শনিবার | ০৭ মার্চ ২০২৬

ত্রিপুরার সিনেমার ইতিহাসে মাইলস্টোন অনিল দেবনাথের ‘পরবাসী’

 ত্রিপুরার সিনেমার ইতিহাসে মাইলস্টোন অনিল দেবনাথের ‘পরবাসী’

হরিদাস সাহা, ৬ মার্চঃ সিনেমা নির্মাণের পরিকাঠামোবিহীন ত্রিপুরা থেকে এমন একটি ব্যয়বহুল ছবি নির্মাণ হল যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ১৪টিতে অংশগ্রহণ ও ৮টিতে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারী একযোগে পশ্চিমবঙ্গের ২৪টি প্রেক্ষাগৃহে এবং ত্রিপুরায় গত ২৭ফেব্রুয়ারী ৪টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল। ছবিটির নাম ‘পরবাসী’। পূর্ব দিগন্ত ফিল্মের এটি প্রথম নিবেদন। অনিল দেবনাথের কাহিনি ও প্রযোজনায় ‘পরবাসী’ ইতিহাস তৈরি করল।

‘পরবাসী’ ছবিটি সিনেমা হলেও, সিনেমা নয়- বিপন্ন সময়ের জ্বলন্ত দলিল। যারা সিনেমাকে বিনোদনের মাধ্যম মনে করেন, তাদের জন্য এ ছবি নয়। যারা পূর্ব-পাকিস্তান থেকে দেশভাগের বলি হয়ে সন্তান-সন্ততি, মা-বাবা, স্বজন-প্রিয়জন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করেছেন, রাজনেতাদের কূটচালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, কেবলমাত্র তারাই এই ছবির মর্মবেদনা অনুভব করতে পারবেন।

২৭ ফেব্রুয়ারী প্রিমিয়ার শো দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছিলাম অতীতের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে ওঠা ফেলে আসা সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। মনে হচ্ছিল, এই ছবি তো আমার জীবনের কথা বলছে।

আমি বিশ্বাস করি, এই ছবি দেখলে আপনাদেরও এমন অনুভূতি হবে, মন ছুঁয়ে যাবে, চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাবে। আর মনে হবে, এ তো আপনারও যাপিত জীবনের অস্থির সময়ের গল্প।

ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রোতারা ছবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বহু দর্শক-শ্রোতা আসন না পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো সিনেমাটা উপভোগ করছিলেন। অথচ প্রেক্ষাগৃহে ছিল তখন আশ্চর্য নীরবতা। ত্রিপুরার ইতিহাসে ‘পরবাসী’ ছবিটি এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ।

‘পরবাসী’ ছবিটির কাহিনির আধার পূর্ব-পাকিস্তান ও ত্রিপুরা। ছবিতে বাবুয়ানা ভাষার প্রয়োগ নেই- বাংলার প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষা ও ককবরক ভাষার ব্যবহার হয়েছে। এতে ছবিটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ছবিতে অতিনাটকীয়তার ছোঁয়া নেই-আছে কঠিন বাস্তবতার জীবনধর্মী দৃশ্যায়ন।

ষাটের দশকের পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে বাঁচার তাগিদে ত্রিপুরায় আসেন স্বাধীনতা সংগ্রামী এক শিক্ষক পরিবার। দুষ্কৃতির কবলে পড়ে সেই শিক্ষকের কন্যা হারিয়ে যায় বর্ডার পার হওয়ার আগেই। সহায়-সম্বলহীন সন্তানশোকে কাতর এই শিক্ষক পরিবারকে আশ্রয় দেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল এক জনজাতি পরিবার। অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিকে উদ্ধার করে আশ্রয় দেয় এক দয়ালু মুসলমান পরিবার। কিছুদিন পরে বিভেদকামী শক্তি জাতি-জনজাতিদের মধ্যে সহিংসতার বীজ বপন করে। এরপর জানতে হলে ছবিটি হলে গিয়ে দেখতে হবে।
‘পরবাসী’ ছবির কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার অনিল দেবনাথ ও অমিতাভ ভট্টাচার্য তাঁদের লেখনীতে খুব সুন্দর ব্যালেন্স করেছেন। একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িক হিংসা, খুন, বিদ্বেষ, উসকানি, প্রতিহিংসা দেখিয়েছেন, অন্যদিকে তেমন প্রেম-প্রীতি, দয়া-মায়া ইত্যাদি মানবিক দিকগুলোও সুন্দরভাবে ছবিতে তুলে ধরেছেন।

তরুণ পরিচালক মনেট রায় সাহার এটি প্রথম সিনেমা। সিনেমাটোগ্রাফার জয়েশ নায়ার। ছবির প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন কলকাতার লোকনাথ দে, কিঞ্জল নন্দ, স্বাতী মুখার্জী, সবুজ বর্ধন, আঁখি ঘোষ; আসামের রঞ্জিতা বড়ুয়া, ত্রিপুরার সঞ্জয় কর, সুপ্রীতি ঘোষ, বিনোদ দেববর্মা, রুহী দেববর্মা, রুমা দেববর্মা ও অজয় ত্রিপুরা। এঁরা প্রত্যেকেই যার যার ভূমিকায় অভিনয় করে চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন অমিত চ্যাটার্জী। গেয়েছেন দেশের স্বনামখ্যাত শিল্পী শান, ইমন চক্রবর্তী, মেখলা দাশগুপ্ত এবং দুর্নিবার সাহা ও ইকশিতা মুখার্জী। ছবির প্রয়োজনে গানের ব্যবহার সিনেমাটিকে উচ্চমাত্রা দিয়েছে। রোমান্টিকতার ছোঁয়ায় দুর্নিবার-ইকশিতার ডুয়েট গানটি ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।

বর্তমান প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানতে হলে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখতে হবে। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন হতে হবে- যাতে কোনো বিভেদকামী শক্তি জাতি-জনজাতিকে বিপথে চালিত করতে না পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *