বিদিশা ঘোষ
দিলীপ কুমার রায়ের শিষ্যা উমা বসুর ১০৬তম জন্মদিবস এই বছর। গজল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, সংগীতের সব ধারায় অবাধ গতি ছিল ক্ষণজন্মা এই শিল্পীর। তাকে নিয়েই আমাদের আজকের এই ছোট্ট প্রতিবেদনমূলক শ্রদ্ধার্ঘ্য।
ছোট্ট একটা মেয়ে মাস্টারমশায়ের কাছে বসে শিখছে অতুলবাবুর গান। অতুলবাবু লখনউয়ের ব্যারিস্টার। বাংলার অদ্ভুত এক সুর বারবার ধরা দেয় তার গানে। তেমনই এক গান গেয়ে ফেলছে মেয়েটি। উচ্ছ্বসিত মাস্টারমশাই তার সঙ্গে রেকর্ডই করে ফেললেন পরে সেই একই গান। অতুলবাবু হলেন আর কেউ নন, অতুলপ্রসাদ সেন। আর সেই গানটি হল “মেঘেরা দল বেঁধে যায় কোন দেশে”। মাস্টারমশাইটি হলেন গায়িকা কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, আর ছাত্রী? উমা বসু, ডাকনাম হাসি। ১৯৩১ সালে ১০ বছর বয়সে গানটি রেকর্ড করেছিলেন। গান গাইতে পেরেছিলেন আর মাত্র বছর দশেক। ৪২ সালের ২২শে জানুয়ারি নিজের একুশতম জন্মদিনেই যক্ষ্মা রোগে চলে গিয়েছিলেন বাংলা গানের এই ক্ষণজন্মা সুধাকণ্ঠী। ২০২৬ তার ১০৬তম জন্মশতবর্ষ।
বন্ধুবান্ধবদের এক মিলনসভায় উমার গান শুনে অতুলপ্রসাদ বলেছিলেন, “কংক্রিটের মধ্যে যে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে হে,”। কুমারবাবা ধরণী কুমার বসু ছিলেন কাঠখোট্টা ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। অতুলপ্রসাদের পরিবেশের লক্ষ্য তিনি। কিন্তু উপমাটি অব্যর্থ। অতুলপ্রসাদের গানটি রেকর্ডের সময় “আকাশ বল রে আমায় বল আমার আঁখিজল” বলতে গিয়ে খ-এর উচ্চারণে ফ্রক পরা শিষ্ট, বাধ্য বালিকার যে মূর্তি ধরা দেয়, তারই মাটি নিয়ে কেউ যেন ভেঙে এক নতুন ছাঁদে আরেক প্রতিমা গড়ে তোলেন কয়েক বছরের মধ্যেই। ১৯৩৬ সাল। দুটো ভাটিয়ালি গান রেকর্ড করেন উমা বসু। “আমি কেন তারে মন রে দিলাম” আর “জল খেলিতে যমুনাতে যাই”। কথা ও সুর জসীমউদ্দীনের। শুনলে মনে হয় বঙ্কিম বা শরদিন্দুর উপন্যাসের আমলের ষোড়শী অভিসারিকা, অভিজাত গাম্ভীর্য আর জল চুরির আবদার একইসঙ্গে ঢেউ তুলছে একটি কণ্ঠের যমুনাজলে। ১৯৩৯-এ জসীমউদ্দীনের তৈরি আরও দুটি ভাটিয়ালি গানে ফিরে পাওয়া যায় ওই ঝরনার মতো সাবলীল কণ্ঠটিকে। যে সময় জসীমউদ্দীনের গান রেকর্ড করছেন উমা, তার বছর দশেক আগে জোড়াসাঁকো বাড়িতে ঠাকুর পরিবারের অল্পবয়সি ছেলেদের সভাপতি হয়েছিলেন জসীমউদ্দীন। ওই বাড়িতেই কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সঙ্গে অবনকন্যা সুরুপা অভিনয় করেছেন “ডাকঘরে” সুধার ভূমিকায়। সেকালে গায়িকা পাওয়া দুষ্কর ছিল। সার্বজনীন অনুষ্ঠান বা রেকর্ডের প্রয়োজনে উপযুক্ত নারী কণ্ঠে বাংলা গানের আধুনিক গায়ন কিছুতেই পাচ্ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। সাহানাদেবী তার চাহিদার কিছুটা পূরণ করছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ চাইছিলেন সাহানার চেয়েও বয়সে কিছু ছোট, তাজা কণ্ঠ। উমার কাছ থেকে তেমনই প্রত্যাশা ছিল তার। দার্জিলিঙে তার মুখে “এখনও গেল না আঁধার” মতো কঠিন গান শুনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর ১৯৩৫ সালে দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে উমার গলায় রবীন্দ্রনাথের দুটি solo গান রেকর্ড হয়। “সেই ভালো সেই ভালো” এবং “তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও”। দুটি গানই ভীষণ ভালো লেগেছিল রবীন্দ্রনাথের। পরে উমার রেকর্ড প্রকাশের সময় শংসাবাক্যে বলেছিলেন উমার স্বতন্ত্র কণ্ঠমাধুর্যের কথা।
১৯৩৭ সাল। পন্ডিচেরির সাধকজীবন থেকে সাময়িক বিরাম নিয়ে বাংলায় ফিরলেন দ্বিজেন্দ্রপুত্র দিলীপ কুমার রায়। আধুনিক বাংলা গানের চলন-বলন, কথার খেই, সুরের তুক, তার হাতে প্রাণ পাচ্ছিল একে একে। বন্ধু হরেন্দ্রনাথের ছাত্রী উমার গান শুনলেন। দিলীপ বুঝলেন এবারের কলকাতাবাস দীর্ঘ হতে চলেছে তার। নিজের উদ্যোগেই গান শেখাতে আরম্ভ করলেন উমাকে। একই দিনে জন্ম তাদের। শুধু ব্যবধানটা চব্বিশ বছরের। প্রিয় শিষ্যার জন্য তৈরি হল ১৯৩৯-এ “অকূলে সদাই চলো ভাই” এবং “জীবনে মরণে এসো”, “নির্ঝরিণী” কিংবা ১৯৪০-এর “রূপে বর্ণে” এবং “মধু মুরলী বাজে রে”-র মতো আশ্চর্য সব কম্পোজিশন। বাঙালি শ্রোতা সবিস্ময়ে শুনল “শ্যামল ছন্দ কাঁপন”। ওই তরুণীই নতুন ধারার “দৈলিপি” গানের প্রেরণা দিলীপ কুমারের।
১৯৪১। উমা তখন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত এবং প্রবলভাবে অসুস্থ। সেই অসুস্থ শিষ্যার রোগশয্যার পাশে বসে সুরে সুরেই তার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন গুরু। না, নিরাময় হল না তাতেও। উমার জন্য তৈরি বেশ কিছু গান আর কখনও জনসমক্ষে গাইতে পারেননি দিলীপ কুমার।
১৯৩৮-এর বসন্তে বন্ধু সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎকুমার বসুর বাড়িতে ছাত্রীকে নিয়ে যান দিলীপ কুমার রায়। উদ্দেশ্য, সেই বাড়িতে আগত অতিথি স্বয়ং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। মহাত্মা গান্ধী দিলীপ কুমার রায়ের গানের প্রবল অনুরাগী ছিলেন। এবার গান শোনালেন উমাও। মীরার ভজন— “মেরে তো গিরিধর গোপাল”। উচ্ছ্বসিত হলেন মহাত্মা গান্ধী। ১৭ বছরের মেয়ে এমন আকুল ভক্তি পেল কোথায়? মহাত্মা গান্ধী “নাইটিঙ্গেল” ডাকলেন। সেই বুলবুলকে নিয়ে গানই লিখে ফেললেন দিলীপ কুমার। “বুলবুল মন ফুল সুরে ভেসে/ চল নীল মঞ্জিল উদ্দেশ্যে”। কয়েকদিন পর ব্যারাকপুরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে সেই গান শোনানোও হল গান্ধীজিকে। পরে, পেশোয়ারে সীমান্ত গান্ধীর বাড়িতেও মহাত্মাকে মীরার ভজন শোনান উমা— “চাকর রাখো জি”। দিলীপ কুমারকে দেখলেই সুরেলা পাখিটির কথা বারবার মনে পড়ে যেত। পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধী বারবার বলতেন এই ক্ষণজন্মা গায়িকার কথা। সারা জীবনেও হয়তো তিনি ভুলতে পারেননি তাকে। এমনই অসাধারণ লেগেছিল উমার কণ্ঠ মহাত্মা গান্ধীর কাছে। পাখিটির গতিপথ ছিল বিচিত্র। একদিকে ভাটিয়ালি, অন্যদিকে কীর্তন। একদিকে রামপ্রসাদী, অন্যদিকে গজল। “বঁধূ কি আর কহিব আমি”-তে বিরহিণীর প্রেম আর সাধিকার আত্মসমর্পণ, পাশাপাশি হিন্দি ভজন বা উর্দু গজল। ১৯৩৮ সালে তার গাওয়া আমজাদের গজল “ইঁউ তো কেয়া কেয়া নজরে নেহি আতা” বাজত হায়দরাবাদের ঘরে ঘরে। বাংলা গানে “দৈলিপি ঢং”-কে আয়ত্ত করলেও উমা নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন বিশুদ্ধ মার্গসংগীতেও। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তার মার্গসংগীতের শিক্ষারম্ভ হয়েছিল এবং তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করে গেছেন। বিস্ময়ে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ভেবেছেন, পায়ে ঝিঁঝিও ধরে না এ মেয়ের? আশঙ্কিত দিলীপ কুমার ভেবেছিলেন বাংলা কাব্যগীতি কি ভুলে যাবে উমা? কুড়ি বছরের মেয়ে আশ্বস্ত করেছিল গুরুকে, জানিয়েছিল সমস্ত সুরের কাছেই সে নত হতে চায়। জানতে চায়, শিখতে চায়।
সে কালের বিখ্যাত কবি বুদ্ধদেব বসুর কবিভবনে সন্ধ্যেবেলা কবি-গায়ক-শিল্পীর সমাগম হয়েছে। আছেন দিলীপ কুমার রায়। আছেন হিমাংশু দত্ত। আছে মুখচোরা রোগাসোগা একটি মেয়ে। তার গলাতেই শুরু হবে হিমাংশু দত্তের চাঁদ-চামেলীর গান। “আকাশের চাঁদ মাটির ফুলেতে হল যবে পরিচয়”। অবিকল্প, সূক্ষ্ম, সুশীল এক গায়নশৈলী। একটুও সেকেলে নয়, অথচ রিমেকের অতীত। ১৯৩৯-এ মারা গেলেন বাবা ধরনীধর। ১৯৪০-এ ছোট ভাইয়ের মৃত্যু। ১৯ বছরের মেয়েটার বাঁচতে আর ভালো লাগত না। দূরে থাকা মাস্টারমশাইকে চিঠিতে সে লিখত সেই কথা। ১৯৪১-এর মে মাসে ধরা পড়ল যক্ষ্মা। কণ্ঠ প্রায় রুদ্ধ। নৈঃশব্দ্যের গভীরতর সুর কি কাছে ডেকেছিল উমাকে? যেন এক শাপভ্রষ্টা অভিমানিনী গান্ধর্বী। অল্পদিনের জন্য এসেছিল জল-মাটির পৃথিবীতে। আজ থেকে ৮৫ বছর আগে এক প্রবল শীতের মধ্যরাতের শেষ লগ্নে সেই সুরপ্রতিমাটির অকাল বিসর্জন হয়েছিল।