কবিতা-ঋতুপর্ণকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি

পর্ব ২
বাসব মৈত্র

প্রিয় ঋতুদা, ৩০ মে, ২০১৩-য় তোমার চলে যাওয়া বাংলা সিনেমার সম্পর্কের সুক্ষ্মতাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেক বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আদর, উপলব্ধি, হাহাকার, একাকীত্ব যেভাবে চরিত্রগুলোকে প্রান্তিক করেও মূলস্রোতে বাঁচিয়ে রাখত, সেই শৈলীর দর্শনের ওপরও একটা জোর ধাক্কা। মৃত্যুকে তুমি কীভাবে নিয়েছিলে ঋতুদা? কতটা বুঝতে পারতে মৃত্যুর অবসাদ, বিপন্নতা, স্বগতোক্তি? সেই ‘১৯ শে এপ্রিল’ থেকে মৃত্যু দিয়ে তুমি আঘাত দিয়েছ। মৃত্যুরও একটা ড্রয়িংরুম চেহারা দিয়েছ তুমি। মৃত দেহের কোনো সাবেকি সাজ থাকে? চন্দন দিয়ে সাজানো নয়।কিন্তু ওই যে এক অভিযোগ, যা সরোদে সরোদ, যা সম্পর্কগুলোর কাটাছেরা করতে গিয়ে উৎসব মুখর একটা বিটিরোড তৈরি করে দেয়— যেখানে আমার মায়ের মৃতদেহ।
২২, ফেব্রুয়ারি, ২০০২— ভোর পাঁচটা কুড়ি, সরযূ নার্সিংহোমে মা যখন চলে যাচ্ছে—শুভ মানে আমার ভাই আর আমি দু’জন ঘুমে অচৈতন্য। আমরা ঠাকুমাকে হাম্মা বলতাম। হাম্মাই কাঁদতে কাঁদতে এসে আমাকে জাগায়। শুভ তখনও আমার পাশে শুয়ে। ঘুমোচ্ছে। মার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছিল।আমার জেঠুরও ব্লাড ক্যান্সার। জেঠু গেলো ৪৫ বছর বয়সে। মা সাতচল্লিশে। আর সেই সাতচল্লিশের মুখে দাঁড়িয়েই তোমাকে এই চিঠি। একটা চাপা ভয় আমারও কি নেই? মৃত্যুর চেহারাটা কখনও বড় রোমান্টিক। অন্তত যে মারা যাচ্ছে, তাকে আমরা যতই ডেডবডি বলি, যদি ধরে নিই তার সূক্ষ্ম শরীর তার মৃত শরীরকে দেখতে পাচ্ছে, তাহলে সে ভালোবাসার একটা নাগাল পেলেও পেতে পারে। তুমি পেয়েছিলে ঋতুদা? মাথায় পাগড়ি নিয়ে তুমি যখন বাইরে এলে, কলকাতায় তখন বুঝি বা বৃষ্টি! আমার মায়ের মৃত্যুদিনে কোনও বৃষ্টি হয়নি।বাবা বাড়ি থেকে রতনবাবু ঘাট খালি পায়ে মায়ের কাচের গাড়ির পিছনে পিছনে হেঁটে হেঁটে গেছিল। বাবা আমাদের দুই ভাইকে বলেছিল, খালি পায়ে হেঁটে যেতে।আমি শুনিনি।

মৃত্যু নিয়ে বাইরের আচার, ওসব আমার ছিল না। আমাদের পাড়ায় সেবার এক বৃদ্ধের মৃত্যু। তখনও মৃতদেহ কাচের গাড়িতে নিয়ে যাওয়া বরানগরে ততটা শুরু হয়নি ঋতুদা। আমাদের প্রতিবেশী বৃদ্ধকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কাচের গাড়িতে। মায়ের ভালো লেগেছিল কাচের গাড়ি। মায়ের ভালো লেগেছিল, ওই বৃদ্ধের ছেলের কাছা না নেওয়া। মা বলেও ছিল, তোদেরও কিছু করতে হবে না। আমি কিন্তু প্রতিবাদ করেছিলাম।যা সমাজ নির্দিষ্ট আমি তাকে অস্বীকার করতে চাইনি। তোমার মৃত্যু সম্পর্কের গতি, স্থৈর্য, ধৈর্য, নিয়ে সমস্ত আলেখ্যকে কেমন থামিয়ে দিলো।
ঋতুদা, প্রত্যেক মা চায় তার সন্তানের প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে। মা যখন চলে গেল, তখন আমি সবে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি, ভাই উচ্চমাধ্যমিক দেবে। স্ক্রিজোফেনিয়া কী রোগ ঋতুদা? আমার হবে না তো? মা দেখে যেতে পারেনি ভাইয়ের বিটেক।কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ৯২ পার্সেন্ট নিয়ে পাশ করা। মায়ের মৃত্যুতে সন্তানকে কাঁদতে হয় ঋতুদা। ভাই কাঁদেনি।অথচ ওই সব থেকে মা ন্যাওটা ছিল। মুখাগ্নি করল ভাই। কাঁদলো না। শ্রাদ্ধ করল ভাই। কাঁদল না। আমি অসুস্থ। কোনওমতে অর্ঘ্য দিয়েছি। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। হোমিওপ্যাথি না এলোপ্যাথি: মায়ের মৃত্যুতে সেই প্রশ্ন আমাদের যন্ত্রণা দিয়েছে বিস্তর।মা রক্ত নিতে চাইত না। হোমিওপ্যাথিতে মা বেঁচেছিল প্রায় সাত বছর। ব্লাড রিপোর্ট আনতে প্রায়ই হাতিবাগান, পার্ক স্ট্রিট। বুসলফান সেই ওষুধ: অর্ডার দিয়ে রাখতে হতো।আত্মীয়স্বজন এলোপ্যাথি ডাক্তারের পক্ষে, আর এপাশে হোমিওপ্যাথি নিয়ে মায়ের লড়ে যাওয়া। কত বিয়ে বাড়িতে মা অনুষ্ঠানের জোগাড় আয়োজনে, মা বলত, জীবন যে কোথা দিয়ে কখন আঘাত করে দেবে, তার আগে যা আনন্দ করার করে নিস। ফেলে রাখিস না। ঋতুদা, আমার মা ছিল আর পাঁচজন মায়ের মতোই সাধারণ। মা ছিল জনপ্রিয়। মা ভালোবাসত বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাস।মা দেখতে চেয়েছিল, আমার প্রেমের সম্পর্ক। আজ যখন খবর কাগজে লেখা বেরোয়, ঋতুদা মা তখন নেই। এই এক চির উজ্জ্বল আফসোস। মাকে কিছুই দেখতে হলো না ঋতুদা— দুই ছেলের অসুস্থতা, বড় ছেলের রাত দুটোয় বাড়ি ফেরা, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন প্রেম, নেশা— মা পছন্দ করত না এসব। তবু মায়ের ভালো লাগত ছেলেদের এই বোহেমিয়ান জীবন, কেননা তার আনাচ কানাচে কোথাও শিল্পের ইশতেহার ছিল। মায়ের মৃত্যু, ঋতুদা কোথাও আমরা জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি।
ঋতুদা, বাবা-মায়ের বিবাহ বার্ষিকীর পঁচিশ বছরের আগেই মা চলে গেল। মার খুব ইচ্ছে ছিল, পঁচিশ বছর বিবাহ বার্ষিকী খুব ধুমধাম করে হবে। হলো না। মা সারা জীবন যৌথ সংসারে। মার নিজের সংসার হলো না। একটা ড্রয়িং রুম, নিজের একটা ঘর, শাশুড়ির একটা ঘর, দুই ছেলের দুটো ঘর, বারান্দা— এসবই এখন আমি দেখতে পাই।মা কী কী পেলো না জীবনে। মা খুব ঘর গোছাতে ভালোবাসত। প্রতি সপ্তাহেই স্টিলের আলমারি চলে যেত এক দিকে, খাট আরেক দিকে।মা তো একা পারত না, বাবাও গুছিয়ে দিত, সাহায্য করত। আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরে বাবা সেবার দুটো টেবিল বানালো ছেলেদের পড়াশোনার জন্য। তখনও সানমাইকা লাগানো হয়নি, মূলত কাঠের।ওই সামান্য আসবাব— মায়ের কী আহ্লাদ! আমাদের বাড়িতে লেখালিখির একটা চল ছিল ঋতুদা। আমার ঠাকুরদার ছিল নববানী পত্রিকা, জেঠুদেরও ছিল লিটিল ম্যাগাজিন। ভাই ততদিনে তুলসী মুখোপাধ্যায়ের বিকল্প পত্রিকায় ছড়া লিখে মেজো মাসির থেকে ডায়রি উপহার পেয়েছে। বাবা লিখত কাশ্যপ নামে। শুধু আমারই কিছু লেখা হয়নি। স্কুলের বন্ধু রূপম, রূপম মুখার্জি ততদিনে বিভিন্ন কাগজে লেখা শুরু করে দিয়েছে। সাংবাদিক রূপম। এদের সবার মধ্যে থেকেও আমার কোনও লেখা আসত না ঋতুদা। আমি তখন শুধু নচিকেতার ফ্যান। জীবনমুখী গান ভার্সেস মরণমুখী— এই নিয়ে লড়ে যাচ্ছি বিস্তর।
মায়ের ছিল তাতে নিদারুণ সাপোর্ট।একবার ফুটবল, একবার গান, একবার সাঁতার, একবার তবলা— মা শুধু চেষ্টা করে গেছে, যাতে আমার একটা কিছুতে গতি হয়। আমার হাতের লেখা ছিল জঘন্য।মায়ের পাখার বাড়ি, লাগাতার লেগে থাকা ধীরে ধীরে ভদ্রস্থ করেছে আমার হাতের লেখা। সেই আমি যখন প্রথম কবিতা লিখলাম, মার চোখে জল। মা বলেছিল, একটা বই আমাকে উৎসর্গ করিস।
১৬ কী ১৭ ফেব্রুয়ারি, সরস্বতী পুজোর দিন, রক্ত দেওয়ার জন্য আমরা মাকে নিয়ে গেলাম সরজুতে। ব্লাড ক্যান্সার। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা। পাশ ফিরতে পারছে না। বারবার ডাকছে হাম্মাকে। হাম্মা, বাবা এসে পাশ ফিরিয়ে দিচ্ছে।আমি ততদিনে দেড়শো টাকার একটা টিউশন। মাকে দিয়েছিলাম প্রথম মাইনের ১০০ টাকা। মা বলেছিল, ওই টাকা কোনওদিন খরচ করবে না। ঋতুদা, মায়ের সঙ্গে শেষ কথা: ভাইকে দেখো। একটা চাকরির চেষ্টা করো। এরপর স্যালাইন, অক্সিজেন, আর কত নাম না জানা মেডিকেল যন্ত্র, কত তার মায়ের সারা শরীরে।
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০০২ ভোর ৫টা ২০— আমি আর ভাই গভীর ঘুমে।
মা ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে চলে গেল আমাদের দুই ভাইয়ের, বাবার।
সেই দূরে কোথায়।
দূরে, দূরে।

Sumit Chakraborty: