সংখ্যা কখনও কখনও নিছক সংখ্যা থাকে না- তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে সময়ের সুর, নীতির দিকনির্দেশ আর সমাজের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। দেশের স্কুলশিক্ষা ও শিশু পুষ্টির অন্যতম ভরসা পিএম পোষণ প্রকল্পের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই কারণেই নিছক তথ্য নয়, বরং এক গভীর প্রশ্নের দরজা খুলে দিচ্ছে।
পাঁচ বছরে প্রায় ৮৪ হাজার স্কুল এই প্রকল্পের আওতা থেকে সরে গেল।
১১ লক্ষের বেশি থেকে কমে ১০ লক্ষের কিছু বেশি। কাগজে-কলমে এটি হয়তো ৭.৫ শতাংশের হ্রাস, কিন্তু বাস্তবে এর মানে- হাজার হাজার রান্নাঘরের আগুন নিভে যাওয়া, লক্ষ লক্ষ শিশুর পাতে একবেলার গরম খাবারের অনিশ্চয়তা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে- এই হ্রাসের কারণ কী? সংসদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরিসংখ্যান তুলে ধরলেও, ব্যাখ্যার জায়গাটি রয়ে গেল ফাঁকা। এই নীরবতাই উদ্বেগের। কারণ, নীতিগত পরিবর্তন হলে তার যুক্তি থাকে,পরিকল্পনা থাকে। আর যদি ব্যাখ্যা না থাকে, তবে সংশয়ই বাড়ে।
সরকারি ব্যাখ্যার আড়ালে একটি প্রচলিত যুক্তি শোনা যাচ্ছে- স্কুল
একত্রীকরণ। কম ছাত্রসংখ্যার ছোট ছোট স্কুল বন্ধ করে বড় স্কুলে যুক্ত করা।যুক্তি হিসেবে তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই ‘একত্রীকরণ’-এর পথে হাঁটতে গিয়ে কি আমরা শিশুদের কাছে স্কুলকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছি? গ্রামের শিশু, বিশেষ করে মেয়েরা- যাদের জন্য দূরত্ব মানেই ঝরে পড়ার ঝুঁকি- তাদের কথা কি যথেষ্ট ভেবে দেখা হচ্ছে?
আরও একটি বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না। মিড-ডে মিল বা আজকের
পিএম পোষণ, বহু পরিবারের কাছে শুধুই একটি সরকারি প্রকল্প নয়-এটি তাদের সন্তানের পুষ্টির নিরাপত্তা। অনেক ক্ষেত্রে এই একবেলা খাবারই দিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর আহার। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রকল্পের আওতা সঙ্কুচিত হওয়া মানে, অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়া।
এই প্রকল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা- স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো। বহু গবেষণাই দেখিয়েছে, পাতে খাবার থাকলে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ বাড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে, যেখানে পড়াশোনার চেয়ে জীবিকার চাপ বেশি। ফলে, এই প্রকল্পের পরিধি কমা মানে শুধু পুষ্টির নয়, শিক্ষার ধারাবাহিকতার উপরও আঘাত।
রাজ্যভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগ বাড়ায়। উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, আসাম- এই রাজ্যগুলিতে বড়সড় হ্রাস চোখে পড়ে। এগুলি এমন অঞ্চল, যেখানে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তুলনামূলক বেশি। ফলে, এখানকার পরিবর্তন আরও সংবেদনশীল।
কেন্দ্র বলছে, বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজ্যের। রাজ্য বলবে, নীতি কেন্দ্রের।
এই দায় ঠেলাঠেলির মাঝে যে বিষয়টি হারিয়ে যায়, তা হল শিশুর অধিকার। পুষ্টি ও শিক্ষার অধিকার কোনও প্রশাসনিক বিভাজনের বিষয় হতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা। কেন কমলো স্কুলের সংখ্যা? কত শিশু বাস্তবে প্রভাবিত? বিকল্প ব্যবস্থা কী? এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর না থাকলে আশঙ্কা থেকেই যায়- এটি কি নিছক পরিসংখ্যানগত পুনর্বিন্যাস, নাকি ধীরে ধীরে সামাজিক খাতে ব্যয়ের সঙ্কোচন?
ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি- এই দাবি আমরা বারবার শুনি। কিন্তু সেই বৃদ্ধির ভিত কতটা মজবুত, তা নির্ভর করে আগামী প্রজন্মের উপর। যদি তাদের পুষ্টি, শিক্ষা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা স্থায়ী?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল- একটি দেশের অগ্রগতি কি শুধু জিডিপির অঙ্কে মাপা যায়, নাকি তার শিশুদের পাতে কতটা ভাত আছে, তাতেও তার উত্তর লুকিয়ে থাকে? পিএম পোষণ প্রকল্পের এই সঙ্কোচন তাই একটি প্রশাসনিক খবর নয়, এটি একটি সামাজিক সতর্কবার্তা। এখন দেখার, সেই বার্তা শোনার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা রয়েছে