লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে দু’দশক পরে ফিরলেন তসলিমা

কলকাতা, ৩১ জুলাই : ‘আজি এ প্রভাতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিলাম।’ শুক্রবার সকালে সমাজ মাধ্যমে এই একটি মাত্র বাক্য লিখে দীর্ঘ দু’দশকের প্রবাস ও নির্বাসন ভঙ্গের বার্তা দিলেন ‘বিতর্কিত’ সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। প্রায় দু’দশক পর ফের নিজের অতীব প্রিয় ‘স্মৃতির শহর’ কলকাতায় পা রাখলেন তিনি। পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি, চোখে কালো সানগ্লাস। ফিরলেন সেই সব চেনা মানুষের দীর্ঘ ছায়ার কাছে, যাঁদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। ফিরলেন হেঁশেল থেকে ভেসে আসা চেনা মশলার সুবাসের টানে, যা একদা পরবাসেও তাঁকে স্বদেশের অনুভূতি দিত। শুক্রবার বেলা ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। শঙ্খ, উলুধ্বনিতে স্বাগত জানানো হয় তাঁকে। তিলোত্তমায় পা রেখে আবেগে ভাসলেন তসলিমা। হাসিমুখে বললেন, ‘খুবই ভালো লাগছে।’

১ আগস্ট (শনিবার) কলকাতার রবীন্দ্র সদনের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন লেখিকা। তাঁর এই ‘ঘরে ফেরা’র আবহেই প্রেক্ষাগৃহে পুনরায় মুক্তি পাচ্ছে তাঁকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘নির্বাসিত’। সাহিত্যিকের এই প্রত্যাবর্তনে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছবির পরিচালক চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়। হিন্দি চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত সংলাপের মতোই বলা চলে, ‘বিশ সাল বাদ’! আক্ষরিক অর্থেই প্রায় ২০ বছর পর আবার পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পা রাখলেন তসলিমা। শনিবার রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা তসলিমার। আয়োজক সেক্যুলার মিশন, এইচআরবিএফএফ। সেই মঞ্চে থাকতে পারেন খোদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।

গত ২০০৭ সালে তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের প্রকাশ ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর আগুনঝরা কলমের ‘খোঁচা’য় সংখ্যালঘু এলাকাগুলিতে অশান্তি ছড়ায়। এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি যে তা সামলাতে সেনা নামাতে হয়েছিল। সে সময় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর নিজস্ব বৃত্তের অর্থাৎ বামমনস্ক সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তসলিমার বইটিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কলকাতা ছাড়তে বলা হয় তাঁকে। যে বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ বলে গর্ববোধ করে, সেই সরকারের আমলে এমন এক নিদর্শন নিঃসন্দেহে বাংলার সাহিত্য জগতে অন্ধকারময় অধ্যায়।

পরবর্তীতে ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও, তসলিমার ক্ষেত্রে এই ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’ বহাল রেখেছিল তৎকালীন শাসকদল। অবশেষে দীর্ঘ সময় পার করে রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনের পট-পরিবর্তনে ফের কলকাতায় এলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে এক আলোকময় অধ্যায়ের সূচনা হল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য ও চিন্তাভাবনা বরাবরই ছিল আপসহীন। ইসলাম ধর্মের রক্ষণশীলতার কড়া সমালোচনা এবং নারী স্বাধীনতার সপক্ষে তাঁর সোচ্চার উপস্থিতি বারবারই ধর্মীয় মৌলবাদীদের ‘চোখের বালি’ করে তুলেছিল তাঁকে। তাঁর লেখাকে কেন্দ্র করে একাধিকবার কলকাতার রাজপথে আছড়ে পড়েছে প্রতিবাদের ক্ষোভ। আর সেই ক্ষোভের আগুন নেভানোর তাগিদে রাজ্য প্রশাসনকে বরাবরই চরম রক্ষণাত্মক ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল।

Sumit Chakraborty: