চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল তিন বিজ্ঞানীর

করোলিনস্কা (সুইডেন): মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে আলোর সাহায্যে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেই বিষয়ে গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন আমেরিকার কার্ল ডাইসেরন এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল। ‘লাইট-গেটেড আয়ন চ্যানেল’ এবং ‘অপটোজেনেটিক্স’ নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাঁদের এই সম্মান।
মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা জানার গবেষণায় খুলে গিয়েছে নতুন দরজা। সুইডেনে স্থানীয় সময় সোমবার রাতে করোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞান ক্ষেত্রে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। ৫৪ বছরের ডাইসেরন আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত। হেগেমান বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৭৩ বছরের নাগেল সেই দেশেরই ভুরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তিনজন বিজ্ঞানী মিলে ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা পুরস্কার মূল্য পাবেন।
মস্তিষ্কে কোটি কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরোন রয়েছে। তারা একে অপরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। কোন নিউরোন স্মৃতি তৈরি করছে, কোনটি অনুভূতি বা আচরণের সঙ্গে যুক্ত, কোন স্নায়ু-সার্কিট কোনও রোগের জন্য দায়ী, এতদিন তা নির্দিষ্টভাবে বোঝা কঠিন ছিল। কারণ মস্তিষ্কে কোনও একটি জায়গায় বিদ্যুৎ প্রয়োগ করে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ সক্রিয় করে একইসঙ্গে একাধিক নিউরোন সক্রিয় করা হতো। কিন্তু এতে একসঙ্গে অনেক স্নায়ুকোষ সক্রিয় হয়ে যেত, ফলে কোন কোষের জন্য কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা আলাদা করা যেত না।
এই সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি করেন তিন বিজ্ঞানী। গবেষণার শুরু পিটার হেগেমানের কাজ থেকে। এককোষী শৈবাল ডাইসেরস চ্যানেলরোডপসিন তৈরির জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে আলো দিয়ে সেই কোষকে সক্রিয় করার পদ্ধতি দেখান। ২০০৫ সালে তিনি ‘চ্যানেলরোডপসিন’ নামে এমন একটি প্রোটিন চিহ্নিত করেন, যা আলো পড়লে চলে কোষের মধ্যে আয়নের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
অর্থাৎ, আলো পেলেই ওই প্রোটিন কার্যত একটি ক্ষুদ্র ‘সুইচ’-এর মতো কাজ করে। এর পরের ধাপে সেই আবিষ্কারকে স্নায়ুবিজ্ঞানের কাজে লাগানোর পথ দেখান কার্ল ডাইসেরন। ‘চ্যানেলরোডপসিন’ তৈরির জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে আলো দিয়ে সেই কোষকে সক্রিয় করার পদ্ধতি দেখান। ২০০৫ সালে তিনি এই সাফল্য প্রকাশ করেন এবং পরে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কেও আলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থা কার্যকর করেন। এই পদ্ধতিরই নাম দেওয়া হয় ‘অপটোজেনেটিক্স’। সহজ করে বললে, বিজ্ঞানীরা এখন নির্দিষ্ট কিছু নিউরোনকে ‘আলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত’ করে দিতে পারেন। সেই নিউরোনের উপর আলো ফেললে সেটি সক্রিয় হয়, আলো সরিয়ে নিলে কার্যকলাপ বন্ধ করা যায়। ফলে কোনও নির্দিষ্ট নিউরোন বা স্নায়ু-সার্কিট চালু করলে শরীর বা আচরণে কী পরিবর্তন হচ্ছে, তা সরাসরি দেখা সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই স্নায়ুবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু-সার্কিট বোঝার পাশাপাশি পার্কিনসন্স, মৃগীরোগ-সহ বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে যুক্ত সার্কিট নিয়েও গবেষণা চলছে। নোবেল কমিটির মতে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বোঝার ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিক্স একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে।
শুধু মস্তিষ্কের গবেষণাতেই থেমে নেই এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা। রেটিনার আলোক-সংবেদনশীল কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানো কিছু রোগীর ক্ষেত্রে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও চলছে। মানুষের উপর গবেষণায় প্রাথমিকভাবে দৃষ্টিশক্তি আংশিক ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার শুধু মস্তিষ্কের রহস্য বোঝার নতুন পথই দেখায়নি, ভবিষ্যতে স্নায়ুরোগ ও দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো সমস্যার চিকিৎসায় আরও নির্দিষ্ট পদ্ধতি তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

Sumit Chakraborty: