‘দ্য ওডিসি’— গ্রিক মহাকাব্যকে সমসময়ের প্রেক্ষিতে দেখলেন নোলান

সুদর্শনা চক্রবর্তী

মহাকাব্যিক! বলা কি যায় ক্রিস্টোফার নোলান-এর ‘দ্য ওডিসি’-কে? চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক বড়। এবং নোলান বলেই আপামর দর্শক, নোলান-অনুরাগী এবং সমালোচকদের মধ্যে উৎসাহ ও কৌতূহল ছিল আকাশছোঁয়া। নোলান বলেই ওডিসিয়াস-এর যাত্রা কতটা সিনেম্যাটিক হয়ে উঠছে, কতটা শ্বাসরূদ্ধ হয়ে উঠছে সেই সব নিয়েই উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়েছে। ওপেনহাইমার-এর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক গুরুত্বের পরেই ক্রিস্টোফার নোলান-এর মহাকাব্যের প্রতি এহেন টান যতটা অবাক করেছিল সকলকে, ততটাই বোধহয় অপেক্ষাও করিয়েছিল। নোলান-এর সিনেমাটি মহাকাব্যের পরিধিকে স্পর্শ করতে পারল কি না তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা নিশ্চিত আলোচনা করবেন, তবে এই সিনেমাটি নিঃসন্দেহে মহাকাব্যকে সিনেমার প্রেক্ষিতে কীভাবে দেখা যেতে পারে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার পরিসর খুলে দিল।
ক্রিস্টোফার নোলান-এর সিনেমা মানে পরীক্ষা-নীরিক্ষা শুধু নয়, এর অর্থ এক ধরনের গভীরতর দর্শনের দিকেও দর্শকদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। তাই তার সিনেমায় ওডিসিয়াস-এর গন্তব্যে পৌঁছানোর থেকেও তার যাত্রাপথটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কখন যেন ওডিসিয়াস মহাকাব্যের সময় পেরিয়ে চলে আসেন আমাদের সম সময়ে, কিছুটা আগে কিংবা পরে। যেন বব ডিলান-এর গানের শব্দেরা উড়ে বেড়ায় নিজের দেশে, নিজের প্রাসাদে, নিজের রাজত্বে ফিরে আসার পথ নিজের মতো করে খুঁজে নিতে চাওয়া ওডিসিয়াস যখন পথ হারিয়ে ফেলেন বারেবারে। “হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন/বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান?” পথিক, পুরুষ হয়ে ওঠার জন্য সত্যিই ঠিক কতটা পেরিয়ে আসা যায়?
না কি ফেরা যায়? ফিরব বললেই ফেরা যায় না কি? ওডিসিয়াস তো জানত, সে পেরিয়েছে দেশ-কাল। তবু সে পারেনি পুরুষের অহং ছেড়ে দিতে। যে পুরুষ পথের নির্দেশ নিজেই স্থির করতে চায়। যে দীর্ঘ ১০ বছর ট্রয়-এর যুদ্ধে দেশ, রাজত্ব, রাজ সিংহাসন, প্রিয়তমা স্ত্রী, কোলের সন্তান ফেলে রেখে যুদ্ধজয়ের অন্যতম কারিগর হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধশেষে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে সোজা ফিরে আসে না। পৃথিবীর আরও বিস্ময় চোখের সামনে দেখতে চায়। তাই শুরু করেন নতুন অভিযান। দেবতার সঙ্গে তার এক আশ্চর্য সম্পর্ক। তাদের অস্তিত্ব আছে না নেই সেই দোটানায় দ্বিধাবিভক্ত ওডিসিয়াস। নোলান-এর ওডিসিয়াস মহাকাব্যের কাল্পনিক নায়ক চরিত্র যত না, তারচেয়ে অনেক বেশি রক্তমাংসের চরিত্র।
নোলান তার সব সিনেমার মতোই, এই সিনেমাতেও লার্জার দ্যান লাইফ করার পাশাপাশি মুখ্য চরিত্রগুলিকে অনেক বেশি মানবিক করে তুলতে চেয়েছেন। চেয়েছেন তাদের মনস্তত্ত্বের জটিল থেকে জটিলতর পরতগুলিকে একটু একটু করে খুলতে। আর তা করতে করতেই কখন যেন ওডিসিয়াস থেকে পেনেলোপ, অ্যাগামেমনন থেকে টেলিম্যাকাস, হেলেন থেকে এথেনা— সকলকেই দর্শকেরা কখন যেন মহাকাব্যের পাতা থেকে নিজেদের আশেপাশের মানুষ অথবা নিজেদেরই প্রতিফলন বলে ভাবতে শুরু করেন। যুদ্ধ ও প্রেমে সবই ন্যায্য এই ভাবনাকেই যেন নোলান-এর ওডিসিয়াস প্রশ্নের মুখে ফেলে দেন। টোজান হর্স, যার ভেতরে লুকিয়ে গ্রিক যোদ্ধারা ট্রয়-এ প্রবেশ করেছিলেন, তার কাণ্ডারি ছিল গ্রিক রাজ্য ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস। বীর যোদ্ধা, অভিযাত্রী, সাহসী প্রেমিক।
নোলান-এর ওডিসিয়াস অনেক বেশি মানবিক হয়ে ওঠেন তখনই, যখন ১০ বছর যুদ্ধ করার পর, ট্রোজান হর্স বা সেই বিরাটাকার কাঠের ঘোড়ার মধ্যে করে ট্রয়-এর ভেতরে প্রবেশ করার পর, যখন এক রাত্রির মধ্যে সে দেখতে পায়, কীভাবে গ্রিক সৈন্যরা বিধ্বংসী আক্রমণে ট্রয়-এর পতন ঘটাচ্ছে। দেবী এথেনা-র মূর্তির মাথা কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ বলা হয়েছিল এই ঘোড়াটি দেবী এথেনা-র প্রতি গ্রিক-দের উপহার। সে যোদ্ধা হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে করতেই ভাবতে থাকে, তাঁদের বিশ্বাসকে কীভাবে ধ্বংস করে দিল গ্রিকরা। এবং তার অন্যতম নেতা তিনিই। এক অদ্ভূত অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরতে থাকে। অথচ কোনওভাবেই তা গ্রিক বীরের চরিত্রের সঙ্গে মেলে না, তা অনেক বাস্তব।
নোলান-এর ওডিসি নিয়ে অবশ্য ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের মতামত তৈরি হতে থাকে। যেখানে দেখা যায় টেলিম্যাকাস, ওডিসিয়াস-কে ‘ফাদার’ সম্বোধন না করে ‘ড্যাডি’ বলছে! সংলাপে এহেন নতুন আঙ্গিক দেখে শাস্ত্রীয় মহাকাব্যের গুণগ্রাহীরা যারপরনাই অবাক ও বিরক্ত হয়েছিলেন। তবে নোলান-এর সিনেমার গুণমুগ্ধরা এর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন এক ভিন্ন ধরনের ট্যুইস্ট। এরফলেই আরও বেশি করে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। যে ধরনের যুদ্ধদৃশ্য তারা আশা করেছিলেন, তা অবশ্য পূরণ হওয়ার নয়। কারণ একেবারেই নোলান-এর সিনেমার চরিত্রানুযায়ী যতটা সিনেম্যাটিক বিল্ড-আপ বা ধীরে ধীরে নির্মাণ হয়, ততটা যুদ্ধ-লড়াই দেখানোয় বিশ্বাসী নন তিনি। বরং যে মানসিকতা কাজ করে, যে দর্শন কাজ করে এই কাজের পেছনে তা দেখাতে আগ্রহী তিনি অনেক বেশি।
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাই জরুরি হয়ে ওঠে। যে কারণে যে বাবা-র স্মৃতি পর্যন্ত তৈরি হয়নি যে টেলিম্যাকাস-এর সেই ছেলেই বাবাকে খুঁজে বের করার জন্য যাত্রা করে, তার বিরহী মা-কে বিয়ে করার জন্য উদ্গ্রীব পুরুষদের এই বলেই ঠেকিয়ে রাখে যে, তার ‘ড্যাডি’ ফিরে আসবে, আসবেই। এবং অসংখ্য অভিযানের পর, দেবতাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে করতে, তাতে উত্তীর্ণ হতে হতে, নিজের প্রিয় সেনাসঙ্গীদের হারিয়ে যখন ওডিসিয়াস শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে, তার প্রথম মোলাকাত হয় নিজের ছেলের সঙ্গেই। পরিচয় প্রকাশ করতে হয় না, বাবার সম্পর্কে শোনা গল্প দিয়েই টেলিম্যাকাস চিনে নেয় নিজের ‘ড্যাডি’-কে। বাবা-ছেলের দেখা হয় সিনেমার ক্লাইম্যাক্স-এ।
নোলান-এর সিনেমায় অন্তর্ভুক্তির এক ভিন্ন চেহারা দেখা যায়। শুধু চরিত্রর অভিনেতাদের নির্বাচনেই নয়, যেভাবে চরিত্রদের দেখানো হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিস্মিত করে দেওয়ার মতোই। এই সিনেমায় হেলেন অফ ট্রয়— কৃষ্ণাঙ্গী। যদিও তারজন্য কোনও ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কারণ দেখানো হয়নি। এবং এই চরিত্রের পর্দা উপস্থিতির সময়ও খুবই কম। তাও আচমকা এই বদলের কোনও কার্যকারণ দেখানোর প্রয়োজন পরিচালক অনুভব করেননি। তেমনি ওডিসিয়াস-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিনেতাদের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করানোর মধ্যে দিয়ে অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিতে চাইলেও, তারমধ্যে দিয়ে মহাকাব্যের মধ্যে কোন ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন পরিচালক তা সঠিক বোঝানো যায়নি। হয়তো এইটুকু কুয়াশার পর্দা পরিচালক রাখতে চেয়েছিলেন, সেই কারণেই নোলান ব্যতিক্রমী।
পেনেলোপ-এর চরিত্রে অ্যানা হ্যাথওয়ে আবারও তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়টি করেছেন। একইসঙ্গে তিনি স্বামীর জন্য এক অভূতপূর্ব অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে শুরু করেন, সেইসঙ্গে যে পুরুষেরা ইথাকা দখল করার জন্য তাকে বিয়ে করতে উৎসাহী হয়েছিলেন, তাদের আটকে রাখা, ছেলে টেলিম্যাকাসকে বাবার সম্পর্কে বোঝাতে থাকা এক শক্তিশালী নারী চরিত্র। এথেনা-র চরিত্রে জেনডায়া। শান্ত, স্নিগ্ধ, অনেকটা যেন ওডিসিয়াস-এর বিবেক। এখানেও নোলান চলচ্চিত্রের জন্য কিছুটা স্বাধীনতা নিয়েছেন। এথেনা ছাড়াও অ্যাগামেমনন-এর কিশোরী কন্যা, ট্রয়-এর রাজকুমারী সবক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ চমকের মতো ফিরে ফিরে আসতে থাকে জেনডায়ার মুখ। এথেনা দেবী। কিন্তু এথেনা নারী। সেই নারীকেই যেন ফিরে আসতে দেখি এথেনার মধ্যে, ওডিসিয়াস-এর নীতির কম্পাস হিসাবে, নানা মুহূর্তে। যেমন আরেক নারী জাদু জানা সার্সেই। পুরুষদের যে ভেড়া বানিয়ে দিত। এখানে যদিও সে আরও নানা পশু বানিয়ে দেয়। ওডিসিয়াস-এর সেনাদের যখন তার অনুরোধে আবার মানুষ শরীরে ফিরিয়ে আনছেন, তখন মন্ত্র বলতে থাকে— তোমাদের ছদ্মবেশে ফিরে এসো। পুরুষতন্ত্রের বিরূদ্ধে এ এক উচ্চারণ, যেখানে পুরুষ শরীর ছদ্মবেশ মাত্র। অথচ তাকে ডাইনি বলে মেরে ফেলার কথা যখন বলে ওডিসিয়াস-এর সেনারা, সে কথা শোনে না ইথাকার রাজা। একজন নারীর পুরুষদের থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কাছে।
টেলিম্যাকাস-এর চরিত্রে টম হল্যান্ড প্রমাণ করলেন অভিনেতা হিসাবে তিনি ক্রমশ পরিণত হচ্ছেন। কিছুটা কিশোর সুলভ সারল্য অথচ গ্রিক যোদ্ধার দৃঢ়তা, বাবার প্রতি অপরিসীম আস্থা ও শ্রদ্ধা তিনি চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। রবার্ট প্যাটিনসন, এলিয়ট পেক, হিমেশ প্যাটেল— তাদের চরিত্রে সুযোগ্য অভিনয় করেছেন।
ওডিসিয়াস চরিত্রে ম্যাট ডেমন-কে নির্বাচন করে সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছেন নোলান। নিজেদের এতদিনের করা সমস্ত চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে ওডিসিয়াস হয়ে ওঠার সর্বতো চেষ্টা করেছেন ম্যাট ডেমন। সেভিং প্রাইভেট রায়ান থেকে বোর্ন আইডেন্টিটি পেরিয়ে সে যাত্রা সহজ ছিল না। মহাকাব্যের গ্রিক নায়ক সম্পূর্ণ হয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব নয়, তবে অবশ্যই এ তার আজীবন মনে রাখার মতো চরিত্র হয়ে উঠল।
টোজান হর্স-এর বিরাট ছবি দিয়ে সিনেমা শুরু। যা বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। সিনেমা শেষ হয় আননোন ওয়েস্ট, অজানা পশ্চিমে পেনেলোপ-কে নিয়ে সূর্যাস্তর পিছূ পিছু ওডিসিয়াস-এর যাত্রা দিয়ে, যেখানে মৃত সৈনিকদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানাবেন, তাদের আত্মাকে মুক্তি দেবেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত আজকের পৃথিবীতে এই সিনেমার শুরু আর শেষ ক্রিস্টোফার নোলান-এর চোখ দিয়ে দেখা যাক। ওডিসিয়াস-এর শেষ না হওয়া যাত্রার সঙ্গে মিলে যাক— “হাউ মেনি টাইমস মাস্ট দ্য ক্যাননবলস ফ্লাই/বিফোর দে আর ফরএভার ব্যানড?”

Sumit Chakraborty: