অনলাইন ডেস্ক, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেওয়া বিভিন্ন আর্থিক অনুদান ও ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইমাম, মোয়াজ্জেম এবং পুরোহিতদের জন্য চালু থাকা মাসিক ভাতাও বন্ধ হতে চলেছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
এই নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিতর্কিত ও আলোচিত সাহিত্যিক Taslima Nasrin। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব তসলিমা মনে করেন, রাষ্ট্রের উচিত ধর্ম থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “ধর্মীয় ভাতা কেবল অর্থ সাহায্য নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা।” যদিও এই মন্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি সূত্র এখনও সামনে আসেনি, তবে সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন আলোচনায় বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তসলিমার কথায়, “ধর্ম কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, রাজনৈতিক অস্ত্রও। ধর্মীয় ভাতা মানে কেবল অর্থ সাহায্য নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। আজ ইমাম, কাল পুরোহিত, পরশু অন্য ধর্মের নেতা – এভাবে রাষ্ট্র সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থদাতা হয়ে ওঠে। তখন রাজনীতি আর ধর্মের দূরত্ব কমতে থাকে। ভোটব্যাঙ্কের হিসেব ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রনীতিতে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সব ধর্মকে সমানভাবে খুশি রাখা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্ম থেকে রাষ্ট্র পৃথক থাকবে। রাষ্ট্র নাগরিকদের দেখবে, তাদের ধর্মকে নয়। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কেউ নমাজ পড়বেন, কেউ পুজো করবেন, কেউ কিছুই মানবেন না – এটি ব্যক্তি স্বাধীনতা। কিন্তু সেই বিশ্বাসের অর্থনৈতিক দায় রাষ্ট্র কেন নেবে? রাষ্ট্রের টাকায় ধর্মীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না।” আর কী বলছেন তসলিমা, নিচের লিঙ্কে দেখুন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ জুন থেকে ধর্মীয় শ্রেণিভিত্তিক এই ধরনের আর্থিক সহায়তা আর চালু থাকবে না। রাজ্য বিজেপির সভাপতি Samik Bhattacharya এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, সংবিধান ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যের অনুমতি দেয় না এবং সরকার কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়, সমগ্র রাজ্যের মানুষের জন্য কাজ করবে। তাঁর বক্তব্য, পুরোহিত বা ইমাম সমাজের অংশ হলেও তাঁদের জন্য আলাদা ধর্মীয় ভাতা না রেখে সাধারণ সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পের আওতায় আনা উচিত।
পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ও মোয়াজ্জেম ভাতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১২ সালে রাজ্য সরকার ইমামদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করেছিল। পরে মোয়াজ্জেমদের জন্যও অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের হয় এবং ২০১৩ সালে Calcutta High Court সরকারি তহবিল থেকে ধর্মীয় পদাধিকারীদের ভাতা দেওয়াকে অসাংবিধানিক বলে পর্যবেক্ষণ করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজ্য সরকার একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে সামনে আনতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের “তুষ্টিকরণ রাজনীতি” অভিযোগেরও জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিরোধী শিবিরের অন্য অংশের দাবি, এই পদক্ষেপে বহু নিম্নআয়ের ধর্মীয় কর্মী আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি রাজ্যের ধর্ম, রাজনীতি এবং সংবিধানিক নীতিকে ঘিরে নতুন বিতর্কেরও সূচনা করেছে।