নিষ্প্রাণ উপাদানে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি কিংবা ভাস্কর্যের সূক্ষ্ম কারুকার্য থেকে চলচ্চিত্রের বিশাল ক্যানভাস— পরিচালক মনেট রায় সাহা-র সৃজনশীল যাত্রার পথটি বেশ বৈচিত্র্যময়। শৈল্পিক ও নান্দনিক আবহে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী ও পরিচালক মানুষের হৃদস্পন্দন খুঁজেছেন রূপালি পর্দায়। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পরবাসী’। তার এই দীর্ঘ লড়াই, চলচ্চিত্রের দর্শন এবং ত্রিপুরার সিনেমা জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় উঠে এল অনেক না বলা কথা— আলাপচারিতায় সোমদত্তা রায়।
আপনার চলচ্চিত্র পরিচালনার পেশায় আসার নেপথ্য কারণ বা অনুপ্রেরণা কী?
আমার শিল্পসত্তার ভিত্তি আসলে আমার পরিবারেই গড়া। আমার বাবা শান্তিনিকেতনের ভাস্কর্যের ছাত্র ছিলেন এবং বাবা ও মা দুজনেই চারুকলার সঙ্গে যুক্ত মানুষ হওয়ায় শৈল্পিক পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রকৃত মোড়টা আসে নন্দন-২-এ সত্যজিৎ রায়ের একটি তথ্যচিত্র দেখার পর। সেই মুগ্ধতা থেকেই মনে প্রশ্ন জেগেছিল— “আমিও কি পারি না এমন কিছু নির্মাণ করতে?” সেই বন্ধুর দেওয়া সহজ উত্তর ছিল, ‘মানুষ চাইলে সব পারে।’— সেই কথাটা ওই মুহূর্তে মাথায় গেঁথে যায়। আর নিজের ভেতরের তাগিদটা তখন থেকেই দানা বাঁধতে শুরু করে। দিল্লিতে চারুকলায় মাস্টার্স করার সময় আশপাশের আন্তর্জাতিক কালচারাল সেন্টারগুলোর সান্নিধ্য আমার দেখার চোখ বদলে দেয়। বাবার সুবাদে এনএসডিতে ছোটবেলা থেকেই যাতায়াত ছিল। মূলত ছবি আঁকার পাশাপাশি ছোট ফিল্ম তৈরির ইচ্ছে নিয়ে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে (FTII) গেলেও,
কিন্তু সেখান থেকে পাস করে বেরোনোর পর এবং দেশ-বিদেশের অগণিত সিনেমা ও গুণী মানুষদের সংস্পর্শে আসার পর আমার পুরো ভাবনাটাই বদলে গেল। তখন অনুভব করলাম, স্রেফ শখের বসে নয়, মনের গভীর খিদে মেটাতে আমাকে ভালো কিছু নির্মাণ করতে হবে।
আপনার শিক্ষা এবং চলচ্চিত্র বিষয়ক পড়াশোনা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল চারুকলা দিয়ে। বাবার মৃত্যুর পর আমি কলকাতায় চলে আসি এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে ‘স্কাল্পচার’ মানে ভাস্কর্যের ওপর স্নাতক শেষ করি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লি যাই এবং সেখানকার ‘কলেজ অফ আর্ট’ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। তবে সিনেমার প্রতি যে টান সেটা আগেই অনুভব করেছিলাম। তারপর পুণের ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া’ (FTII)-তে যাওয়া এবং সেখান থেকে অ্যানিমেশন ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা শেষ করি ২০০৮ সালে।
‘পরবাসী’ নির্মাণের আগে আপনি আর কী ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
এফটিআইআই (FTII) থেকে বেরোনোর পর দীর্ঘ এক দশক ধরে আমি মুম্বাই, দিল্লি ও ত্রিপুরার মধ্যে এক বৈচিত্র্যময় নানা কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে গেছি। শুরুতে মুম্বাইয়ে পরিচালক সুধীর মিশ্রের ‘আওয়াধ’ ছবিতে ভিজ্যুয়াল এডিটর হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর ২০০৯ সালে ত্রিপুরায় ফিরে বিশিষ্ট লাইব্রেরিয়ান রমাপ্রসাদ দত্তের ওপর একটি বায়োগ্রাফি ডকুমেন্টারি তৈরি করি, যা রাজ্য সরকারের আইসিএ দপ্তর গ্রহণ করে। পুনরায় মুম্বাই ফিরে আমার এক সিনিয়র এবং বর্তমান এফটিআইআই ডিনের নির্দেশনায় সহকারী পরিচালক (AD) হিসেবে কাজ করি। সেই প্রজেক্টে এডি থেকে শুরু করে এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার (EP)—সব দায়িত্বই আমাকে সামলাতে হয়েছিল।
২০১১ সালে একটি সুযোগ আসে দিল্লিতে ‘ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন’ নিয়ে পড়ানোর। সেখানে পড়ানো শুরু করি ২০১২ থেকে। শিক্ষকতার পাশাপাশি সেখানে বেশ কিছু শর্ট ফিল্মও নির্মাণ করি। তবে সৃজনশীলতার খিদে আমাকে আবারও মুম্বাই টেনে নিয়ে যায়। সেখানে ‘স্ক্যাম ১৯৯২’ খ্যাত সৌরভ দে ও আর একজন আমার সিনিয়র পরমবীর সিংয়ের সান্নিধ্যে আসি। তার প্রোডাকশন হাউজে সেই সময় থেকেই এডিটিং এবং কর্পোরেট অ্যাড ফিল্ম বানানো শুরু করি। ফ্যাব ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ— এমনকি জাপান ট্যুরিজমের ওপর আমার তৈরি কাজ আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হয়েছে। লকডাউনের সময় স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেত্রীর সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য আর শিক্ষকতার ব্যস্ততার মাঝেও ২০১৯-২০ থেকে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করি। সবথেকে বড় কথা প্রচুর শর্ট ফিল্ম ও কর্পোরেট এড ফিল্ম বানিয়ে নিজেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার জন্য প্রস্তুত করেছি। শুধু পড়াশুনা নয় বরং কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলন করার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। এখানে মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে ধৈর্য্য ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আর্ট ফিল্ম বা জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রের প্রতি আপনার এই বিশেষ অনুরাগ কীভাবে তৈরি হলো?
ব্যক্তিগতভাবে আমি চলচ্চিত্রকে ‘আর্ট ফিল্ম’ বা ‘কমার্শিয়াল ফিল্ম’— এই ধরাবাঁধা ছকে ভাগ করে দেখতে পছন্দ করি না। আমার কাছে সিনেমা মানেই হলো একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। যেকোনো পেশার প্রতি মানুষের যেমন দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা থাকে, আমাদের নির্মাতাদের ক্ষেত্রেও অনুভূতিটা ঠিক তেমনই। আসলে অনুরাগ, প্রেম বা ভালোবাসা— যাই বলুন না কেন, সেটা কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার সিনেমার প্রতি নয়; বরং আমার সেই চিরন্তন খিদেটা হলো একটি ভালো কাজ এবং একটি নিটোল গল্পের প্রতি। আমি বিশ্বাস করি, সততার সঙ্গে কোনো গল্প বলতে পারলে তা নিজে থেকেই শিল্প হয়ে ওঠে। তাই ভালো সিনেমা নির্মাণের সেই তাড়না থেকেই আমার এই পথচলা, একে আলাদা করে ‘আর্ট ফিল্ম’ তকমা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না।
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে দেশভাগের মতো এত বড় ক্যানভাসের গল্প বেছে নেওয়ার সাহস পেলেন কীভাবে?
এই অসাধ্য সাধনের মূলে রয়েছেন ছবির কাহিনীকার ও প্রযোজক অনিল চন্দ্র দেবনাথ। তিনি ত্রিপুরার ভূমিপুত্র এবং আমার বাবার পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে আমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। ২০২৩ সালে তিনি যখন এই গল্পটি নিয়ে সিনেমা বানানোর প্রস্তাব দেন, তখন সেটি পড়ে আমি নিজের শিকড়ের এক অমোঘ টান অনুভব করি।
আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে, গল্পের ‘নিমাই মাস্টার’ কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নন; তিনি সেই হাজারো মানুষের প্রতিনিধি, যারা দেশভাগের যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বাংলাদেশ থেকে এসে ত্রিপুরা, আসাম বা পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন। একদিকে বড় পর্দায় নিজের প্রথম কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আর অন্যদিকে এই ঐতিহাসিক ও মানবিক দলিলে নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়া—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আমি এমন এক বিশাল ক্যানভাসে কাজ করার সাহস পেয়েছি।।
তথাকথিত বড় তারকা বা পরিচিত মুখ ছাড়াই অভিনয়ের ওপর ভর করে সাফল্য পাওয়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আমি বিশ্বাস করি, গল্পের বুনন যদি শক্তিশালী হয়, তবে বড় তারকা মুখ ছাড়াও একটি সিনেমা সফল হওয়া সম্ভব। এর সাম্প্রতিক ও বড় উদাহরণ হলো ত্রিপুরার ভূমিপুত্র এবং বর্তমানে টিএফটিআই (TFTI)-এর অ্যাডভাইজর বিপ্লব গোস্বামীর লেখা ‘লাপাতা লেডিস’ সিনেমাটি। সেখানে কোনো বড় ‘স্টার ফেস’ ছাড়াই ছবিটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। আসলে দর্শকদেরও এটা বুঝতে হবে যে, সিনেমা কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, এটি একটি বিশুদ্ধ সৃষ্টিশীল শিল্প। গল্পের সততা আর অভিনয়শিল্পীদের নিবেদন থাকলে চেনা মুখের ভিড় ছাড়াও দর্শকদের মনে জায়গা করে নেওয়া যায়।
ত্রিপুরা ও কলকাতার অভিনয়শিল্পীদের এক সুতোয় বেঁধে কাজ করার অভিজ্ঞতা কতটা সহজ বা কঠিন ছিল?
শুরুতে এটা আমার জন্য বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল এবং মনে মনে একটা চাপা উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর দেখলাম, কলকাতার অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সঙ্গে ত্রিপুরার শিল্পীদের এক চমৎকার বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। প্রত্যেকে প্রত্যেককে এতটাই সহযোগিতা করেছেন যে, সেই মেলবন্ধনই আমার কাজের পথকে অনেক বেশি মসৃণ করে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শিল্পীদের এই আন্তরিক সমন্বয়ই দুই ভিন্ন প্রান্তের অভিনয় প্রতিভাকে এক সুতোয় বেঁধে বড় পর্দায় সফলভাবে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।।
বর্তমানের সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই গল্পের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু বলে মনে করেন?
আমি বিশ্বাস করি, সিনেমা কেবল দুই ঘণ্টার সস্তা বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজকে আয়না দেখানোর এবং গভীর বার্তা দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই গল্পের প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। নিজের ভিটেমাটি আর শিকড় ছেড়ে ‘উদ্বাস্তু’ বা ‘পরবাসী’ হওয়া কখনোই কাম্য নয় এবং তা কোনো সুখস্মৃতিও নয়। যারা একদা নিজের জমি ও বসতবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁরা এই সিনেমার পরতে পরতে নিজেদের জীবনের সাথে সেই অমলিন যন্ত্রণাকে খুঁজে পাবেন।
বর্তমান বিশ্বে যে যুদ্ধ, হিংসা আর হানাহানির পরিবেশ আমরা দেখছি, সেখানে দাঁড়িয়ে ‘পরবাসী’ একটি সতর্কবার্তা। আমরা চাই না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আবারও এমন কোনো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হোক। সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এবং ইতিহাসের সেই বিচ্ছেদ ও হাহাকারকে বর্তমানের সামনে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য, যাতে আমরা সম্প্রীতি ও শান্তির মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করতে পারি।
ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে
এত সুন্দরভাবে ক্যামেরাবন্দী করার চাবিকাঠি কি ও দৃশ্যগ্রহণে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে?
এই কৃতিত্বের সিংহভাগই প্রাপ্য এই ছবির ডিওপি (DOP) জয়েস নায়ারের। জয়েস আমার এফটিআইআই (FTII)-এর সহপাঠী হলেও কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি আমার চেয়ে অনেকটাই সিনিয়র। কাজ শুরু করার আগে আমি তাঁকে কেবল প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর একটি ‘মনোক্রোম্যাটিক’ ছবি রেফারেন্স হিসেবে দেখিয়েছিলাম। ব্যস, ওইটুকুই ছিল আমার ইনপুট। এরপর তিনি নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও শৈল্পিক দূরদৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে ত্রিপুরার নিসর্গকে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন। তাঁর সেই দক্ষ হাতের ছোঁয়াই ছবিটিকে একটি আলাদা নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। আর প্রতিকূলতা বলতে গেলে, পাহাড়ি এলাকায় শুটিংয়ের কিছু সাধারণ চ্যালেঞ্জ তো ছিলই, কিন্তু আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই সুন্দর দৃশ্যগুলো পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
ত্রিপুরায় উন্নত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা পরিকাঠামোর অভাব থাকা সত্ত্বেও এমন একটি বড় কাজ সামাল দিলেন কীভাবে?
ত্রিপুরায় উন্নত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অভাব বা পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে— এটা যেমন সত্য, তেমনই এ রাজ্যের শিল্পীদের অফুরান প্রতিভাও অনস্বীকার্য। তবে পরিকাঠামোর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শুটিং স্পটগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান।ডুম্বুর নামক একটা দুর্গম জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছিল যেখানে ম্যানমেড লেক আছে যেটা ৪৮ টি আইল্যান্ড নিয়ে তৈরি সেরকম একটি প্রতিকূল এলাকায় কাজ করেছি যেখানে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল স্টিমার। সেই প্রতিকূলতা জয় করা সহজ ছিল না।
শুরুর দিকে উপযুক্ত অভিনেতা খুঁজে পেতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এখানে যার কথা না বললেই নয় তিনি হলেন পরবাসী সিনেমার একজন জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জয় কর তার একটি নাট্যদল ও আছে তিনি প্রাথমিকভাবে ভীষণ সাহায্য করেন তারপরে আমরা ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বেশ কিছু প্রতিভাবান তরুণকেও পাশে পেলাম, তখন কাজটা সামগ্রিক ভাবে সবদিক থেকেই গতি পেল। তাছাড়া রাজ্য সরকারের ঐকান্তিক সহযোগিতাও আমাদের অনেক বাধা দূর করতে সাহায্য করেছে। তবে সর্বত ভাবে এই ছবির নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আমি মজা করে বলতে পারি— ‘মরুভূমিতে গঙ্গা নদী খুঁজে পাওয়ার মতো’। হাজারো সীমাবদ্ধতার মাঝেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আমরা অসাধ্য সাধন করতে পেরেছি। তবে সরকার আগামী দিনে পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও সচেষ্ট হলে এ রাজ্যে আরও বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব হবে।।
ত্রিপুরার চলচ্চিত্র জগতের উন্নয়ন এবং এখানকার ফিল্ম ইনস্টিটিউট নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
যেকোনো নতুন কাজের পথপ্রদর্শক বা ‘পাইওনিয়ার’ হতে গেলে কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়, আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ‘পরবাসী’র সাফল্য আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ছবিটি কলকাতার ২২টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে, নন্দনে স্পেশাল স্ক্রিনিং চলছে এবং ত্রিপুরার প্রায় সব জায়গাতেই সগৌরবে প্রদর্শিত হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে আমরা যে স্বীকৃতি ও প্রশংসা পেয়েছি, তাতে সাধারণ মানুষ এবং লগ্নিকারীদের মনে ত্রিপুরার সিনেমা নিয়ে একটা বড় ভরসা তৈরি হয়েছে।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে যদি এই ছবির লেখক ও প্রযোজক অনিল চন্দ্র দেবনাথ বা অন্য কোনও সৃষ্টিশীল ব্যক্তি পুনরায় কোনো সিনেমা নির্মাণ করেন বা ত্রিপুরার অন্য কোনো নির্মাতা এগিয়ে আসেন, তবে তাঁদের আর আমাদের মতো শুরুর দিকের সেই কঠিন সমস্যাগুলো পোহাতে হবে না। সমস্যা সব ক্ষেত্রেই থাকে— কোথাও কম, কোথাও বেশি; কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়াই একজন নির্মাতার আসল কাজ। ত্রিপুরার ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করা এখানকার তরুণ প্রতিভাদের সঙ্গে নিয়ে আমার ইচ্ছে আছে পরবর্তী সময়ে যদি কাজ করা সম্ভব হয়। তাছাড়া সরকারের সহযোগিতায় এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে আগামীর নির্মাতারা কারিগরি ও মানসিক সবদিক থেকেই বিশ্বমানের সিনেমা তৈরির সাহস পাবেন।
বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রিপুরা কি একটি শক্তিশালী বিকল্প বা ‘অল্টারনেটিভ প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে উঠতে পারে?
অবশ্যই। বর্তমানে বাংলা সিনেমা শিল্প বেশ কিছুটা সংকটের সম্মুখীন সেটা সবাই হয়তো কিছুটা জানেন বা বোঝেন। একদিকে যেমন নির্মাণ সংস্থা ও লগ্নির অভাব আছে আবার অন্যদিকে সিনেমা বানানো হলেও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের অভাব এই বিষয়টি কমবেশি আমরা যারা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছি তাদের অজানা নয়। তবে ত্রিপুরার প্রেক্ষাপট কিন্তু একদম ভিন্ন। আমি ত্রিপুরার স্ক্রিনিংগুলোতে উপস্থিত থাকার সুবাদে যেটা লক্ষ করেছি এখনও ত্রিপুরাতে ভালো সিনেমা দেখার আগ্রহ মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই আমি মনে করি, ত্রিপুরা আগামী দিনে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি শক্তিশালী ‘প্যারালাল’ ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। এখানকার মানুষের মধ্যে ভালো বাংলা সিনেমার প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, আগ্রহ এবং উন্মাদনা আজও বেঁচে আছে, তা সত্যি। তবে এই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার আজ যার হাত ধরে উন্মোচিত হলো, তিনি হলেন ‘পরবাসী’র কাহিনীকার ও প্রযোজক অনিল চন্দ্র দেবনাথ এটাও অনস্বীকার্য।
চলচ্চিত্র শিল্পে আসতে ইচ্ছুক বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ বার্তা কী?
আমার বার্তা খুব স্পষ্ট— শর্টকাটে বাজিমাত করা যায় না। এই পেশায় আসা সহজ, কিন্তু টিকে থাকতে হলে প্রচুর পড়াশোনা, গবেষণা এবং দেশ-বিদেশের সিনেমা দেখার কোনো বিকল্প নেই। আজকাল অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দিয়ে চিত্রনাট্য বা ভিডিও বানাচ্ছেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে, এতে নিজের মৌলিক শৈল্পিক সত্তা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই শিল্পে টিকে থাকতে হলে অপরিসীম ধৈর্য, কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা থাকতে হবে।
শেখার কোনো বয়স নেই, কোনো বিকল্প অপশন নেই,আমাদের প্রাত্যহিক জীবনই হলো সবচেয়ে বড় পাঠশালা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই কোনো নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারলে অনেক ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করা যায়। আর যদি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না-ও থাকে, তবে দমে না গিয়ে ছোট ছোট কন্টেন্ট তৈরি করে ইউটিউবে প্রকাশ করো। মূল কথা হলো— সব সময় অনুশীলনের মধ্যে থাকতে হবে। নিজেকে প্রতিনিয়ত ঘষামাজা করলেই কেবল এই সৃজনশীল দুনিয়ায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
ছবি সৌজন্য : অদ্রিজা রায়