বেসরকারি হাসপাতালে ‘লুকোনো লাভে’ কাঁচি পড়ছে!!

দৈনিক সংবাদ অনলাইন প্রতিনিধি:-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মানেই ‘বাঁচার লড়াই’-এর পাশাপাশি আর এক যুদ্ধ – বিলের সঙ্গে। রোগমুক্তির স্বস্তি অনেক সময় মুছে যায় ডিসচার্জের সময় হাতে ধরা সেই দীর্ঘ অঙ্কের কাগজে। বছরের পর বছর ধরে এই অভিযোগই ঘুরে ফিরে এসেছে চিকিৎসার খরচ নয়, আসলে ‘অদৃশ্য মার্জিন’-ই ফুলিয়ে তুলছে বিল। এবার সেই জায়গাতেই আঘাত হানতে চলেছে কেন্দ্র।

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাব চিকিৎসা সরঞ্জামের উপর ট্রেড মার্জিনে নির্দিষ্ট সীমা বা ‘ক্যাপ’। অর্থাৎ, হাসপাতাল যে দামে ডিভাইস বা সরঞ্জাম কিনবে, তার উপর একটি নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি আর রোগীর কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। কেন্দ্র এরই মধ্যে এই বিষয়ে বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে বলে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র এই সংবাদ জানিয়েছে।আপাতদৃষ্টিতে সহজ এই নীতি কার্যকর হলে তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

সমস্যার মূল যে কোথায়, তা অজানা নয়। স্টেন্ট, পেসমেকার, হার্ট ভালভ থেকে শুরু করে সিরিঞ্জ, ক্যানুলা প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিযোগ, ক্রয়মূল্যের সঙ্গে রোগীর বিলের অঙ্কের ফারাক আকাশছোঁয়া। ৩ টাকার সিরিঞ্জ ৩০ টাকায়, ৬ টাকার ক্যানুলা ১২০ টাকায় – এই অঙ্ক কেবল ব্যতিক্রম নয়, বরং এক প্রচলিত প্রথার ইঙ্গিত দেয়।দামি

ডিভাইসের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বিস্ময়কর ২৫ হাজার টাকার পেসমেকার রোগীর হাতে পৌঁছচ্ছে ২ লক্ষ টাকার বিল হয়ে।
এই বাস্তবতায় ট্রেড মার্জিনে ক্যাপ বসানোর প্রস্তাব নিঃসন্দেহে স্বস্তির
বার্তা। হিসেব বলছে, এমন নীতি কার্যকর হলে একটি পেসমেকারের দাম ২ লক্ষ থেকে নেমে ২৫-৩০ হাজার টাকার মধ্যে চলে আসতে পারে। অর্থাৎ, চিকিৎসার খরচের যে বড় অংশটি ‘অদৃশ্য’ ছিল, সেটিই দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে প্রশ্নও কম নয়। এই ক্যাপ কত শতাংশে বাঁধা হবে? সব সরঞ্জামের ক্ষেত্রে এক নীতি, নাকি আলাদা আলাদা সীমা? এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ, বিষয়টি কেবল হাসপাতাল বনাম রোগীর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডিস্ট্রিবিউটর, নির্মাতা সংস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমা শিল্প। ফলে সরকারকে এক জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে -একদিকে রোগীর স্বার্থ, অন্যদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

এখানেই আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে স্বাস্থ্যবিমা। অস্বাভাবিক বিলের চাপ কেবল রোগীর পকেটেই পড়ে না, তার প্রভাব পড়ে বিমা সংস্থার উপরেও। দাবি (ক্লেম) বাড়ে, খরচ বাড়ে, আর তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটে প্রিমিয়ামে।ইতিমধ্যেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী দেড় বছরে স্বাস্থ্যবিমার
প্রিমিয়াম ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে চিকিৎসা খাতে বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার ১৪-১৫ শতাংশ, সেখানে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিছুটা হলেও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে সতর্কতাও জরুরি। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যদি হাসপাতালের আয় কমিয়ে দেয়, তাহলে পরিষেবার মান বা বিনিয়োগে প্রভাব পড়তে পারে -এমন যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক চিকিৎসা এবং দক্ষ মানবসম্পদের খরচও কম নয়। ফলে নীতি প্রণয়নে সূক্ষ্ম ভারসাম্যই হবে মূল চাবিকাঠি। এই প্রস্তাব তাই কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নৈতিক প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা। চিকিৎসা কি পরিষেবা, নাকি পণ্য? রোগী কি গ্রাহক, নাকি অধিকারভিত্তিক নাগরিক? ট্রেড মার্জিনে ক্যাপ সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত এই নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের উপর। যদিও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক এই সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অনেকটাই করে নিয়েছে। কিন্তু একটি কথা স্পষ্ট – চিকিৎসার খরচ নিয়ে যে অসন্তোষ বহুদিন ধরে জমে উঠছিল, তার মোকাবিলায় সরকার এবার সরাসরি মূল সমস্যায় হাত দিতে চাইছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার এই ‘অদৃশ্য খরচ’ যদি সত্যিই কমে, তবে তা কেবল বিল নয় মানুষের আস্থাকেও হালকা করবে।

Dainik Digital: