গল্প : কথোপকথন

নন্দিতা ভট্টাচার্য্য (চক্রবর্তী)


–বুঝলেন মশাই আজ্ঞে
–বলছি যে আজ্ঞে না।
–কী? কিছু না।
–কিছু না মানে? মানে কিছুই বুঝিনি।
–আহা বোঝা না বোঝার মতো হলোটা কী! ওই যে আপনি বললেন
–কী মুশকিল! আমি তো কিছুই বলিনি মশাই। আরে, ওই যে বললেন
–কী বললাম? সেটাই। বলেননি তো
–তাই তো। বলিনি তো কিছু। আমিও তো তাই বলছি যে
–আপনি বলবেন? আমি বললাম না এখনও, আর আপনি বলবেন? এটা কীরকম কথা হলো মশাই?

–আরে না না – আমি সেকথা বলছি না তো।
–কী আশ্চর্য! একথা সেকথার মানে কী? এই বলছেন বলছি, এই বলছেন বলছি না, মাথাটাই গেল নাকি? ––মাথা! এর মধ্যে মাথা আসছে কোত্থেকে! দেখুন মশাই, মঙ্গলবারে আমরা নিরামিষ খাই। পিওর ভেজ। গিন্নির কড়া নিষেধ আছে। ওই মাথা-টাথা বলবেন না কিন্তু।
–ধুত্তেরি – নিকুচি করেছে মাথার। আমি কি আপনাকে মাছের মুড়ো খাওয়াচ্ছি নাকি মশাই, যে আপনি গিন্নির ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে? তবে পাকা রুইয়ের মাথা দিয়ে লাউঘন্ট, সে বড় চমৎকার হয়। আর ওই একটু ধনেপাতা থাকলে তো কথাই নেই। আমার গিন্নি আবার ওটা বেশ ভালো করে।

–আর বলবেন না মশাই, আর বলবেন না। ওটা আমারও খুব প্রিয়। তবে আজ কিনা মঙ্গলবার, গিন্নি যদি জানতে পারে – মানে ওই বুঝলেন কিনা
–আপনি তো বেজায় ভীতু লোক দেখছি। গিন্নির ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো। আমার আবার কেস এত খারাপ নয়। হ্যাঁ, মিটিং-মিছিলে যাওয়া একেবারে নিষেধ। তাসের আড্ডা চলবে না। মিষ্টিটা লুকিয়েই খেতে হয়। বন্ধুবান্ধবকেও বাড়িতে ডাকতে পারি না, গল্পগুজব করবার জন্য। মানে ওইগুলো একটু সামলে নিতে পারলে মোটামুটি আর ভয় না পেলেও চলে।

–বাহ্, বেশ বেশ। দারুণ সাহসী লোক তো আপনি! তবে দেখুন, গিন্নিকে এসবে জড়াবেন না। ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।
–ভালো হবে না! কী হবে শুনি?

–অনেক কিছুই হতে পারে। আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলে অনেক কিছু হতে পারে।
–এঃ – মেজাজ দেখাচ্ছেন? মেজাজ দেখাবেন না, মেজাজ দেখাবেন না কেন দেখাব না শুনি?
–কেন দেখাবেন শুনি?

–আমার ইচ্ছে তাই।
–ও আচ্ছা। আপনার ইচ্ছে হলেই আপনি মেজাজ দেখাবেন?

–একশো বার দেখাব।
–আচ্ছা – আপনার ইচ্ছে হলেই আপনি মেজাজ দেখাবেন, আপনার ইচ্ছে হলেই আপনি

–না না না। আমি আর কোনো ইচ্ছের কথা তো বলিনি।
–বলেননি, কিন্তু বলতে কতক্ষণ?

–আজ্ঞে না। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে আপনার সঙ্গে শেয়ার করবার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।
–আচ্ছা আচ্ছা – শেয়ার মার্কেটের অবস্থা খারাপ তো, তাই ‘শেয়ার’ই মাথায় ঘুরছে। হে হে হে, খুব টাকা ঢেলেছেন মনে হচ্ছে।

–আমার টাকা আমি যেখানে খুশি ঢালব, তাতে আপনার কী মশাই? আপনাকে কৈফিয়ত দিতে যাব কেন? তবে যা বলেছেন, শেয়ার মার্কেটের অবস্থা বড় খারাপ। ওই যুদ্ধ যুদ্ধ করে কখন যে কী হয়! কিন্তু আপনি তো সাংঘাতিক গায়ে-পড়া লোক মশাই। আমার মাথাটা দিয়েছেন গুবলেট করে। যাচ্ছিলাম মার্কেটে গিন্নির ফরমায়েশি জিনিস আনতে। এখন তো বেমালুম ভুলে গেছি কী আনতে হবে।
–কোনো সমস্যা নেই। কোনো সমস্যা নেই।

–সমস্যা নেই মানে! তালেগোলে বারোটা বাজিয়ে এখন বলছেন সমস্যা নেই? গিন্নির ফরমায়েশ। না নিয়ে গেলে বাড়িতে ঢুকতে পারব?
–আরে মশাই, সেটাই তো বলছিলাম আপনাকে। ব্যাগ হাতে যে চলেছেন, আজ দুর্গা চৌমুহনী বাজার বন্ধ।

–এ্যাঁ
_আজ্ঞে হ্যাঁ। এক ব্যবসায়ী মারা যাওয়াতে বাজার বন্ধ। সেটাই তো বলছিলাম আপনাকে। মিছিমিছি আমার কতটা সময় নষ্ট হয়ে গেল। এখন আবার গিন্নিকে গিয়ে কৈফিয়ত দিতে হবে। যত্তসব!

Sumit Chakraborty: