শনিবার | ১১ এপ্রিল ২০২৬

গল্প : বন্ধুত্ব ভালোবাসা আবেগ

 গল্প : বন্ধুত্ব ভালোবাসা আবেগ

গণেশ দেবরায়

শিবায়ন দুপুর রৌদ্রে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো। খবরটা সে কিছুতেই মনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারছে না। রুদ্রকে একবেলা না দেখে সে থাকবে কী করে? কী করে সে বাঁচবে? পৃথিবীটা কেমন যেন নিকষ কালো হয়ে আসছে। কোনো কিছুই যেন আর ভালো লাগছে না। অথচ গতকালও সন্ধ্যায় রুদ্র আর শিবায়ন অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটিয়েছে। হাসাহাসি, খুনসুটি সবই ছিল। কিন্তু রুদ্র তবুও একবারও বলেনি এত বড় দুঃসংবাদটা! শিবায়ন ভাবতে থাকে— কেন বলল না রুদ্র আমাকে! তাহলে কী সে মন থেকে আমাকে ভালোবাসে না? সবই কী তার অভিনয়! ভাবতে ভাবতে যেন বুকটা কেমন জ্বালা ধরে যায়। মনের মাঝে হাজার প্রশ্নের জন্ম দেয়। শিবায়ন যেন আর চলতে পারছে না। সাইকেল থামিয়ে মাঠের পাশের বড় গাছটার নিচে বসে পড়ল। এই বড় মাঠ পেরিয়ে যেতে হয় রুদ্রর বাড়ি। কত বিকাল একসঙ্গে কাটায় ওরা এই মাঠে। সব যেন আজ শেষ হতে যাচ্ছে। শিবায়নের মনে হচ্ছে তার হৃদপিণ্ডটা যদি বের করে রুদ্রকে দেখাতে পারত, তবেই হয়তো রুদ্র বুঝতে পারত শিবায়ন কতটা ভালোবাসে রুদ্রকে।

রুদ্রকে এতটা ভালোবাসার পরও সে কেন যে এত বড় খবরটা গোপন করল, সেটাই শিবায়ন বুঝতে পারছে না। সে ভাবে— অথচ রুদ্র ঠিক জানে যে আমি ওকে কত ভালোবাসি! ভাবতে ভাবতে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। নিজের অজান্তেই নিজের চোখের কোণে জল এসে পড়ে। রুদ্রর যাওয়ার কথাটা বাবার মুখ থেকে শোনার পর থেকেই শিবায়নের বুকটা যেন কী করছে। সে বুঝে উঠতে পারছে না কিচ্ছু। দুজনের বন্ধুত্ব ক্লাস নাইন থেকে। টিনএজের ছেলে-মেয়েরা একটু বেশি ইমোশনাল হয়। খুব সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, খুব সহজেই একে অন্যের উপর নির্ভর করে বসে। খুব সহজেই একের অন্যের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, সে বন্ধুদের মধ্যেই হোক আর বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যেই হোক। শিবায়ন আর রুদ্রের বন্ধুত্ব ঠিক সেই রকম। তবে শিবায়ন যতটা উন্মাদভাবে ভালোবাসে, রুদ্র ততটা ঠিক না হলেও শিবায়নকে যথেষ্ট ভালোবাসে।

কিন্তু শিবায়নের মতো সারা জীবন একসঙ্গে কাটানোর স্বপ্ন দেখে কিনা, শিবায়ন সেটা জানে না আজও। অবশ্য সে নিজেও তার মনের ইচ্ছা মুখ ফুটে বলতে পারেনি এখনো রুদ্রকে। অনেক দিন ভেবেছিল রুদ্রকে কথাটা বলবে। কিন্তু সামনে এলেই সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়! বুক ধড়ফড় করতে থাকে, সারা বুক জুড়ে কেমন যেন একটা যন্ত্রণা অনুভব করে সে। মনে হয় রুদ্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে সারাক্ষণ। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না! তাই মনের ইচ্ছাটা মনেই থেকে যায়। রুদ্রকেও আর মুখ ফুটে বলা হয় না।

শিবায়ন ভেবে পায় না, স্কুলের এত এত বন্ধুর মধ্যে কেন যে রুদ্রকে এত আপন মনে হয়, সে বুঝতে পারে না। অথচ ঋতু, সায়ন, সৌম্য এবং আরও অনেকেই আছে, তবুও রুদ্রর সঙ্গে সম্পর্কটা অন্য রকম। ঠিক যেন PQ! একসঙ্গে বসা, একসঙ্গে টিফিন খাওয়া, লেজার পিরিয়ড কাটানো, একসঙ্গে স্কুল কামাই করা— এক কথায় একসঙ্গে ওঠাবসা। স্কুলের সহপাঠিরা তাই মজা করে নাম দিয়েছে স্বামী-স্ত্রী। তাই বলে ওদের বন্ধুত্বে এতটুকু ঘাটতি হয়নি। এই করতে করতে দু’জন একসঙ্গে নাইন থেকে ধীরে ধীরে দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করল। এবার ওরা কলেজে উঠল। শিবায়ন বরাবরের ভালো ছাত্র। পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী সে। কিন্তু বাবা আর্থিকভাবে ততটা সচ্ছল না। বাজারে একটা ছোট্ট মুদির দোকান। তা দিয়েই শিবু পাল এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে সংসার। ছেলে শিবায়ন এবার কলেজে উঠল, শিবুর ইচ্ছা ছেলে স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়ে বি.এসসি কমপ্লিট করে সংসারের হাল ধরবে। কারণ মেয়েও তো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, এবার মেয়ে ক্লাস নাইনে উঠল।

রুদ্র পড়াশোনায় ততটা মনোযোগী না হলেও রেজাল্ট মোটামুটি চলনসই। কিন্তু রুদ্রর মা এবং বাবা দুজনেই চাকরি করেন। তাই মা-বাবার ইচ্ছাতেই তাদের একমাত্র ছেলে যাবে বাইরে পড়তে। বাবা-মা প্রায় সবকিছুই পাকাপাকি করে নিচ্ছেন। নম্বর যাই হোক, যত টাকা লাগুক, একমাত্র ছেলেকে ডাক্তার তৈরি করতেই হবে। ‘না হলে সমাজে মুখ যাবে’— সত্যরঞ্জনবাবুর এক কথা। কিন্তু বাধা সেজেছে রুদ্র। সে যেতে চাইছে না কিছুতেই! তার এক কথা— আমি এখানেই পড়ব।

— কী পড়বি এখানে তুই?
— জেনারেল লাইনে পড়ব।
— মানে! তোর কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আজকাল কেউ জেনারেল লাইনে পড়ে?
— কেন, শিবায়ন তো পড়বে।
— শিবায়ন পড়বে বলে তুইও পড়বি! ওর অবস্থান আর তোর অবস্থান কি এক?
— কেন, ও তো আমার থেকে বেশি নম্বর পেয়েছে।
— শুধু নম্বরে হয় না! আজকাল টাকা ছাড়া কিচ্ছু হয় না।

সত্যরঞ্জনের রাগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তার গলার আওয়াজ তাই প্রমাণ দিচ্ছে। তাই সঙ্গীতা বিতর্কটা টেনে নিয়ে বলে— ‘তুমি সব পাকা করে নাও। রুদ্রকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।’ সত্যরঞ্জন কিছুটা স্বস্তি পেলেও, রুদ্র কিছুতেই আর শান্তি পাচ্ছে না। মন যেন শিবায়নকে ছেড়ে কিছুতেই যেতে চাইছে না। সঙ্গীতা অনেক চেষ্টা করে তবে রুদ্রকে রাজি করাতে সক্ষম হল। রুদ্র শেষ পর্যন্ত মা-বাবার স্বপ্ন ও সামাজিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে সম্মতি দিল। সে মেডিক্যাল পড়তে যাবে ব্যাঙ্গালোরে।

শিবায়ন এক বুক ব্যথা নিয়ে গাছের নিচে বসে আছে। তার ইচ্ছে করছে না রুদ্রর বাড়ি যেতে। শুধু ইচ্ছে করছে এই নির্জন মাঠে বসে চিৎকার করে কাঁদতে। হঠাৎ পিঠে কার স্পর্শে চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখে রুদ্র দাঁড়িয়ে। মুহূর্তে যেন শিবায়নের হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল। সে নির্বাক হয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য। রুদ্র ধীরে ধীরে পাশে বসে শিবায়নের গলা জড়িয়ে বলল— ‘কী হয়েছে তোর?’

— তুই কী মেডিকেল পড়তে যাচ্ছিস ব্যাঙ্গালোর?
— তুই কী করে জানলি?
— কথাটা গোপন করলি কেন!
— গোপন করিনি। বিশ্বাস কর, আমি অনেক চেষ্টা করলাম না যাওয়ার জন্য। কিন্তু মা-বাবা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। তাই শেষ পর্যন্ত আমাকে যাওয়ার জন্য বাধ্য করল।
— যাবি না কেন?
— তোকে ছাড়া থাকতে আমার ভীষণ কষ্ট হবে।

কথাটা শুনতেই ভেতরটা কেমন করে উঠল শিবায়নের। ঝট করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে রুদ্রকে, হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। এতক্ষণে তীব্র যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ ঘটল যেন। কিছুক্ষণ দুই বন্ধুর চোখের জলে কিছুটা শান্ত হল দুই তৃষিত হৃদয়। কিছুক্ষণ দুজনেই নিস্তব্ধ থাকার পর রুদ্র আশ্বাস দেয়— ‘ভাবিস না শিবায়ন, আমাদের বন্ধুত্ব যেমন আছে, সারা জীবন তেমনি থাকবে। আমি কথা দিলাম তোকে। প্রতিদিন ভিডিও কল করব। তুই মন খারাপ করবি না।’

— মন কেন খারাপ করব বন্ধু। তুই পড়তে যাচ্ছিস, খুব ভালো কথা। খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। তোর ভিডিও কলের অপেক্ষায় থাকব প্রতিদিন।

কথা বলতে বলতে শিবায়ন এলিয়ে পড়ে রুদ্রের কোলে। রুদ্র ধীরে ধীরে শিবায়নের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ওরা। একটা ফুরফুরে হাওয়া রুদ্রর চোখে, মুখে, কপালে, ঠোঁটে স্পর্শ করে শিবায়নের সমস্ত শরীরে বয়ে যায়। একান্ত এক চাওয়া-পাওয়ার মাঝে অবশিষ্ট দিন কাটতে থাকে দুজনের। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে রুদ্রর চলে যাওয়ার দিন। আর মাত্র দুই দিন পর চলে যাবে সে। তাই আজকের দিনরাত ওরা একসঙ্গে কাটাবে শিবায়ানের বাড়িতে— এই সিদ্ধান্ত নেয় দুজনে। অনেক রাত পর্যন্ত দু’জন অনেক গল্প-গুজব করে। অনেক কথা, অনেক স্বপ্ন শিবায়নের দু’-চোখে। রুদ্রকে জড়িয়ে ধরে গল্প করতে করতে ‘একসময় মনে সাহস নিয়ে বলে— অনেক দিন ধরেই তোকে একটা কথা বলব ভাবছি, কিন্তু বলতে পারছি না। আজ না বললে মিস হয়ে যাবে, তাই আজ বলতে চাই।’

— বল না, কী বলতে চাস?
— তুই কী আমাকে সত্যিই ভালোবাসিস?
— কেন, তোর কোনো সন্দেহ আছে?
— প্লিজ, সরাসরি উত্তর দে।
— খুব, খুব, খুব ভালোবাসি।
— আমিও তোকে ভীষণ ভালোবাসি। তোকে ছাড়া আমার বাঁচা অসম্ভব। চল, আজকে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, আমরা সারা জীবন একসঙ্গে থাকব।
— হ্যাঁ, সে তো অবশ্যই। আমি যেখানেই থাকি তুই সবসময়ই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
— আমি সেই বন্ধুত্বের কথা বলছি না। আমি বলছি, লিভ টুগেদারের কথা।
— লিভ টুগেদার!
— হ্যাঁ, আমরা সারা জীবন একে অন্যের হয়ে একসঙ্গে বাঁচব। কেউ দ্বিতীয় বিয়ে-থা করব না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে রুদ্র বলল— জানিস, এটা আমারও মনের কথা।

— সত্যি! বলেই জড়িয়ে ধরল শিবায়ন রুদ্রকে। তারপর শিবায়ন বলতে থাকে, আজকে আমরা খোলা আকাশের নিচে চাঁদ এবং তারাদের সাক্ষী রেখে এই শপথ করলাম।

বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসা, তার থেকেই দৈহিক আকর্ষণ এবং সর্বোপরি জীবনসঙ্গী হওয়ার এই যে বিচিত্র লীলা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, সেটা আজকাল ঘরে-বাইরে শুধু বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে নয়, বরং অনুরূপ লিঙ্গের মধ্যেই বেশি ঘটছে। কেউ কেউ কলেজ জীবন থেকে, কেউ চাকরি সূত্রে, কেউ আবার বিবাহিত জীবনেও জড়িয়ে যাচ্ছে এই নেশায়। যেমনভাবে দুই তরুণ আজকে শপথে আবদ্ধ হয়েছে। আর সেই আকর্ষণ থেকেই রুদ্র তার কলেজে চলে যাওয়ার পর, প্রতি রাতে ওরা ভিডিও কল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু কথা বলে না, ডিজিটালভাবে প্রেম বিনিময় করে। বেশ ভালোভাবেই কাটছিল দুইজনের দিন। শিবায়ন সারাদিন অপেক্ষায় থাকে রাতে রুদ্রর কলের জন্য। কল এলে যেন কেউ ফোন রাখতেই চায় না। প্রায় এক বছর কেটে যায় এভাবে।

হঠাৎ আজকে ফোন ধরেই রুদ্র বলে— শিবায়ন, আজ থেকে বেশি কথা বলতে পারব না, সামনের মাসেই পরীক্ষা। তাই যা বলবি দশ মিনিটের মধ্যেই বলে ফেল। শিবায়নের মনটা কেমন করে উঠলেও, ভবিষ্যতের কথা ভেবে হাসিমুখে বলে— ঠিক আছে, বেশি কথা বলতে হবে না। মন দিয়ে পড়াশোনাটা কর, আর সময় না পেলে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে দিলেই হবে। পড়াশোনা কিন্তু ঠিক রাখা চাই।

— ওকে, ডার্লিং— বলেই হাসতে হাসতে ফোনটা কেটে দেয় রুদ্র।

একটা অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে রাত কাটে শিবায়নের। কিন্তু উপায় তো কিচ্ছু নেই। কারণ রুদ্রর পরীক্ষা। এই সময়টা ওকে ছাড়তেই হবে। বেশ কিছুদিন ধরে এইভাবেই চলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এখন সেটা অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম যেমন একটা অতৃপ্তিতে কাটত, এখন সেটা অনেক কমে এসেছে। এখন যেন একটা মেসেজ পেলেই অনেক পাওয়া হয়ে গেছে মনে হয়।

এইভাবে প্রায় দুই-তিন মাস যায়। শিবায়ন ভাবে সামনের মাসেই পরীক্ষা শেষ হবে রুদ্রর। তারপর আবার আগের মতো ভিডিও কলে গল্প করবে দুইজন। দেখতে দেখতে চলে আসে সেই অপেক্ষার দিন। আগামীকাল পরীক্ষা শেষ হবে রুদ্রর। শিবায়নের মনে অনেক আশা— আগামীকাল অনেক কথা হবে, ভিডিও কল হবে। দিনভর তা নিয়ে অনেক কল্পনার ছবি আঁকে সে। কী কী কথা বলতে হবে, কী কী কথা জমে আছে— সব যেন ভাবতে ভাবতে মুখস্থ হয়ে যায়।

কিন্তু পরদিন বিকেলেই একটা মেসেজ আসে রুদ্রর— “শিবায়ন, don’t mind, আজকে আর ফোনে কথা হবে না। হোস্টেলের সবাই ঠিক করেছে, আজকে যেহেতু পরীক্ষা শেষ, তাই সবাই মিলে রাতে সিনেমা দেখে বাইরে থেকে খেয়ে আসব। তাই আসতে দেরি হবে। আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করিস না।”

মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা যখন হারিয়ে যায়, তখন সে এতটাই ব্যাকুল হয়ে পড়ে— কখনো কখনো মানুষটি উন্মাদ হয়েও যেতে পারে। কখনো ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের মতো দুমড়ে-মুচড়ে ভূতলে ধরাশায়ী হয়ে যায়। তখন সবকিছু কেমন অন্ধকার হয়ে আসে। শিবায়নের সামনে সব কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে আজ। বুকের ভেতরটা ভীষণ জ্বালা করছে, ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু এই বয়সের ছেলেদের কি কান্না মানায়? তাই নীরবে, নিভৃতে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

তারপরও রাত জেগে অপেক্ষা করে— হয়তো রুদ্র এসে ফোন করে বলবে— “ঘুমিয়ে পড়েছিস বুঝি? সরি, আমি এইমাত্র এলাম।” কিন্তু উড়ো মেঘের মতো এই ভাবনা-চিন্তার সম্ভাবনাগুলো উড়ে যায় হাওয়ায়। রুদ্রর ফোনের অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে মধুর স্বপ্ন দেখে শিবায়ন— ওদের দুজনের সংসার, ঠিক যেন স্বামী-স্ত্রীর মতো। সারাদিন দুইজন একই সঙ্গে হাসি, গল্প, বিভিন্ন খুনসুটিতে মেতে আছে।

হঠাৎ চোখে তীব্র আলো এসে পড়তেই ঘুমটা ভেঙে যায়। মাথার পাশে পড়ে থাকা মোবাইলটা হাতে নেয় দ্রুত। একটাই উদ্দেশ্য— রুদ্র কী মেসেজ পাঠাল, সেটা দেখা। অতি উৎসাহে হোয়াটসঅ্যাপ খুলেই একেবারে হতাশ। কোনো মেসেজ নেই! কখন ফিরল, কী করল অত রাত পর্যন্ত! ইচ্ছে হল এক্ষুনি ঝট করে ফোন করে জেনে নিতে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল— গতকাল রাত প্রায় দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলাম, তখনও রুদ্রর মনে হয়নি ফোন করা বা কোনো মেসেজ পাঠানোর কথা! তাহলে আমি কেন ফোন করব? আমিও আজ করব না ফোন।

ঝট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় শিবায়ন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বুকের ভেতরটা যেন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেছে। একটা ভারী পাথর যেন কেউ চাপা দিয়ে দিয়েছে তার বুকে। সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে, মনটা যে পড়ে আছে মোবাইলের দিকে— কখন আসবে মেসেজ বা কল!

ধীরে ধীরে দিনের অবসান হয়ে রাতের অন্ধকার নেমে এল, তবুও মোবাইলটা আর বেজে উঠল না! এবার শিবায়নের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল— রুদ্র আমার ওপর রাগ করেনি তো? কিন্তু কেনই বা রাগ করবে? ভাবতে ভাবতে কোনো সমাধানসূত্র আবিষ্কার করতে না পেরে, শেষে রাত আটটায় ফোন করল সে রুদ্রকে। বেশ কিছুক্ষণ ফোনে রিং হওয়ার পর রুদ্র খুব ব্যস্তভাবে ফোনটা রিসিভ করল— “হ্যালো, শিবায়ন, আমি একটা পার্টিতে আছি। ফিরে তোকে ফোন করব।” কথাগুলো খুব সহজে বলেই ফোনটা কেটে দিল রুদ্র, শিবায়নের উত্তরের অপেক্ষাও করল না!

শিবায়ন ধপাস করে বসে পড়ল সোফায়। কিছুক্ষণের জন্য হৃদপিণ্ডটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল সে— আমি নিজে থেকে আর ফোন করব না।
সত্যিই আর ফোন করে না শিবায়ন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— রুদ্র যেন ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যায় ওকে। দু’-চার দিন পর শিবায়ন ফোন করে রাঘবকে। রাঘব রুদ্রর সঙ্গেই পড়াশোনা করে। একদিন রুদ্রই শিবায়নের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ফোন ধরেই রাঘব অনেক কথার মাঝে বলে বসে— “রুদ্রর গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে পরিচয় হল?”
— গার্লফ্রেন্ড! শিবায়ন যেন আকাশ থেকে পড়ল।
— কেন, রুদ্র কিছু বলেনি? সুরিতা আমাদের সঙ্গেই পড়ে। কলকাতায় বাড়ি। ভীষণ স্মার্ট।
— তাদের কতদিন হল, এই সম্পর্কের?
— প্রায় ছয় মাস হবে। সুরিতা বেশ ভালো মেয়ে, দেখতেও মন্দ নয়।
আরও অনেক বিশেষণ জুড়তে লাগল রাঘব, কিন্তু শিবায়নের কানে আর কিছুই যেন যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা যদি দুই টুকরো হয়ে যেত, তাহলে মিথ্যা প্রতিজ্ঞাসহ শিবায়ন আশ্রয় নিয়ে নিত এই মুহূর্তে। কী ভয়ঙ্কর রুদ্র! ভাবতেই যেন ঘৃণা আর ক্ষোভ জেগে উঠছে মনে। তাহলে সবকিছুই ছিল রুদ্রর অভিনয়! প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞার এই ফল!

ভাবতে ভাবতে শিবায়ন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়— আর ফোন করব না ওকে নিজের থেকে। আমার সঙ্গে এত বড় প্রতারণা! এখন দেখব সে কী করে!

মানুষের জীবন সর্বদাই বিচিত্র স্বাদ নিতে আগ্রহী। বিশেষ করে যৌবন হল একটা গবেষণাগার, যেখানে জীবনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার পরীক্ষা করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুগুলির উৎস সন্ধান করে তার স্বাদ গ্রহণের মধ্য দিয়েই জীবন এগিয়ে যায়। রুদ্রর ক্ষেত্রেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? তাই একটু একটু করে রুদ্র আজ অনেক দূরে শিবায়ন থেকে। সে এখন সুরিতার ভালোবাসায় উন্মাদ। জীবনের নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছে ওরা।

শিবায়নও অভিমান করে আর খুব একটা ফোন করে না রুদ্রকে। মাঝে মধ্যে যা একটু-আধটু কথা হয়, তাও সাধারণ কথাবার্তা, এবং তা রুদ্র নিজে থেকে ফোন করলেই হয়। শিবায়নের মনের দুঃখ অজান্তেই ধীরে ধীরে একটু একটু করে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তখন মনে হয়, সেই রাতে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মস্ত বড় ভুল ছিল। কারণ সৃষ্টির নিয়মকে ভেঙে ফেলা এত সহজ নয়, কিংবা উচিতও নয়। আবেগের বশে মানুষ অনেক ভুল করে, ধীরে ধীরে আবার শুধরে নেয়, যখন সে নিজের ভুল বুঝতে পারে।

শিবায়নও একা একা এসব ভেবে এখন লজ্জিত হয়। ভাবতে থাকে— যারা এই বিচিত্র সিদ্ধান্ত নেয়, তারা জীবনে সত্যিকারের ভুল করে। আর যখন সেটা অনুভূত হয়, তখন আর পেছনে ফেরার পথ থাকে না। রুদ্রর সিদ্ধান্তই সঠিক মনে হয় এখন। এই বিচিত্র পৃথিবীতে এমন বিচিত্র ঘটনাও আজকাল ঘটে, যেটা প্রকৃতির পক্ষে অন্যায়।

দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর নিজের ডায়রিতে নিজেই জীবনের একটা ছোট্ট স্মৃতি পাঠ করে, গল্পটা লিখতে লিখতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে অতীতে। হঠাৎ ছেলে এসে ডাক দেয়— বাবা, খেতে এসো। শিবায়ন ঝট করে ডায়রিটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায় খাবার টেবিলের উদ্দেশ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *