কলকাতা, ৪ মে- দেড় দশক পরে ফের পরিবর্তনের ঝড় বাংলায়। এবার জোড়াফুল বদলে বাংলায় ফুটল পদ্মফুল। অর্থাৎ এবার পদ্মাসনে বাংলা। খবরটি লেখা পর্যন্ত বিজেপি ২০৫ টি আসনে এগিয়ে (কোনও কোনও আসনে জয়ী) এবং ৮২ টি আসনে এগিয়ে তৃণমূল। বাংলায় এই গেরুয়া ঝড়ের পরে সমাজমাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী লিখলেন, এই ফল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আস্থার প্রতিফলন। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ বিজেপির হাতে আসায় এবার প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন হবে।
গত বছরের আগস্টে রাজ্যে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দমদমেন সেন্ট্রাল জেল ময়দানের সভা থেকে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘শ্যামাপ্রসাদের বাংলা বানাব।’ তার প্রায় আট মাস পরে বাংলায় পদ্ম ফুটল। এদিন জয়ের পরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এবার শ্যামাপ্রসাদের বাংলা গড়তে পারব।’ ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জনসংঘ। সেটাই আজকের বিজেপির ভিত্তিপ্রস্তর। আর তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় ‘বিজেপির জনক’। সেই মানুষটির স্বপ্নই যেন পূরণ করলেন মোদি-শাহ। বিজেপি একের পর এক আসনে এগিয়ে যাওয়ার পরেই বার্তা দেন ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সাংসদ বিপ্লব দেব। তিনি বলেন, আমি কখনও হারতে আসিনি। বাংলায় যখন এসেছি তখন বাংলায় জিতেই যাব।
বিজেপির এই বিপুল জয়ের পরে এক্স হ্যান্ডেলে মোদি লিখলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া সুনামি। প্রায় ২০০ আসনে এগিয়ে বিজেপি। এনিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লিখলেন, ‘বাংলা ফুটল পদ্ম। এই নির্বাচন ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। জনতাই জয়ী। বিজেপির সুশাসন জিতল। বঙ্গের প্রত্যেক মানুষকে আমার প্রণাম। আমরা সমাজের সব স্তরে সুযোগ সুবিধা পৌঁছে দেব।’ ভবানীপুরে বেনজির দৃশ্যও চোখে পড়েছে! শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছে যান বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শ্যামাপ্রসাদের মূর্তিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন তিনি।
এদিন নজর ছিল নন্দীগ্রামের দিকে। আর সেই নন্দীগ্রামে ১৭ রাউন্ড শেষে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে ৫ হাজার ৭০০ ভোটে এগিয়ে যান। এই কেন্দ্রে মোট ১৮ রাউন্ড গণনা হয়। তবে ভবানীপুরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত এগিয়ে যান তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সন্ধের দিকে আবার পিছিয়ে যান মমতা। ফল প্রকাশ এই খবর করা পর্যন্ত বাকি রয়েছে। মমতা লোকভবনে যাবেন বলেও খবর এসেছে। সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্যই সেখানে যাবেন বলে জানা যায়। উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র এদিন গেরুয়া ঝড়। উত্তরবঙ্গে সিংহভাগ আসনে জয়ী বিজেপি। দক্ষিণবঙ্গ এবং রাঢ়বঙ্গেও বেসামাল তৃণমূল। রাজ্যের প্রায় ১৪ জন মন্ত্রী পিছিয়ে পড়েন। গণনার ট্রেন্ড যা বলছে, বাংলার মসনদে এবার মোদি-ম্যাজিকেই ফুটল পদ্ম। আর সেই ম্যাজিকে কার্যত ছু-মন্তর হয়ে গেল তৃণমূলের সাজানো সাম্রাজ্য।
এই ১৪ মন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন সুজিত বসু, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শ্রীকান্ত মাহাতো, মানসরঞ্জন ভুঁইয়া, উদয়ন গুহ প্রমুখরা। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম ভোট একতরফাভাবে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি, মুসলিম ভোটে ভাঙন ধরেছে, সেই কারণেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিক এলাকাতেও ভালো ফল করছে বিজেপি। প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিক জেলায় বিজেপির ফল মোটের উপর ভালোই। মালদহে ১২টির মধ্যে ৬টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। আর মুর্শিদাবাদে ২২টির মধ্যে ৮টিতে এগিয়ে রয়েছে তারা। পাশাপাশি উত্তর দিনাজপুরে ৯ টি আসনের মধ্যে ৪টি-তে এগিয়ে রয়েছে গেরুয়া শিবির। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে রাজ্যের হিন্দু ভোট এককাট্টা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম ভোট ভাগ হয়েছে। একতরফাভাবে তৃণমূল সেই ভোট পায়নি।
আবার কংগ্রেসকে তৃতীয় থেকে প্রথম করার লড়াইয়ে দ্বিতীয় বার নেমেছিলেন তিনি। ফল বলছে, সেই লড়াইয়ে ব্যর্থ অধীর চৌধুরী। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে পরাস্ত হলেন তিনি। সেখানে জিতেছেন বিজেপির সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্র। দু’বছর আগে লোকসভা ভোটে অন্য ছ’টি বিধানসভা আসনে পিছিয়ে থাকলেও এক মাত্র বহরমপুর বিধানসভায় ‘লিড’ ছিল অধীরের। এ বার তাঁর সেই দুর্গও ভেঙে পড়ল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বহরমপুরে কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী তৃতীয় হয়েছিলেন। এ বার অধীরের স্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়। তবে দু’টি আসনে এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস। তার মধ্যে একটি মালদহের মালতীপুর। সেখানে জয়ের দিকেই এগিয়ে গিয়েছেন মৌসম নূর। ডোমকল বিধানসভায় মুখরক্ষা বামেদের, সেখানে সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমান রানা জয়ী হয়েছেন। ভাঙড় বিধানসভায় পুনরায় জয় পেয়েছেন আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী। মুর্শিদাবাদের খড়গ্রামে ৫৬১১ ভোটে জয়ী হয় বিজেপি। মেদিনীপুরে ৩৮ হাজারের বেশি ভোটে জিতলেন বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর গুছাইত। দার্জিলিঙে বিজেপি প্রার্থী নোমান রাই জিতেছেন ছ’হাজার ভোটে। বড়ঞায় জিতেছেন সুখেনকুমার বাগদী, ব্যবধান ২২ হাজার। খড়দহে বিজেপির কল্যাণ চক্রবর্তী জিতেছেন ২৪ হাজার ভোটে। জামুরিয়ায় বিজেপির বিজন মুখোপাধ্যায় ২২ হাজার ভোটে জিতেছেন। কালিম্পঙে ২১ হাজার ভোটে জিতেছেন বিজেপির ভরতকুমার ছেত্রী।
বনগাঁর মতুয়াগড়ে এবারও বিজেপির জয়জয়কার। বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ, গাইঘাটা এলাকাতে জয় পেয়েছে বিজেপি। বাগদা কেন্দ্রে শেষপর্যন্ত জয়ের হাসি হাসলেন বিজেপি প্রার্থী সোমা ঠাকুর। এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী সোমারই ননদ মধুপর্ণা। আগের নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন মধুপর্ণা। এবার সেই কেন্দ্রে জয় পেল বিজেপি। কুড়ি রাউন্ড গণনার শেষে সোমা ঠাকুর ৩৪ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন।
এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছে তৃণমূল। এর মধ্যে কামারহাটী আসনে জয় পেয়েছেন মদন মিত্র, চৌরঙ্গী কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বালিগঞ্জে জিতেছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। আজ সকাল থেকেই কলকাতার মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির রাজ্য দপ্তরে সাজ সাজ রব ছিল। নির্বাচনী সভায় এসে ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদিন বিজেপির রাজ্য দপ্তরে সেই ঝালমুড়ি নিয়ে আসা হয়। সঙ্গে আসে মিষ্টি। আবার সল্টলেকে বিজেপি দপ্তরে মাছ-ভাত খেয়ে সেলিব্রেশন করা হয়।
সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে গণনাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন অভিষেক। সেখান থেকে তাকে বেরিয়ে যেতে বলে নির্বাচন কমিশন। কারণ, তিনি প্রার্থী নন। প্রার্থী বা এজেন্ট ছাড়া গণনাকেন্দ্রে কারও থাকার কথা নয়। আবার তাকে বাইরে ‘চোর’ স্লোগানও শুনতে হয়েছে। সাখাওয়াতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় কমিশন। মোবাইল নিয়ে গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি নেই। এই গণনাকেন্দ্রের বাইরে মমতাকেও চোর স্লোগান শুনতে হয়েছে। আবার ব্যারাকপুরের তৃণমূলপ্রার্থী রাজ চক্রবর্তীকে এদিন গণনাকেন্দ্রের বাইরে কাদা ছোঁড়া হয় বলে অভিযোগ। আবার উত্তরবঙ্গের তুফানগঞ্জে তৃণমূলের অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। হুগলির চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্রে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী দেবাংশু ভট্টাচার্য। ৩২ হাজার ৫৮৭ ভোটের মার্জিনে জয়ী বিজেপির সুবীর নাগ।
ভোটের মাস দুয়েক আগে গড়া আম জনতা উন্নয়ন পার্টি তৈরি করেন হুমায়ুন কবীর। নতুন দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রাম কেন্দ্রেও। দলের চেয়ারম্যান হুমায়ুন নিজে লড়েছিলেন মুর্শিদাবাদের দুই কেন্দ্রে— নওদা এবং রেজিনগর। ভবানীপুর, নন্দীগ্রামে হুমায়ুনের প্রার্থীরা দাঁত ফোটাতে না পারলেও ‘ক্যাপ্টেন’ নিজে জিতলেন দুই কেন্দ্রেই। নওদায় তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক সাহিনা মুমতাজ এবং রেজিনগরে আতাউর রহমানকে যথাক্রমে ২৭৯৪৩ এবং ৫৮৮৭৬ ভোটে পরাজিত করলেন তিনি।
এদিন একের পর এক কেন্দ্রে পিছিয়ে থাকলেও দলের প্রার্থী এবং নেতা-কর্মীদের বার্তা দেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ সমাজমাধ্যমে ভিডিয়োবার্তা দিয়ে মমতা বলেন, ‘‘দয়া করে কোনও (তৃণমূল) প্রার্থী এবং কাউন্টিং এজেন্ট গণনাকেন্দ্র ছেড়ে আসবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান (পরিকল্পনা)।’ তিনি বলেন, ‘আমি গতকাল থেকে বলছি, ওদেরগুলো (এগিয়ে থাকা আসন) আগে দেখাবে। আমাদেরগুলো পরে দেখাবে। অনেক জায়গায় কাউন্টিংয়ের বন্ধ করে রেখে দিয়েছে। কল্যাণীতে এমন সাতটি মেশিন ধরা পড়েছে, যেখানে কোনও মিলই নেই।’ মমতা আরও বলেন, ‘কেন্দ্র জোর করে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে তৃণমূলের উপর অত্যাচার করছে। অফিস ভাঙছে। জোর করে দখল করছে। এসআইআরের নামে ভোট লুট করেছে।’ দলের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার বার্তা দিয়েছেন মমতা। তার কথায়, ‘মনখারাপ করার কারণ নেই। আমি বলেছিলাম, সূর্যাস্তের পরে আপনারা জিতবেন। তিন-চার রাউন্ড সবে কাউন্ট হল। ১৮-১৯ রাউন্ড কাউন্ট হয়। তখন আপনারা জিতবেন। ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। আপনারা সকলে জিতবেন। আমরা আপনাদের সঙ্গে রয়েছি।’ তবে মমতার এই অভয়বাণীর পরে ভোটের ফলে কোনও পরিবর্তন হয়নি। বরং সবুজকে ফিকে করে আরও গাঢ় হয়েছে গেরুয়া। জোড়াফুলকে চূর্ণ করে বাংলায় ফুটেছে পদ্মফুল।