ঝাড়গ্রাম (পশ্চিমবঙ্গ): নেই দশহাতের দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তি, জাঁকজমক। জমকালো উৎসব, আলোর ঝলকানি, মণ্ডপের ভিড়—এই চেনা ছবির বাইরে গিয়েও শারদোৎসব হতে পারে। তারই নজির পশ্চিমবঙ্গের সাঁকরাইলের পাথরকাটি গ্রামের পিতলকাটি জয়চণ্ডী মন্দির।
এখানে নেই দুর্গার কোনও প্রতিমা। নেই মৃৎশিল্পীর তুলির টানও। মন্দিরে থাকা একটি পাথরই দেবী জয়চণ্ডী হিসেবে পূজিত। শারদীয়ার সময়ে সেই দেবীকেই দুর্গারূপে আরাধনা করেন লোধা-শবর সম্প্রদায়ের মানুষ। ঢাক বাজে, পুজোর আচার হয়, ভক্তের ভিড়ও হয়। তিন দিনের মেলাতেও মুখর হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর।
বছরের ৩৬৫ দিন দেবীর নিত্যপুজোর দায়িত্বও লোধা-শবর সমাজের মানুষের হাতেই। ফলে পাথরকাটির শারদোৎসবে প্রতিমার অনুপস্থিতিই যেন হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
মন্দিরের সঙ্গে লোধা-শবর সমাজের যোগাযোগ নিয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন লোকবিশ্বাস। স্থানীয়দের কথায়, কয়েকশো বছর আগে রাম লোধা গভীর জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিলেন। ঝাড়গ্রাম জেলার লোকসংস্কৃতি ও লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক কিংবদন্তি পুরুষ এই রাম লোধা। ওই সম্প্রদায়ের কাছে তিনি রাজা হিসেবেও পরিচিত। সেই জঙ্গলেই তিনি দেবী জয়চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। অতঃপর, এলাকায় ফিরে এসে সেই নির্দেশ মেনেই শুরু হয় দেবীর আরাধনা। বংশপরম্পরায় সেই রীতিনীতি মেনেই পুজো হয়ে আসছে।
রাম লোধার বর্তমান প্রজন্ম এই মুহূর্তে পুজোর সঙ্গে যুক্ত। বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরও তৈরি হয়। মন্দির ঘিরে রাজা ও তাঁর হারিয়ে যাওয়া মহিষের একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে।
কথিত আছে, রাজার একটি প্রিয় মহিষ হারিয়ে গিয়েছিল। সেটিকে খুঁজে পাওয়ার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। সেই প্রার্থনার পরেই মহিষ ফিরে এসেছিল বলে বিশ্বাস। পরে জঙ্গলের ওই অংশ পরিষ্কার করে মন্দির তৈরি করা হয়। এখন ওই মন্দির মার্বেল দিয়ে নবনির্মিত হয়েছে। সেখানেই অধিষ্ঠিত দেবী।
দুর্গাপুজোর সময় তিন দিন বিশেষ পুজো হয় এই মন্দিরে। অষ্টমীতে বলির রীতি আজও রয়েছে। এছাড়াও নানা লোকায়ত আচার পালিত হয়। ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকেও ভক্তরা পুজো দেখতে ও মেলায় হাজির হন। শোনা যায় দেবীর কাছে মানত করলে কেউ ফেরে না। দেবী সেই মানত পূরণ করেন। এমন বিশ্বাসও বহু বছর ধরে প্রচলিত বাসিন্দাদের মধ্যে।
মন্দিরের পুরোহিত শিশির প্রামাণিক বললেন, ‘পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই জয়চণ্ডী মায়ের পুজো চলে আসছে। সেই পরম্পরাই আমরা ধরে রেখেছি।’ সেই হিসেবেই এবারও পুজোর আয়োজন শুরু হচ্ছে।