কলমের পাশে অ্যালগরিদম – সাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনুপ্রবেশ

দীপ্র ভট্টাচার্য

মানুষ যখন প্রথম পাথরের গায়ে আঁচড় কেটে গল্প লিখেছিল, তখন সে জানত না—একদিন সেই গল্পই লিখবে যন্ত্র। তবু ইতিহাস বলে, সাহিত্য কখনও প্রযুক্তিকে ভয় পায়নি। বরং প্রতিবার নতুন প্রযুক্তি এসেছে, সাহিত্য তার রূপ বদলেছে, বিস্তার ঘটিয়েছে, কখনও আবার নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। ছাপাখানা এসেছিল বলে পুঁথির যুগ শেষ হয়নি, কম্পিউটার আসায় কবিতা হারিয়ে যায়নি। আজ সেই ধারাবাহিকতারই এক নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে সাহিত্য—কলমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বা এআই।
আজকের দিনে প্রশ্নটা আর এই নয় যে, এআই কি লিখতে পারে? প্রশ্নটা হল—এআই যখন লিখছে, তখন ‘লেখক’ শব্দটার মানে কি বদলে যাচ্ছে? একটি কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ যদি অ্যালগরিদম তৈরি করে, তবে সেখানে কি সৃজনশীলতা আছে, না কি তা কেবল মানুষের লেখা লক্ষ লক্ষ বাক্যের গাণিতিক পুনর্বিন্যাস?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে মানুষের ভাষা, ভাবনা ও লেখারই প্রতিচ্ছবি। আধুনিক এআই মডেলগুলো—যাদের বলা হয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল—অগণিত বই, গল্প, কবিতা, সংবাদ, প্রবন্ধ পড়ে শেখে ভাষার ছন্দ, বাক্যের গঠন, আবেগের ওঠানামা। তারা জানে না দুঃখ কী, প্রেম কাকে বলে, বা স্মৃতি কেন ভারী হয়। তবু তারা জানে, দুঃখের কথা কীভাবে লেখা হয়, প্রেমের বাক্য কেমন শোনায়। এখানেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—অনুভূতি ছাড়া কি অনুভূতির ভাষা তৈরি করা যায়?
এই প্রশ্নই আজ পশ্চিমা সাহিত্যের কেন্দ্রে। আমেরিকা ও ইউরোপে ইতিমধ্যেই এআই-লিখিত কবিতা সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কোথাও কোথাও লেখকরা এআইকে ব্যবহার করছেন সহলেখক হিসেবে—কেউ প্লট বানাতে, কেউ সংলাপ ঝালিয়ে নিতে, কেউ আবার লেখার ব্লক কাটাতে। আবার অন্যদিকে, বহু লেখক ও সাহিত্যিক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন—এতে কি মৌলিকতা হারাবে সাহিত্য? প্রকাশনা জগতে কি কমে যাবে মানুষের লেখার মূল্য?
তাই, সাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবেশ এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি বাস্তব, নথিভুক্ত এবং প্রতিষ্ঠিত। এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ২০১৮ সালে প্রকাশিত “1 the Road”, যা তৈরি করেছিলেন রস গুডউইন । এখানে একটি গাড়িতে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও জিপিএস সংযুক্ত করে রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ করা হয় এবং সেই ডেটার ভিত্তিতে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখাটি তৈরি করে। একইভাবে ২০১৬ সালে জাপানের ফিউচার ইউনিভার্সিটি হাকোদাতে–এর গবেষকেরা “The Day a Computer Writes a Novel” নামে একটি উপন্যাস তৈরি করেন, যা হোশি শিনিচি সাহিত্য পুরস্কার–এর প্রথম রাউন্ড পার করে। যদিও এটি শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জেতেনি, তবুও এটি প্রমাণ করে যে এআই সাহিত্যিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এছাড়া একই বছরে তৈরি হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র Sunspring–এর চিত্রনাট্য সম্পূর্ণভাবে একটি এআই দ্বারা রচিত হয়েছিল, যেখানে অভিনয় করেন টমাস মিডলডিচ । সংলাপগুলো কিছুটা অস্বাভাবিক হলেও এটি আখ্যান কাঠামো তৈরিতে এআই-এর সক্ষমতা প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে কে আলাডো-ম্যাকডোয়েল এআই–এর সহায়তায় “Pharmako-AI” নামক একটি বই রচনা করেন, যা মানুষ ও মেশিনের যৌথ সৃষ্টির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এআই–এর সাহিত্যিক ব্যবহার এখনও তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও কিছু বাস্তব প্রয়োগ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় এনএলপি গবেষণার মাধ্যমে ছোট গল্প, কবিতা ও টেক্সট জেনারেশনের মডেল তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত গবেষণাপত্রে নথিভুক্ত। একইসঙ্গে গুগল–এর গুগল ট্রান্সলেট বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা সরাসরি নতুন সাহিত্য না লিখলেও সাহিত্যচর্চার ধারাকে প্রভাবিত করছে। এছাড়া যুগলবন্দী-এআই–এর মতো প্ল্যাটফর্ম ভারতীয় ভাষায় ন্যারেটিভ বা গল্পধর্মী তথ্য উপস্থাপনার পরীক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সাহিত্যিক প্রয়োগের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করছে।
সমগ্র আলোচনাটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, সাহিত্যে এআই–এর প্রবেশ মূলত “সহ-সৃষ্টি” ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে মানুষ ও মেশিন একসঙ্গে কাজ করে নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরি করছে। এটি লেখালেখির গতি ও পরীক্ষামূলক সম্ভাবনা বাড়ালেও মৌলিকতা, কপিরাইট এবং লেখকের সত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করছে। এআই যেহেতু মূলত ডেটা ও প্যাটার্নের উপর নির্ভরশীল, তাই এটি মানবীয় অভিজ্ঞতার গভীরতা পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না; তবে নতুন ভাষাশৈলী ও বর্ণনাভঙ্গি তৈরি করার ক্ষেত্রে এর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ভাষাগত বৈচিত্র্য এআই–এর জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তেমনি এটি নতুন উদ্ভাবনের সুযোগও সৃষ্টি করে। ফলে সাহিত্য জগতে এআই একদিকে শক্তিশালী সহায়ক টুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, অন্যদিকে এটি সৃজনশীলতার সংজ্ঞাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলার প্রেক্ষাপট অবশ্য আলাদা। এখানে এআইয়ের ব্যবহার এখনও মূলত পরীক্ষামূলক। ইংরেজি ভাষায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও, ভারতীয় ভাষা—বিশেষত বাংলা—এখনও সংগ্রামের মধ্যেই আছে। কারণ বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এটি বহু স্তরের সংস্কৃতি, উপভাষা, ইতিহাস ও আবেগের সমাহার। রবীন্দ্রনাথের চেতনা, জীবনানন্দের নিঃশব্দতা, বা লোককথার সহজতা—এসব ধরতে গেলে কেবল ডেটা নয়, দরকার সাংস্কৃতিক বোধ। তবু চেষ্টার অভাব নেই। সাম্প্রতিক কালে কিছু গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্যোগে বাংলা কবিতা, ছোটগল্প এমনকি প্রবন্ধ তৈরির পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। সংবাদমাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্ট জগতে এআই ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিচ্ছে—শিরোনাম প্রস্তাব, সংক্ষিপ্ত লেখা, অনুবাদে তার ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু সাহিত্য, যেখানে সূক্ষ্ম অনুভূতি আর নীরবতারও ভাষা থাকে, সেখানে এআই এখনও শিক্ষানবিশ।
এখানেই প্রশ্ন উঠে আসে—বিদেশে যেখানে এআই সাহিত্যে পরীক্ষার সাহস দেখাচ্ছে, আমাদের দেশে কি তা কেবল প্রযুক্তির অভাবে, না কি সাহিত্যের প্রতি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও ধীরগতিতে বিস্তার করছে? বিদেশ ও ভারতের এই পার্থক্যের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবধান নয়, রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকও। পশ্চিমে সাহিত্যকে অনেক সময়ই একটি পরীক্ষাগার হিসেবে দেখা হয়—যেখানে নতুন মাধ্যম, নতুন ফর্ম নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা চলে। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়: “যদি একটি গল্প আমাকে ভাবায়, তবে তা কে লিখল, সেটা কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?” অন্যদিকে, ভারতীয় সাহিত্য—বিশেষত বাংলা সাহিত্য—আজও অনেকাংশে লেখকের ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে লেখক কেবল শব্দের কারিগর নন, তিনি সময়ের সাক্ষী।
এই কারণেই এআই নিয়ে আমাদের আশঙ্কা বেশি, দ্বিধা গভীর। আমরা ভয় পাই—যন্ত্র যদি লেখে, তবে মানুষের অভিজ্ঞতার জায়গাটা কোথায় থাকবে? কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ভয় নতুন নয়। একসময় বলা হয়েছিল, টাইপরাইটারে লেখা কবিতা ‘আসল’ কবিতা নয়। পরে কম্পিউটারে লেখা সাহিত্য নিয়েও একই সন্দেহ ছিল। কিন্তু সাহিত্য বেঁচে থেকেছে, কারণ সাহিত্য তার মাধ্যম নয়, তার মানবিক প্রশ্নগুলো।
তবে এটাও সত্য, এআই সাহিত্যে ঢুকলে কিছু মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। প্রথমত, স্বত্বের প্রশ্ন। একটি এআই-লিখিত গল্পের লেখক কে—প্রোগ্রামার, ব্যবহারকারী, না কি যন্ত্র নিজেই? দ্বিতীয়ত, মৌলিকতার প্রশ্ন। যন্ত্র যেহেতু পুরনো লেখা থেকে শেখে, সে কি সত্যিই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, না কি সে কেবল অতীতের পুনর্গঠন করে? তৃতীয়ত, নৈতিকতার প্রশ্ন। যদি ভবিষ্যতে প্রকাশনা সংস্থাগুলি কম খরচে এআই দিয়ে লেখা তৈরি করতে পারে, তবে কি মানুষ লেখকরা কোণঠাসা হয়ে পড়বেন?
এই সব প্রশ্নের মাঝেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রায়ই ভুলে যাই—এআই কখনও জীবন যাপন করে না। তার কোনো শৈশব নেই, কোনো হারানোর স্মৃতি নেই, কোনো অপূর্ণ প্রেম নেই। সে জানে না রাতের ট্রেনের শব্দ কেমন, বা হঠাৎ পুরনো চিঠি পেয়ে বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে। সে কেবল জানে, এই অনুভূতিগুলো কীভাবে বর্ণনা করা হয়। ফলে তার লেখা নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে যে ফাটল, যে অসম্পূর্ণতা—সেটাই তো অনেক সময় সাহিত্যের প্রাণ।
সম্ভবত ভবিষ্যতের সাহিত্য এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করবে না, বরং গ্রহণ করবে। মানুষ ও যন্ত্রের যুগলবন্দি হয়তো নতুন এক সাহিত্যধারার জন্ম দেবে—যেখানে এআই হবে হাতিয়ার, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে মানুষের। একজন লেখক হয়তো এআইয়ের সাহায্যে তথ্য খুঁজবেন, কাঠামো বানাবেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অনুভূতির ভার, নীরবতার জায়গা—সেগুলো থাকবে মানুষের হাতে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এই সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। যদি এআই আমাদের ভাষার বৈচিত্র্য, আঞ্চলিকতা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে বুঝতে শেখে, তবে সে হতে পারে এক শক্তিশালী সহকারী। কিন্তু যদি তাকে কেবল দ্রুত, সস্তা লেখা তৈরির যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে ক্ষতিটা হবে সাহিত্যেরই। সবশেষে হয়তো বলা যায়—এআই সাহিত্যের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে না। সেই ভবিষ্যৎ ঠিক করবে মানুষই। আমরা যদি সাহিত্যকে কেবল কনটেন্ট ভাবি, তবে যন্ত্রই যথেষ্ট। কিন্তু যদি সাহিত্যকে ভাবি মানুষের অস্তিত্বের দলিল, সময়ের সঙ্গে আমাদের নীরব কথোপকথন—তবে যন্ত্র সেখানে সহযাত্রী হতে পারে, প্রতিস্থাপক নয়।
কলমের পাশে অ্যালগরিদম বসেছে ঠিকই—নীরব, দ্রুত, নির্ভুল। সে আলো জ্বালাতে পারে, মানচিত্র দেখাতে পারে, পথের দূরত্ব মেপে দিতে পারে। কিন্তু হাঁটার ক্লান্তি, হঠাৎ থেমে যাওয়ার ইচ্ছে, বা অকারণে অন্য পথে মোড় নেওয়ার সেই মানবিক চেতনা তার নেই। গল্পের আত্মা আসলে সেই চেতনাতেই জন্ম নেয়। যেখানে মানুষ ভুল করে, দ্বিধায় পড়ে, স্মৃতির ভারে ধীরে হাঁটে, কিংবা অকারণেই একটি বাক্যের পর আরেকটি বাক্য লিখে ফেলে। সাহিত্য কেবল পৌঁছনোর বিষয় নয়, সে চলার অভিজ্ঞতা—পথের ধুলো, গাছের ছায়া, বিকেলের আলো। যন্ত্র আমাদের দ্রুত এগিয়ে দিতে পারে, কিন্তু থেমে তাকানোর শিক্ষা দেয় না। তাই প্রশ্নটা যন্ত্রকে নিয়ে নয়, প্রশ্নটা আমাদের নিয়েই—আমরা কি এখনও সময় দেব, শুনব, অপেক্ষা করব, নিজের ভেতরের সেই অগোছালো, অসম্পূর্ণ মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখব? কারণ পাঠকের আত্মা যন্ত্রে নয়, মানুষের সেই অকারণ ভালোবাসাতেই আজও আশ্রয় খোঁজে।

Sumit Chakraborty: