শুক্রবার | ২৪ এপ্রিল ২০২৬

দিল্লি কি মার্কিনী নিয়ন্ত্রণে!

 দিল্লি কি মার্কিনী নিয়ন্ত্রণে!

সম্পাদকীয়, ৬ মার্চঃ রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ৩০ দিনের সাময়িক ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রথম দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক স্বস্তি বলেই মনে হতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতার মধ্যে ভারতের মতো বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এই ছাড় নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু ঘটনাটিকে যদি একটু গভীরভাবে দেখা যায়, তবে বোঝা যায় এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়–বরং বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক কৌশলেরই সূক্ষ্ম প্রকাশ।

মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, এই অনুমতি সম্পূর্ণ অস্থায়ী এবং মূলত সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের চালান নিষ্পত্তির জন্য দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে, ভারত তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং ভবিষ্যতে ভারত যে আমেরিকা থেকে আরও বেশি জ্বালানি কিনবে-সে প্রত্যাশাও তাদের রয়েছে। অর্থাৎ সাময়িক ছাড়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের কূটনৈতিক প্রত্যাশার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এই প্রেক্ষাপটে প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরুপমা রাওয়ের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া সতর্কবার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বড় শক্তির কূটনীতিতে নিষেধাজ্ঞা, ছাড় বা ব্যতিক্রমী অনুমতি-এসবই বহুদিনের পরীক্ষিত কৌশল। এর মাধ্যমে সরাসরি চাপ না তৈরি করেও মিত্র দেশগুলির নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই একই কৌশল কার্যকর হতে শুরু করেছে কি না-এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

গত কয়েক বছরে ভারতের জ্বালানি কূটনীতি মূলত “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি” বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতির উপর দাঁড়িয়ে ছিল। পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে সস্তা তেল কিনেছে এবং একই সঙ্গে আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানি বজায় রেখেছে। এই বহুমুখী কৌশলই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনেকাংশে শক্তিশালী করেছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার সাময়িক ছাড় একদিকে ভারতের জন্য সুবিধা তৈরি করলেও অন্যদিকে এটি একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বার্তাও বহন করছে–ভারতের জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ দিক কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের স্পষ্ট প্রত্যাশা রয়েছে।
নিরুপমা রাওয়ের পর্যবেক্ষণ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনে। ভারতের কূটনীতি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষতা ও কৌশলগত স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে নয়াদিল্লি ক্রমশ আমেরিকার কৌশলগত বলয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। বিশেষ করে ইরান প্রশ্নে ভারতের সতর্ক অবস্থান এবং পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে-ভারত কি সত্যিই তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারবে? নাকি ধীরে ধীরে বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তাকে এক পক্ষের দিকে আরও স্পষ্টভাবে ঝুঁকতে হবে?

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাময়িক ছাড় হয়তো তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই ছাড় যদি নির্ভরতার নতুন সমীকরণ তৈরি করে, তবে তা ভারতের কৌশলগত পরিসরকে সংকুচিত করতেও পারে।

তাই ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বস্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক খেলায় একটি সূক্ষ্ম চাল – যার প্রভাব আগামী দিনে ভারতের জ্বালানি নীতি এবং বৈদেশিক কূটনীতির উপর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *