্ক্ষিত জয়ের আয়ুধ। … আমাদের স্বপ্ন, আমরা হই কালজয়ী/ এই স্বপ্নে বেঁচে থাকুক প্রিয় ‘পরিযায়ী’…..।“
সাহিত্য মানে তো শুধু অক্ষরের খেলা, এমনটা নয়। ‘মাটি’ শিরোণামে অপন দাস লিখেছেন, “এই অনি:শেষ মহাকাশে ধুলোবালি মিশ্রিত মাটির চেয়ে সত্য জিনিস আর কিছু নেই”। সেই অনাদিকাল থেকে মাটি দখলের ফলাফলই তো যুদ্ধ আর মানুষের প্রব্রজন। পুলক চক্রবর্তী “পরিসর: কবি ও কবিতার আপন ঘর” শিরোণামে লিখেছেন, “আসলে মানুষের যা কিছু অর্জন তা দল বেঁধে হয়, একা কিছু হয় না”। এই লেখা থেকেই জানতে পারি, বেঁধে বেঁধে থাকার চিরন্তন ভাবনাটুকু আবারও নতুন করে উস্কে দিয়েছে ‘পরিসর’ নামের এক সংগঠন। টনিলাল পাঁড়ে “পরিযায়ী বৃত্তান্ত” শিরোণামে এই আড্ডার বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন, তাতে নাতিদীর্ঘ ইতিহাস ভ্রমণ হয়ে যায়। এই লেখা থেকে জানতে পারি, ‘পরিযায়ী আড্ডা’ নামটা বেশি দিনের নয়, তবে আগরতলায় লেখক-চিন্তকদের এই ধরণের আড্ডার সূচনা ১৯৯৬/৯৭ সাল থেকে।
প্রখ্যাত গল্পকার দেবব্রত দেবের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে “তীব্র বিদ্যুৎলতা” লেখাটি পাঠককে টেনে নেয়। নীলোৎপল সরকারের ‘আড্ডাচরিত’, সঞ্জীব দে-র “সান্ধ্য আড্ডা, লাল চা এবং একজন কবি”, সুস্মিতা দাসের “দুলাল ঘোষের সংবেদী সাহিত্য সৃজন”, শ্যামাপদ চক্রবর্তী’র “বিমল চৌধুরীর গল্প : পাঠোত্তর পর্যালোচনা” আগ্রহের বৃত্তে ঢেউ তুলে। দু’টি গল্প রয়েছে – সুস্মিতা দেবনাথের ‘সমঝোতা’ এবং মানসী দাসের ‘মনের নোঙর”। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা অবলম্বনে উদয়শঙ্কর ভট্টাচার্যের নাটক “পুজোর বাজার” ও বিষ্ণু ঠাকুরের রম্য রচনা “একটি রাত” কাগজটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
সতেরটি কবিতা রয়েছে। লিখেছেন দিলীপ দাস, সমীর ধর, গোপা রায় খোকন সাহা, অপাংশু দেবনাথ, মৃণালকান্তি, অনন্ত সিংহ, রাহুল শীল, সংহিতা চৌধুরী, গোপেশ চক্রবর্তী, দিপ্সি দে, বিশ্বজিৎ গুপ্ত, সুব্রত দত্ত চৌধুরী, শুভাশিস চৌধুরী, টিংকুরঞ্জন দাস, শঙ্কর সাহা, আকবর আহমেদ।
কাগজটির দ্বিতীয় সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমেই চোখ যায় বিশ্বজিৎ গুপ্ত-র লেখা প্রবন্ধে “স্মৃতি-বিস্মৃতির পথে খ্যাতি আড্ডা কথা”। শেষ প্যারায় তিনি লিখেছেন, “অনেক বছর আগে কলকাতার অফিস পাড়ায় একটা অদ্ভুত / অভাবনীয় আড্ডায় খানিকক্ষণ ছিলাম। সন্ধ্যের পর অফিস ছুটির পর, বিভিন্ন বয়সী লোকেরা একটা ফুড স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে, বসে – চা-তেলেভাজার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। সংখ্যাটাও খুব কম না। কুড়ি-পঁচিশজন তো হবেই। আশ্চর্যের বিষয়টা এই যে, এই আড্ডার লোকেরা কথা বলে না। কথা বলতে পারেন না। তারা সবাই বোবা-কালা। সেই রকম অঙ্গভঙ্গী বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যেই চলে সেই আড্ডা”। এই সংখ্যার আকর্ষণ কবি শঙ্খপল্লব আদিত্যকে নিয়ে ক্রোড়পত্র। লিখেছেন অপন দাস, মৃণালকান্তি দেবনাথ, সংহিতা চৌধুরী। নামলিপি ইমানুল হক। প্রতিটি সংখ্যার মূল্য পঞ্চাশ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *