ঐশানি থেকে ঝাঁপিকে স্বতন্ত্র করে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ: শুভস্মিতা
টেলিভিশনের পর্দায় ‘লক্ষ্মী ঝাঁপি’ ধারাবাহিকে ঝাঁপি চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেছেন শুভস্মিতা মুখোপাধ্যায়। অভিনয় থেকে শুরু করে জীবনদর্শন— সবকিছুতেই তার বিশ্বাস ভারসাম্যে। অভিনেত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতায় আনন্দিতা সরকার।
////////////////////////////////////////////////
একজন অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের ভালোবাসাকেই কি আপনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন?
একজন অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের ভালোবাসার থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। বিভিন্ন জায়গা থেকে যে ভালোবাসা আমরা পাচ্ছি, সেটাই আমাদের কাছে সবথেকে বড় পাওয়া। একজন পারফর্মার হিসেবেও এর থেকে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে!
শুভস্মিতা কি ঝাঁপির মতো সঞ্চয়ী?
আসলে রোজগার করা শুরু করার পরেই সঞ্চয় ব্যাপারটা ঠিকভাবে বোঝা যায়। তার আগে ছোটোবেলায় কেউ কিছু দিলে সেটা জমিয়ে রাখাও এক ধরনের সঞ্চয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিষয়টা আসে উপার্জনের পর। ছোটোবেলা থেকেই বাড়ি থেকে শেখানো হতো বুঝে খরচ করতে। নিজে রোজগার শুরু করার পর বুঝেছি কষ্টের উপার্জিত অর্থ কীভাবে ব্যালান্স করে খরচ আর সঞ্চয় দুটোই করতে হয়। তবে এমন নয় যে আমি ভীষণ বড়োসড়ো সঞ্চয় করি— বরং আমি ব্যালান্স রাখার চেষ্টা করি। উপার্জন যেমন দরকার, তেমনই নিজের উপার্জিত অর্থ উপভোগ করাটাও জরুরি।
স্টার জলসায় অনুষ্ঠিত ‘লক্ষ্মী ঝাঁপি’-র সিগনেচার হিসেবে মাটির ঘট বা লক্ষ্মীর ঝাঁপি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোটোবেলায় কি আপনিও এভাবে টাকা জমাতেন?
হ্যাঁ, অবশ্যই। ছোটোবেলায় আমরা সবাই কমবেশি মাটির ঘটে টাকা জমিয়েছি। তবে সত্যি বলতে কী, টাকা জমানোর থেকেও ঘট ভাঙার আনন্দটাই বেশি হতো।
ঝাঁপির সঙ্গে আপনার নিজের কতটা মিল আছে বলে মনে হয়?
এর আগে আমি ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’-এ ঐশানির চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এটা আমার দ্বিতীয় ধারাবাহিক। আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঐশানি থেকে ঝাঁপিকে আলাদা করে তোলা। কাজ করতে করতে বুঝেছি, শুভস্মিতার মধ্যে যেমন কিছুটা ঝাঁপি আছে, তেমনই ঝাঁপির মধ্যেও কিছুটা শুভস্মিতা আছে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে একই স্ক্রিপ্টে কাজ করা, একই ইউনিটের সঙ্গে পরিবারের মতো সময় কাটানো— এই জার্নিই চরিত্রটাকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছে। এই ধারাবাহিকে কাজ করার ছয় মাস অতিক্রম হওয়ার পর মনে হয় ঝাঁপি একটা সম্পূর্ণ নিজস্ব চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
নতুন কাজ নির্বাচন করার আগে আপনি কোন বিষয়টাকে প্রাধান্য দেন?
এই বয়সে যতটা সম্ভব কাজ করতে চাই। তাই খুব বেশি হিসেব করে চরিত্র বাছাই করি না। চরিত্র ভালো লাগলে কাজটা করি। আমি কাজ করতে ভালোবাসি, তাই বড়-ছোটোপর্দা বা সিরিজ যেকোনও মাধ্যমে অভিনয় করতে আমি রাজি।
ধারাবাহিকের বাইরে অন্য কোনও মাধ্যমে কাজের প্রস্তাব পেয়েছেন?
ধারাবাহিক করতে করতে অন্য মাধ্যমে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না, কারণ সময়ের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাঝখানের যে ব্রেক টাইম থাকে, সেই সময়ে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের কাজ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে প্রথম ধারাবাহিক আর বর্তমান কাজের মাঝে ছয় মাসের একটা গ্যাপ ছিল, সেই সময়ে তেমন কোনও সুযোগ আসেনি। ভবিষ্যতে যদি এরকম কোনও বিরতি সময়ের মাঝে ভালো কাজের সুযোগ আসে আমি নিশ্চয়ই করব।
ধারাবাহিকের ইউনিটের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
ধারাবাহিক করতে গেলে একটা পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’-এর ইউনিট হোক বা ‘লক্ষ্মী ঝাঁপি’— সব জায়গাতেই টেকনিশিয়ান থেকে সহ অভিনেতা, সবার সঙ্গেই খুব সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথম দিন থেকেই এই ইউনিটের পজিটিভ ভাইবটা চোখে পড়ে।

ঝাঁপি-দীপ (সৌরভ চক্রবর্তী)— এত সুন্দর একটা অনস্ক্রিন জুটি তৈরি হওয়ার পেছনে রহস্য কী?
আমার মনে হয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পেস। একজন আর্টিস্টকে যদি কমফোর্ট জোনে কাজ করার জায়গাটা দেওয়া যায়, তাহলে অভিনয় থেকে শুরু করে বন্ধুত্ব— সবকিছুই সহজ হয়ে যায়। সৌরভদা ভীষণ অভিজ্ঞ একজন অভিনেতা। তিনি প্রথম দিন থেকেই আমাকে সেই স্পেসটা দিয়েছেন। সৌরভদা অভিনেতার পাশাপাশি একজন পরিচালকও। কিন্তু কখনও পরিচালক সুলভ আচরণ করেননি বরং সহ-অভিনেতা হিসেবে পাশে থেকেছেন। সম্ভবত এই কারণেই দর্শকের কাছে আমাদের জুটি এতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে পরিবার থেকে কতটা সমর্থন পেয়েছেন?
বাড়ি থেকে কোনওদিনই কোনও সমস্যা ছিল না। বাড়ির সবাই চাইতেন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং করি, যদিও আমি বিসিএ করেছি। তবে আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনও আপত্তি করেননি আমার পরিবারের লোক। আমি জীবনে যা করতে চেয়েছি, সেটা করার স্বাধীনতা পেয়েছি।
অভিনয়ে আসার জার্নি কেমন ছিল?
সেনকো গোল্ড আয়োজিত ‘দীপ্তি’ একটি বিউটি পেজেন্টে আমি উইনার হয়েছিলাম। তার আগে ‘খ্যাপা’ নামে একটি সিরিজে কাজ করি। এই দুটো ঘটনা ২০১৮ সালে ঘটে। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে কাজ শুরু করি। ২০২২ সালে আমার মেগা সিরিয়ালে আসা। এর মাঝে গ্র্যাজুয়েশন সম্পূর্ণ করেছি। আমার নিজের সঙ্গে একটা কমিটমেন্ট ছিল— ন্যূনতম শিক্ষা শেষ করে তবেই পুরোপুরি অভিনয়ে সময় দেব।
যদি অভিনয়ে না আসতেন, তাহলে কী করতেন?
আমি খুব ভেবেচিন্তেই অভিনয়কে বেছে নিয়েছি। যদি এই জগতে না আসতাম, তাহলে হয়তো ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতাম।
ঝাঁপির সঙ্গে এই জায়গায় তো আপনার বেশ শক্ত মিল পাওয়া যায়!
একদম। বিনোদন দুনিয়ার মানুষদের পেশাগত জীবন অনিশ্চিত। আজ কাজ আছে, কাল হয়তো উপর্জনহীন হতে হলো। কিন্তু লাইফস্টাইল তো একই থাকে। তাই প্যারালাল ইনকাম থাকা খুব জরুরি।
সামনে কি সেই ধরনের কোনও পরিকল্পনা আছে?
ইতিমধ্যেই আমি অভিনয়ের পাশাপাশি উপার্জনের একটা বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছি। আমার ‘নেইল স্কেপ’ নামে একটি নেল আর্ট সালোঁ রয়েছে। প্রায় ছয়-সাত মাস হলো শুরু করেছি। দেখা যাক, সামনে কী হয়।