প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিন সফর ছিল ‘তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফর ঘিরে ছিল জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, টেম্পল অব হ্যাভেন পরিদর্শন ও গ্রেট হল অব দ্য পিপলে রাজকীয় ভোজ। কিন্তু বিশাল অশ্বমেধ যজ্ঞ শেষে খালি হাতেই ফিরে গেলেন বিশ্বের দাদা শক্তি আমেরিকা। যদিও নিজেদের আজও বৃহত্তম শক্তি হিসাবে দাবি করে থাকে ওয়াশিংটন, কিন্তু পরিবর্তিত ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমে শূন্যকুম্ভ হচ্ছেন। সম্প্রতি বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি আমেরিকা ও চিনের বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক শেষে শুক্রবার চিন ছাড়লেন ট্রাম্প। বৈঠক ছিল জাঁকজমক, আড়ম্বর ও স্থিতিশীলতার নানা প্রতিশ্রুতিতে ভরা। কিন্তু বাস্তব ফলাফলের বিচারে অনেকটাই শূন্য। দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্প এসেছেন ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপে অনেকটাই ন্যুব্জ ও দুর্বল অবস্থায়। সেই দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলার মতো কোনো সুযোগ কিন্তু পেলেন না। তুলনায় বৈঠকে দৃঢ় অবস্থান নিতে দেখা যায় চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে, বিশেষ করে তাইওয়ান প্রসঙ্গে। যদিও তাইওয়ান নিয়ে বরাবর উচ্চকিত থাকেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, কিন্তু ট্রাম্পের তরফে জোরালো অবস্থান দেখা গেল না।
বেইজিংয়ে শেষ দিনের বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, আমেরিকা ও চিনের মধ্যে ‘দারুণ’ বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে এবং অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু সেই চুক্তির কোনো স্পষ্ট বিবরণ সামনে আসেনি। সমালোচকদের মতে, এই বৈঠক যতটা না বাস্তব অগ্রগতির জন্য, তার চেয়ে বেশি ছিল সুচারুভাবে সাজানো এক প্রদর্শনী। প্রযুক্তিজগতের শীর্ষ কর্তা ইলন মাস্ক ও টিম কুক, ট্রাম্পের ছেলে এরিক এবং আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ইরান, তাইওয়ান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা- কোনো ক্ষেত্রেই বড় কোনো সাফল্য আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, চিন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে রাখতে চাইছে, যেখানে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে। ট্রাম্প, জিনপিং বৈঠক সম্পর্কে প্রাক্তন এক মার্কিন কর্মকর্তা জুলিয়ান গেওয়ার্টজ বলেছেন, চিন চাইছে অচলাবস্থা ট্রাম্পের মেয়াদ জুড়েই বজায় থাকুক। এটি সবাই জানে এই সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে দুই দেশের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে।আগে আমেরিকা এগিয়ে থাকত,কিন্তু এখন দুই দেশ প্রায় সমান অবস্থানে।
এই মহা সম্মেলনে দুই দিন কাটিয়ে ট্রাম্প নিজেও যে কিছু পাননি তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট। চিন ছাড়ার সময় ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘চিনের একটি বলরুম আছে, আমেরিকারও থাকা উচিত।’ হোয়াইট হাউসে ৪০ কোটি ডলারের একটি বলরুম নির্মাণে তাঁর পুরোনো পরিকল্পনার কথাই যেন আবার মনে করিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু দেশে ফিরে ট্রাম্পকে আবারও সেই জ্বলন্ত সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা হলো ইরান যুদ্ধ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব-জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে প্রণালী খুলতে দুই দিনের সম্মেলনে চিনকে কতটা চাপ দিচ্ছে আমেরিকা; আর চিন সেই চাপ মেনে নিচ্ছে কিনা। বেইজিংয়ের ঝংনানহাই উদ্যানের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ইরান প্রসঙ্গে দুই দেশের মতামত অনেকটাই এক। তারা চান না ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করুক এবং উভয়েই চায় হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হোক।
তাঁর কথায়, ওই পরিস্থিতি ‘অস্বাভাবিক”। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা একমত হয়েছেন, হরমুজ প্রণালী খোলা থাকা জরুরি, যাতে জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। জিনপিং স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি এই হরমুজে সামরিক সন্নিবেশের বিরোধী। আবার পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প তাঁর ভাবনার কথা জানিয়ে বলেছেন, ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা চিনা সংস্থাগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যায় কি না – এ নিয়ে তিনি ভাবছেন। জিনপিং তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন চিন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেবে না। তবে একই সঙ্গে চিন ইরানের তেল কেনা চালিয়ে যেতে চায়। চিনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ইরানে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন এবং যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া উচিত। যদিও চিনের প্রায় অর্ধেক তেল হরমুজ দিয়ে আসে, তবু তাদের বড় চিন্তা-মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনে, তবে তাদের রপ্তানিতে প্রভাব পড়তে পারে।
বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্নে চিন কিন্তু তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, বিষয়টি ঠিকভাবে সামলানো না হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হতে পারে। তিনি একে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকার নীতিতে কোনো পরিবর্তন নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, দ্বীপটিকে বড় পরিসরে অস্ত্র বিক্রির এখনও সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর মতে, তাইওয়ান নিয়ে সংঘর্ষের সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। এক কথায় না ইরান, না তাইওয়ান কোনও ইস্যুতেই নতুন কোনও কথা হলো না। শেষ দিনের বৈঠকে ট্রাম্প গোলাপ বাগান দেখে মুগ্ধ হন এবং জানান, শি জিনপিং তাঁকে হোয়াইট হাউসের জন্য গোলাপের বীজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।