বিধানসভায় মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরুন, বিধায়কদের পরামর্শ লোকসভার অধ্যক্ষের

কলকাতা, ৩ জুলাই- বাংলার নবনির্বাচিত বিধায়কদের জন্য এবার দু’দিন ব্যাপী ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হল কলকাতায়। লোকসভা সচিবালয়ের ‘প্রাইড’-এর (গণতন্ত্র বিষয়ক সংসদীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান) সহযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার উদ্যোগে শুক্রবার এই বিশেষ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা। বিধানসভার নিয়ম মেনে অধিবেশনে বিধায়কদের কীভাবে বক্তব্য রাখতে হবে, কীভাবে মানুষের কথা তুলে ধরতে হবে সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয় কর্মসূচিতে। তবে এই অনুষ্ঠানেও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাম ও তৃণমূলকে একযোগে আক্রমণ করেন। দাবি করেন, তৃণমূল জমানায় যেভাবে বিরোধীদের বলতে দেওয়া হতো না, সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন করেছে নতুন সরকার। প্রত্যেক প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হচ্ছে বিরোধী দলের বিধায়ক-সাংসদদের।

            অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত বিধায়কদের উদ্দেশ্যে লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা পরামর্শের সুরে বলেন, ‘বিধানসভায় বেশি সময় ধরে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করুন। তাতে আপনারা নতুন এক অনুভূতি পাবেন। সবসময় শেখার চেষ্টা করুন। সমাজে যে মানুষটি সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে তার জীবনে কীভাবে পরিবর্তন আনা যায় সেটাই একজন জনপ্রতিনিধির কর্তব্য হওয়া উচিত। বাংলা গোটা দেশকে পথ দেখায়, সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। মনে রাখবেন, মানুষ আপনাদের অনেক বিশ্বাস নিয়ে বিধানসভায় পাঠিয়েছেন। তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরুন। বাংলাকে বিকশিত করার দায়িত্ব আপনাদের কাঁধে।’ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার যে বিরাট ভূমিকা ছিল সেই কথাও উঠে আসে তার বক্তৃতায়। বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ওম বিড়লা বলেন, এই পবিত্র ভূমি একদা সারা দেশ তথা সমগ্র বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে। বর্তমান সময়কে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ গোটা ভারত আবার বাংলার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাংলাকে সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং নিজের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।’ দু’দিনের এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে এসেছেন রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু সহ বিশিষ্টজনেরা। ছিলেন উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশের বিধানসভার অধ্যক্ষরাও। ছিলেন সব দলের বিধায়করা।

            কলকাতার নিউটাউন কনভেনশন সেন্টারের এই অনুষ্ঠান থেকে পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার কটাক্ষ, ‘প্রথমে ৩৪ বছরে দলীয় অফিস থেকে সব হত। আর ১৫ বছরের কথা বলব না। কারণ এখানে বিরোধী দলনেতা আছেন, সকলে আছেন। নিজের বিধানসভার নিন্দা করা মুখ্যমন্ত্রীর শোভা পায় না।’ তৃণমূল সরকার কীভাবে বিরোধীদের কোণঠাসা করেছিল, এদিন তাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। বলেন, “এখানে বিরোধী সাংসদ, বিধায়কদের কোনও মর্যাদা ছিল না। কোনও সরকারি প্রকল্প, সরকারি কর্মসূচিতে বিধায়কদের ডাকা হত না। কিছু বিধায়কদের ডাকা হত রাজনৈতিক পরিচয় দেখে। শেষ পাঁচ বছরে বিরোধী দলনেতাকে একবারও ডাকেননি। গুরুত্বপুর্ণ অধিবেশনের আগে বারবার বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করা হত।”  সকলকে কাজ শেখার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দিলেন বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব। তার কথায়, ‘আজ আমরা যে স্বাধীনভাবে এখানে কথা বলছি, ভাষণ দিচ্ছি বা রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছি—তার নেপথ্যে রয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি না থাকলে আজ আমাদের এই রাজনৈতিক অস্তিত্বই থাকত না।’

            রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি সেই ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’র অবসান ঘটিয়েছেন দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত দেড় মাসে আমি যে ক’টি প্রশাসনিক বৈঠক করেছি, তার প্রতিটিতে দলমত নির্বিশেষে বিরোধী দলের বিধায়কদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছি এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তাদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনেছি।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আজ সকল বিধায়ককে ভালো করে কাজ শিখতে হবে। প্রথমবার যিনি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাদের শিখতে হয়। আপনাদের এই দু’দিন ভালো করে শিখতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে রাজ্যকে দাঁড় করাতে হবে।’ পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সব ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই রাজ্যে আসতে চলেছে আরও ২,১০০ কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগ। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধু এই দু’টি প্রকল্পই নয়, চলতি বছরের মধ্যে আরও বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট লগ্নির প্রস্তাব ঘোষণা করা হবে। তবে তার আগে রাজ্যে একটি ত্রুটিহীন ও স্পষ্ট শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়তে চাইছে সরকার।            

Sumit Chakraborty: