বিড়ালের গলায় কাঁটা
ইরান কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলার কাঁটা হল সেই ঘটনা আজ যুদ্ধ বিরোধী, আগ্রাসনবিরোধী বিশ্ববাসীর সামনে বেশ চমকপ্রদ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মাসের দীর্ঘ যুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থা আজ ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা, এজেন্ডা ভিন্ন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কোনও রকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা শুরু করেছিলেন তা আজ সবাই জানছেন। ট্রম্পের ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ দিন সাতেকের বেশি চলবে না। খামেনেইকে মেরে ফেললেই গুটিয়ে যাবে ইরান। কিন্তু ইরান নেতা হারিয়ে মরণ কামড় দিল। তা দীর্ঘ হতে হতে একমাস পেরিয়ে গেল।
গায়েগতরে আজ ইরান, ইজরায়েলের একই অবস্থা। তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র, নৌ, বিমান বন্দর সর্বত্র ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। ইরান তার দেশের সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু, হতাহতের অঙ্ক বলছে, ইজরায়েল বলছে না। তাও বুঝতে কষ্ট হয় না কারও অবস্থায়ই ভালো নয়। এই দুটি দেশের কারো পক্ষেই বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধের গোলাবারুদ, ইন্টারসেপ্টার ফুরিয়ে এসেছে সবার। এর পরেও কৌশলগত বন্ধু ইরানকে মাঝ পথে ছেড়ে যাবে না রাশিয়া। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইরান, চিন দুই পরাশক্তির সহযোগিতা রয়েছে তেহরানের প্রতি- এটি প্রকাশ্য গোপন কথা।
অন্যদিকে ইজরায়েল আছে বেকায়দায়। প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বড় ধরনের একটি সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে ইজরায়েল। বাকিটা কিনে নিতে হয় আমেরিকার কাছ থেকে। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এই বছর মার্কিন অনুদান নাও আসতে পারে- এই আশঙ্কায় তেল আবিব নিজেদের বার্ষিক বাজেটে প্রতিরক্ষার খাত বাড়িয়েছে অনেকগুণ। যুদ্ধের জন্য রেখেছে আলাদা বরাদ্দ। নেতানিয়াহু উদ্বিগ্ন, আমেরিকায় এখন ইজরায়েল বিরোধী হাওয়া বইছে। ট্রাম্প ইজরায়েলের পাশে থাকতে চাইলেও তার সংসদ, গোটা দেশ এমনকী সেনাবাহিনীও তা চাইছে না। উপসাগরের এই যুদ্ধকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকাবাসী নিজেদের যুদ্ধ মনে করে না। তাদের বক্তব্য- এই যুদ্ধ আমাদের নয়, এটা ইজরায়েলের যুদ্ধ। তারা রাস্তায় নেমে বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বেঁধেই দিয়েছেন।
বাস্তবিকই, ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে তা পরমাণু বোমার ছুতোনাতায় হলেও এ হল ইহুদি মৌলতন্ত্রের অখন্ড ইহুদি ভূমির জন্য ধর্মযুদ্ধ। যেখানে শামিল হবে প্যালেস্তাইন, লেবানন, ইরান, ইরাক সহ আরো দুয়েকটি দেশ। এই স্বার্থের সঙ্গে আমেরিকার কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে না। ট্রাম্পের কথা আলাদা। এইবার একমাসের যুদ্ধের জাবেদা খাতায় একবার চোখ বুলিয়ে নিতে হলে যে কোনও সাধারণজ্ঞান সম্পন্ন লোকের চক্ষু চড়কগাছ হবে। ট্রাম্প প্রবৃদ্ধ খামেনেইকে হত্যা করলেন বটে, তবে ইরানে পুত্র খামেনেইকে ক্ষমতায় বসালেন। দ্বিতীয়ত, যে হরমুজ প্রণালী সরাসরি ইরানের নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণে ছিল না সেটি ইরানের সিন্দুকে তুলে দিলেন। তৃতীয়ত, চল্লিশ বছর ধরে ইরানের তেলের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এসেছে আমেরিকা সেটি এই দফায় তুলে দিলেন। চতুর্থত, ইরানকে বাধ্য করছেন এনপিটি থেকে সরে এসে পরমাণু বোমা তৈরির কাজ শুরু করতে। পঞ্চমত, পশ্চিম এশিয়ায় যে কয়টি আমেরিকান সমর শিবির ছিল সব কয়টাই ধ্বস্ত বিধ্বস্ত হল। ষষ্ঠত, ইরানের জমানা পাল্টাতে এসে নিজের দেশে নিজের বিরুদ্ধে কোটি মানষকে পথে নামালেন।