পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত। বিজেপি এই প্রথম বাংলায় একজন মুখ্যমন্ত্রী পাচ্ছেন।তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বারো বছর ধরে যে কুশলী শাসন চালিয়ে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, এর পরেও দক্ষিণী রাজ্যে কোন দবদবা দেখাতে পারলেন না এইবারও। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে আসাম বরাবরের মতো বিজেপিরই রইলো, আগের মতোই পুদুচেরিতে ক্ষমতায় ফিরলো এনডিএ জোট। বাড়তি প্রাপ্তি, বলা যায় বিশাল প্রাপ্তি হল পশ্চিম বাংলা। এর বাইরে কেরলে প্রত্যাশিতভাবে ফিরল কংগ্রেস। তামিলনাডুতে ক্ষমতার পালাবদল হল মারাত্মক চেহারায়, কিন্তু তাতে বিজেপির কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। নতুন আঞ্চলিক দল টিভিকে ক্ষমতায় এলো ডিএমকে কে হটিয়ে। তিন তিনটি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন-এর নেতৃত্বাধীন ডিএমকে উড়ে গেল ঝড়ের তোড়ে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এতো তীব্র যে স্ট্যালিন নিজেই হেরে গেলেন।
পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল যেসব কারণে দেশীয় রাজনীতিতে ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হল, বামেদের শূন্য দশা। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার পর শুধু কেরলেই সরকার ছিল বামেদের। এবার তাও মুছে গেল। কেরলের শাসন ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। সেই দিক থেকে এই নির্বাচনে সব চেয়ে লাভবান বিজেপি। প্রথমত তারা গত ১২ বছর ধরেই বাংলায় সরকার গড়ার সলতে পাকিয়ে আসছিল, কিন্তু কোনভাবেই তা আর হয়ে উঠেনি। এইবার তারা বিশাল জয় পেলেন। এই জয় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মোদি এবং শাহ নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে আলাদা অক্সিজেন দেবে। সদ্য সংসদের অধিবেশনে মহিলা বিল পাস করানো নিয়ে বিরোধী দলগুলির এককাট্টা বিরোধিতায় পিছিয়ে আসতে হয়েছে মোদি সরকারকে। দিল্লিতে মোদি সরকারের আমলে এই প্রথম তারা কোনও বিল পাস করাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। পশ্চিম বাংলার জয় এই পরিস্থিতিতে দলের শক্তি ও অবস্থান আরও সংহত করবে।
দ্বিতীয়ত, জনসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলায় বিজেপির শক্তিহীনতা দলের জন্য এক পরিতাপের বিষয় হয়ে উঠেছিল। সেই দুর্বলতা কাটাতে বিজেপি প্রথম থেকেই কুশলী ভূমিকা নেয়। ২০২১ বিধানসভায় সন্তোষজনক সংখ্যায় আসনলাভবিজেপিকে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। তারা বুঝেছিলেন, বাংলায় ক্ষমতা দখল অসম্ভব নয়। ফলে ২০২৬ এর নির্বাচনে মোদি শাহকে বিশাল সময় ধরে মাঠে পড়ে থাকতে দেখা গেল। এবং তারা তার সুফল পেলেন হাতেনাতে। বাঙলার মানুষ উজাড় করে বিজেপিকে সমর্থন জানালেন। বিশাল জয় এবার বিজেপিকে বিশাল দায়দায়িত্বের মুখোমুখি করে দিয়েছে। কারণ বাঙলার মানুষকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনেকগুলি, এবার তা পালনের সময় সামনে আসছে। মহিলাদের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা সামাজিক ভাতা, বয়স্কদের মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা প্রদান, বিনামূল্যে বছরে ছয়টি রান্নার গ্যাস,বিনামূল্যে বিদ্যুত ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কাজগুলি নিঃসন্দেহে বিশাল কাজ।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফল জানা না গেলেও বাংলা ও দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, তৃণমূলের দিদির শাসনের অবসান ঘটছে, নরেন্দ্র মোদির দল গড়তে যাচ্ছে সরকার। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি ২০২১ সালের নির্বাচনেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করেছিল। পদ্ম না ফুটলেও, বিধানসভায় আসনসংখ্যা তিন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭৭। এর পরেই প্রত্যাশা ১৮৫টির বেশি আসনের। সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে দলটি। এই ফলাফলে বিজেপি নেতৃত্বও কম বিস্মিত নন। অভাবনীয় এই জয়ের পেছনে বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, মহিলা ভোট: কেন্দ্রে এনডিএ সরকারের মহিলা সংরক্ষণ বিলের উদ্যোগ মহিলা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিরোধী দলগুলো ‘নারীবিরোধী’- বিজেপির এমন প্রচার সাধারণ মানুষের মনে সাড়া ফেলে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, বাংলায় বিজেপির পক্ষে নারী ভোট অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান।
দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মীদের মন জয়ঃ বিজেপি সরকারি কর্মচারীদের ‘অধিকার হরণের’ অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ কাজে লাগিয়েছে। ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর এবং শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করেছে। এটি প্রায় ২০ থেকে ৫০ লক্ষ ভোটারের ওপর প্রভাব ফেলে। উল্লেখ্য, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিজীবী ভোটারের সংখ্যা বেশি। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় প্রকল্প: মোদি বনাম মমতা প্রচারই এবারের নির্বাচনে বাজিমাত করেছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়া এবং পরিকাঠামোর অভাবকে হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদির বাংলায় এক ডজনের বেশি জনসভার প্রতিশ্রুতিগুলি মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের (১.৩১ কোটি ভোটার) ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।
চতুর্থত, নিরাপত্তা, বাহিনী মোতায়েন ও সরকারবিরোধী ক্ষোভঃ রাজনৈতিক হিংসাপ্রবণ এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন সাধারণ ভোটারদের মনে সাহস জুগিয়েছে। তাছাড়া আর জি কর কাণ্ডসহ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রচার শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিরলস প্রচারও ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পঞ্চমত, ভোটার তালিকা সংশোধন ও বহিরাগত ইস্যুঃ ভোটার তালিকা থেকে ‘বহিরাগত’ বা ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি সফলতা এখানে কাজ করেছে। যৌক্তিক অসংগতির ভিত্তিতে ২৭ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়ে ভোটার তালিকা থেকে। ভোটার তালিকা স্বচ্ছ করতে বিজেপির এই প্রচারও ভোটে প্রভাব ফেলেছে। সব মিলিয়ে মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় মানচিত্রে গেরুয়া রঙয়ের প্রভাব আরও বাড়লো, যা আগামীর জাতীয় রাজনীতিতে মোদি শাহকে আলাদা মাইলেজ দেবে।